ন্যাশনাল হোটেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এস এম মুজাহিদুল আলমের লেখা একটি নিবন্ধে উঠে এসেছে দেশের পর্যটন খাতের বর্তমান সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জের কথা।
বাংলাদেশে পর্যটন ও আতিথেয়তা খাতের দ্রুত বিকাশ ঘটছে। এই প্রবৃদ্ধি কেবল পরিসরের দিক থেকে নয়, বরং অর্থনৈতিকভাবেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সাপ্তাহিক ছুটির দিন কিংবা বিভিন্ন উৎসবে দেশের শীর্ষস্থানীয় পর্যটনকেন্দ্রগুলো এবং নতুন গড়ে ওঠা বিনোদনকেন্দ্রগুলোতে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়। এই ক্রমবর্ধমান চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে দেশেই এখন আন্তর্জাতিক মানের বেশ কিছু রিসোর্ট, হোটেল, মোটেল, রেস্তোরাঁ ও ট্রাভেল এজেন্সি গড়ে উঠেছে। এর ফলে স্থানীয় পর্যটন ও আতিথেয়তা খাতে তরুণ প্রজন্মের জন্য কর্মসংস্থানের এক বিশাল সুযোগ তৈরি হয়েছে। শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বিশেষ করে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে দক্ষ জনবলের চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আশাব্যঞ্জক দিকটি হলো, অন্যান্য প্রচলিত পেশার মতো এখানে ডিগ্রি অর্জনের পর বেকার থাকার ঝুঁকি খুব একটা নেই। সঠিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে পারলে তরুণেরা খুব দ্রুতই একটি সমৃদ্ধ ও দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে পারেন।
তবে এই খাতের একটি বড় ও উদ্বেগজনক সংকট হলো উপযুক্ত ও দক্ষ কর্মীর অভাব। দেশের পর্যটন ও হোটেল শিল্পে কর্মসংস্থানের বিপুল সুযোগ থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়ই তাদের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ লোকবল খুঁজে পায় না। অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পদের জন্য নিয়োগ নিশ্চিত থাকলেও চাহিদামাফিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মী পাওয়া যায় না। অথচ বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, মাত্র তিন মাসের একটি শর্ট কোর্স বা মৌলিক প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেও অনেকে কোনো না কোনো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হচ্ছেন।
সমস্যাটি মূলত আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে। সমাজে কিছু নেতিবাচক ধারণা বা ‘ট্যাবু’ রয়ে গেছে। যেমন, “হোটেল বা রেস্তোরাঁর কাজে যুক্ত হওয়াকে অনেকে ছোট করে দেখেন।” অথচ বাস্তব চিত্র হলো, বর্তমান সময়ে বিশ্বব্যাপী এই খাতের আয় অত্যন্ত আকর্ষণীয়। পেশাগত মর্যাদার পাশাপাশি সঠিক প্রশিক্ষণ এবং ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জন—এই দুটি ধাপ পার করতে পারলেই দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।
পর্যটন ও আতিথেয়তায় দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে ১৯৭৪ সাল থেকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের অধীনস্থ ন্যাশনাল হোটেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ট্রেনিং ইনস্টিটিউট। তরুণেরা যেন কেবল স্বল্পমেয়াদি কাজ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার লক্ষ্য নিয়ে এই খাতে আসেন, সেই উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে ১১টি পেশাদার কোর্স পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়া আরও ৩টি নতুন আন্তর্জাতিক মানের কোর্স বড় আকারে সাজানো হচ্ছে। এখানে সাধারণ ৬ মাসের ন্যাশনাল সার্টিফিকেট কোর্সগুলোর মাধ্যমে হোটেল কেন্দ্রিক যেকোনো বিভাগে কাজের যোগ্যতা অর্জন করা সম্ভব। পাশাপাশি রয়েছে ১ থেকে ২ বছর মেয়াদি উচ্চতর ডিপ্লোমা কোর্স। ডিপ্লোমা ইন হোটেল ম্যানেজমেন্ট, প্রফেশনাল শেফ কোর্স, ডিপ্লোমা ইন কালিনারি আর্টস অ্যান্ড ক্যাটারিং ম্যানেজমেন্ট, ডিপ্লোমা ইন ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট এবং প্রফেশনাল বেকিং কোর্সের মতো বিশেষায়িত প্রোগ্রামগুলো শিক্ষার্থীদের পেশাগতভাবে পরিপক্ব করে তোলে। এছাড়া ফুড অ্যান্ড বেভারেজ প্রডাকশন, ফুড অ্যান্ড বেভারেজ সার্ভিস, ফ্রন্ট অফিস অ্যান্ড সেক্রেটারিয়াল অপারেশনস, বেকারি অ্যান্ড পেস্ট্রি প্রডাকশন, হাউসকিপিং অ্যান্ড লন্ড্রি অপারেশনস, ট্যুর গাইড অ্যান্ড ট্রাভেল এজেন্সি অপারেশনস এবং কম্পিউটার লিটারেসির মতো বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণে শিক্ষার্থীরা ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পান।
বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও পর্যটন ও হোটেল ম্যানেজমেন্টবিষয়ক প্রাতিষ্ঠানিক কোর্স চালু হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীরা মূলত তাত্ত্বিক ও গবেষণামূলক বিষয়ে গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। তবে হসপিটালিটি একটি সম্পূর্ণ সেবা ও প্র্যাকটিক্যাল নির্ভর খাত হওয়ায় শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জনেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলে না। একটি হোটেল কীভাবে বাস্তবিক অর্থে পরিচালনা করতে হয়, অতিথি সেবা নিশ্চিত করতে হয় এবং সংকট মোকাবিলা করতে হয়, এসব বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে প্র্যাকটিক্যাল বা ব্যবহারিক শিক্ষার সংযোগ আরও বাড়ানো দরকার। বিশেষায়িত ইনস্টিটিউটগুলো ক্লাসরুমের শিক্ষার চেয়ে ব্যবহারিক ল্যাব ও হাতে-কলমে প্রশিক্ষণকে বেশি প্রাধান্য দেয়, যা একজন শিক্ষার্থীকে কর্মক্ষেত্রের বাস্তব চ্যালেঞ্জের জন্য প্রথম দিন থেকেই তৈরি করে।
দেশের পর্যটনশিল্পকে আরও এগিয়ে নিতে এবং আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য। সরকার প্রায়ই পর্যটন খাতের উন্নয়নে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রকল্প হাতে নেয়। এসব প্রকল্পের পাঠ্যক্রম, ব্যবহারিক সুবিধা ও সিলেবাস আধুনিক ও বিশ্বমানের করা প্রয়োজন। প্রশিক্ষণ কোর্সগুলোর মান নিয়ন্ত্রণ এবং জাতীয় কারিকুলামের সঙ্গে সমন্বয় করা গেলে সনদের গ্রহণযোগ্যতা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে বহুগুণ বাড়বে।
শিক্ষার্থী ও তরুণদেরও মনে রাখতে হবে যে, কেবল একটি সনদ অর্জনই যথেষ্ট নয়। বরং আন্তর্জাতিক মানের সেবা দেওয়ার ভাষাগত দক্ষতা, পেশাদার আচরণ ও ব্যবহারিক অভিজ্ঞতার ওপর নজর দিতে হবে। সঠিক দিকনির্দেশনা, উন্নত প্রশিক্ষণ এবং দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের মাধ্যমে আমাদের তরুণ সমাজ পর্যটন ও হসপিটালিটি খাতকে সমৃদ্ধ করে নিজেদের এবং দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় এক অবিস্মরণীয় ভূমিকা রাখতে পারেন।