সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায় মেয়ের জন্মদিন উদযাপনের জন্য বাড়িতে বাউল গানের আয়োজন করেছিলেন যুক্তরাজ্যপ্রবাসী শওকত আলী। তবে স্থানীয় দুই ব্যক্তির থানায় লিখিত অভিযোগ এবং পুলিশের হস্তক্ষেপে শেষ পর্যন্ত সেই গানের অনুষ্ঠানটি বন্ধ করে দিতে হয় আয়োজককে। অনুষ্ঠানে দুই নারী বাউলশিল্পীর গান পরিবেশনের কথা ছিল।

ঘটনাটি ঘটেছে বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের হাতিয়া-রাধানগর গ্রামে। জানা গেছে, যুক্তরাজ্যপ্রবাসী শওকত আলী একজন সংগীতপ্রেমী এবং তিনি নিজেও গান করেন। আগামী শুক্রবার তার পুনরায় যুক্তরাজ্যে ফিরে যাওয়ার কথা। মেয়ের জন্মদিন উপলক্ষে বৃহস্পতিবার তিনি তার বাড়িতে ছোট পরিসরে একটি গানের অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করেন। এই আয়োজনে স্থানীয় দুই নারী বাউলশিল্পী তানিশা ও নিলার গান পরিবেশনের কথা ছিল। অনুষ্ঠানের জন্য পাশের আকিলশা বাজারের অজুদ মিয়ার ডেকোরেটর থেকে মাইকসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হয়েছিল।

তবে এই আয়োজনের কথা জানতে পেরে আপত্তি জানান স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা। গত বুধবার (২১ অক্টোবর) গ্রামবাসীর পক্ষে আতাহার আলী রাহাত ও কামরুল হাসান মিটু দিরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলামের কাছে একটি লিখিত আবেদন জমা দেন। ওই আবেদনে তারা অনুষ্ঠানটি বন্ধ অথবা স্থগিত করার অনুরোধ জানান।

আবেদনে উল্লেখ করা হয়, “হাতিয়া গ্রাম দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও ইসলামী ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত। গ্রামে একটি আলিম মাদ্রাসা, একজন আল্লাহর ওলির মাজার এবং অনেক আলেম-ওলামার বসবাস রয়েছে।” সেখানে গানের আয়োজনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে দাবি করা হয়।

আবেদনকারীরা আরও জানান, আয়োজকদের প্রচার অনুযায়ী অনুষ্ঠানে নারী শিল্পীদের দিয়ে গান পরিবেশনের ব্যবস্থা ছিল। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, এই আয়োজন অব্যাহত থাকলে এলাকায় উত্তেজনা ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। গ্রামের ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানান তাঁরা।

অভিযোগকারী কামরুল হাসান মিটু জানান, তাদের গ্রামে আগে গান-বাজনা হলেও এখন আর হয় না। গ্রামে মসজিদ-মাদ্রাসা রয়েছে এবং প্রতিবছর ওয়াজ মাহফিল হয়। নারীদের নিয়ে গানের আয়োজনের কারণে গ্রামের মানুষ ক্ষুব্ধ ছিলেন এবং বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা ছিল বলে দাবি করেন তিনি। এই কারণেই বুধবার রাতে গ্রামের মানুষের পক্ষে থানায় অভিযোগ করা হয়। পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে গানের আয়োজন বন্ধ হয়েছে বলে জানান তিনি।

আয়োজক শওকত আলী জানান, মেয়ের জন্মদিন উপলক্ষে বাড়িতে ছোট পরিসরে গানের আয়োজন করেছিলেন তিনি। এ নিয়ে আপত্তি ওঠে এবং থানায় অভিযোগ করা হয়। থানা থেকে ফোন পাওয়ার পর সামাজিক সম্প্রীতির কথা বিবেচনা করে তিনি গানের আয়োজন বন্ধ করে দেন।

দিরাই থানার ওসি আমিনুল ইসলাম বলেন, “হাতিয়া গ্রামে গানের আয়োজন নিয়ে আপত্তি ওঠার পর আয়োজকদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। তারা গান-বাজনা করবেন না বলে আশ্বস্ত করেছেন। এ কারণে অভিযোগের বিষয়টি মীমাংসা হয়েছে।”

উল্লেখ্য, স্থানীয় একটি পক্ষের আপত্তির মুখে গত ৫ অক্টোবর দিরাই উপজেলা স্টেডিয়ামে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচও স্থগিত করা হয়েছিল। দিরাইয়ের স্বপ্নচূড়া স্পোর্টিং ক্লাব ও সিলেটের জারা স্পোর্টিং ক্লাবের মেয়েদের মধ্যে ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। ওই সময় আয়োজক স্বপ্নচূড়া স্পোর্টিং ক্লাবের সভাপতি ও কোচ রাকিব আহমেদ ভূঁইয়া জানিয়েছিলেন, খেলার আগের রাতে কয়েকজন ব্যক্তি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে গিয়ে ম্যাচ বন্ধের দাবি জানান। পরে ইউএনওর সঙ্গে আলোচনার পর ম্যাচটি স্থগিত করা হয়।