সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে স্থানীয় একটি পক্ষের আপত্তির মুখে ৫ অক্টোবর স্থগিত হয়ে যায় মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ। দিরাইয়ের স্বপ্নচূড়া স্পোর্টিং ক্লাব এবং সিলেটের জারা স্পোর্টিং ক্লাবের মধ্যকার এই ম্যাচটি স্থানীয় উপজেলা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।

এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে আজ রাজধানীর ধানমন্ডিতে অবস্থিত শহীদ রিয়া গোপ মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্সে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে বাংলাদেশ মহিলা ক্রীড়া সংস্থা। উক্ত সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির সভাপতি ব্যারিস্টার সারওয়াত সিরাজ শুক্লা বাধা প্রদানকারীদের কঠোর হুঁশিয়ারি প্রদান করেন।

সংবাদ সম্মেলনে সারওয়াত সিরাজ বলেন, “একটি ছোট কিন্তু উচ্চকণ্ঠ গোষ্ঠী খেলার বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। খেলতে আসা মেয়েদের হুমকি দেওয়ার ঘটনাও উদ্বেগজনক। বাংলাদেশে যেখানে মেয়েদের খেলাকে বাধা দেওয়া হবে, বাংলাদেশ মহিলা ক্রীড়া সংস্থা তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাবে, মেয়েদের পাশে দাঁড়াবে। মেয়েদের খেলায় বাধা দেওয়ার চেষ্টা আর বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে দেওয়া হবে না।”

তবে কেবল প্রতিবাদের মাধ্যমে এই ধরনের সমস্যার সমাধান সম্ভব নয় বলে মনে করেন সংস্থাটির সাধারণ সম্পাদক শারমিন আক্তার রত্না। তাঁর মতে, যারা মেয়েদের খেলাধুলায় বাধা সৃষ্টি করছে, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি। সাবেক এই শুটার প্রশ্ন তোলেন, “আমরা প্রতিবাদ করলাম, প্রশাসনের নজরে নিয়ে এলাম, কিন্তু যারা এ ধরনের আচরণ করছে, তাদের সামাজিক হেনস্তা কেন করা হচ্ছে না?”

দিরাইয়ে স্থগিত হওয়া ফুটবল ম্যাচটি দ্রুততম সময়ের মধ্যে পুনরায় আয়োজনের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ মহিলা ক্রীড়া সংস্থা। এই বিষয়ে সংস্থার সভাপতি বলেন, “আমরা তীব্র প্রতিবাদ করছি এবং অবিলম্বে সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে এই ফুটবল খেলাটি যেন অনুষ্ঠিত হয়—নিরাপত্তা, সম্মান ও জনগ্রহণযোগ্যতার সঙ্গে, সেই জোরালো দাবি তুলছি।”

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন স্বপ্নচূড়া স্পোর্টিং ক্লাবের কোচ রাকিব ভূঁইয়া এবং দলের অধিনায়ক সাবানা আক্তার। তাঁরা ম্যাচ আয়োজনের প্রস্তুতি, হঠাৎ করে বাধার মুখে পড়া এবং খেলোয়াড়দের মানসিক হতাশার কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।

সেদিনের পরিস্থিতির বর্ণনা দিতে গিয়ে রাকিব ভূঁইয়া বলেন, “ম্যাচ আয়োজনের বিষয়ে আমি আগেই স্থানীয় প্রশাসনকে জানিয়েছিলাম। এ নিয়ে লিখিত আবেদনও জমা দিয়েছিলাম। কিন্তু ৪ অক্টোবর রাতে আমাকে জানানো হয়, একটি পক্ষ খেলা বন্ধের দাবি তুলেছে। পরদিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়, পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। খেলা আয়োজনের পর কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে এর দায়ভারও আমাকে নিতে হবে বলে জানানো হয়। আসলে আমি ম্যাচটি বাতিল করতে চাইনি। কিন্তু সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা এবং খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি আয়োজন করা সম্ভব হয়নি।”

ম্যাচটি স্থগিত হওয়ায় চরম হতাশ হয়েছেন স্বপ্নচূড়ার অধিনায়ক সাবানা আক্তার। হাওরাঞ্চলের মেয়েদের খেলাধুলায় যুক্ত হতে গিয়ে কতটা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, সেই অভিজ্ঞতার কথা জানান তিনি। অনেক খেলোয়াড় নৌকায় দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে কিংবা হেঁটে অনুশীলনে আসেন। পারিবারিক ও আর্থিক নানা সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও তাঁরা ফুটবলের প্রতি তাদের ভালোবাসা ধরে রেখেছেন।

এত বাধা পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়ার পরও ম্যাচটি খেলতে না পারার গভীর আক্ষেপ প্রকাশ করেন সাবানা। তিনি প্রশ্ন করেন, “আমাদের এভাবে যদি পিছিয়ে রাখা হয়, তাহলে আমরা মেয়েরা আবার ফুটবলে এগিয়ে যাব কীভাবে?”