পবিত্র বাইতুল্লাহ জিয়ারতের প্রবল আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বাংলাদেশ ছেড়েছিলেন মুফতি মুহাম্মাদ নাসরুল্লাহ বদর। মক্কা ও মদিনার পবিত্র আঙিনায় পৌঁছানোর স্বপ্ন ছিল তার হৃদয়ে। বিমানের জানালা দিয়ে বাইরের আকাশ দেখতে দেখতে তিনি লিখেছিলেন, ‘আর মাত্র এক ঘণ্টার অপেক্ষা। এরপরেই পৌঁছে যাব সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে।’
কিন্তু সেই স্বপ্নের পথে যাত্রাই হয়ে উঠল তার জীবনের শেষ সফর। শনিবার (১০ অক্টোবর) সৌদি আরবের রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতিদের চালানো এক হামলায় তিনি প্রাণ হারান।
মৃত্যুর আগমুহূর্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তার দেওয়া একের পর এক পোস্ট এখন স্বজন, শুভাকাঙ্ক্ষী ও অনুসারীদের কাছে এক গভীর বেদনার স্মৃতি। আল্লাহর ঘরে যাওয়ার আনন্দ, নিরাপদ সফরের প্রার্থনা এবং পবিত্র ভূমিতে পৌঁছানোর আকুলতা ফুটে উঠেছিল তার প্রতিটি লেখায়।
শনিবার সকালে বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন মুফতি মুহাম্মাদ নাসরুল্লাহ বদর। দেশ ছাড়ার আগে ফেসবুকে তিনি লিখেছিলেন, ‘গুডবাই, প্রিয় বাংলাদেশ! ফেলে যাচ্ছি প্রিয় মাতৃভূমি, হৃদয়ে নিয়ে অগণিত স্মৃতি আর একরাশ আবেগ। গন্তব্য এবার পবিত্র হারামাইনের পুণ্যভূমি।’
সেদিন সকাল ৯টা ৩৪ মিনিটে ঢাকা থেকে রিয়াদের উদ্দেশে যাত্রার কথা জানিয়ে তিনি সবার কাছে দোয়া চেয়েছিলেন। লিখেছিলেন, ‘ফী আমানিল্লাহ! ঢাকা টু রিয়াদ, সৌদি আরব। নিরাপদ সফরে দোয়ার মুহতাজ।’
বিমান থেকে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে দুপুর ২টা ৪২ মিনিটে আরেকটি পোস্ট দেন তিনি। সেখানে লেখেন, ‘স্বপ্নের দিকে! একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছি। আকাশের অসীম নীলিমায় উড়ে চলেছি স্বপ্নের গন্তব্যের পানে।’
পোস্টে তিনি আরও লিখেছিলেন, ‘জানালার ওপাশে বিস্তীর্ণ আকাশ, হৃদয়জুড়ে আনন্দ আর অন্তরে বাইতুল্লাহ জিয়ারতের গভীর আকাঙ্ক্ষা। প্রতিটি মুহূর্ত যেন স্মৃতির পাতায় চিরদিনের জন্য লিখে রাখার মতো।’
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে পৌঁছানোর অপেক্ষায় থাকা নাসরুল্লাহ বদর লিখেছিলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ! আর মাত্র এক ঘণ্টার অপেক্ষা। এরপরেই পৌঁছে যাব সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে। এরপর শুরু হবে হৃদয়ের আরও কাছের সেই স্বপ্নময় গন্তব্যের পথে এগিয়ে চলা।’
এরপর বিকেল ৫টায় রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা জানান তিনি। লেখেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ! আমাদের কাফেলা নিরাপদে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে।’
সেখানে জোহরের নামাজ আদায় করার কথা জানান তিনি এবং একই সঙ্গে বাকি সফর নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন হওয়ার জন্য মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন। কিন্তু পবিত্র বাইতুল্লাহ জিয়ারতের সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণের আগেই রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলায় তার মৃত্যুর খবর আসে। যে বিমানবন্দরে পৌঁছে নিরাপদ সফরের জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেছিলেন, সেখানেই থেমে যায় তার জীবনের পথচলা।
এর আগের রাতেও স্বপ্নের সফর নিয়ে আবেগঘন পোস্ট দিয়েছিলেন তিনি। ৯ অক্টোবর রাত ১১টা ২৭ মিনিটে লিখেছিলেন, ‘এবার স্বপ্নের পথে যাত্রার পালা! আল্লাহ চাহেন তো, অল্প সময়ের মধ্যেই শুরু হবে স্বপ্নের নগরীর উদ্দেশে বহুল কাঙ্ক্ষিত সফর।’
সেই পোস্টে তার আকাঙ্ক্ষা ছিল পবিত্র কাবা ও মদিনায় মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মসজিদের আঙিনা দেখার। সবার কাছে বিশেষ দোয়া চেয়ে তিনি লিখেছিলেন, ‘হৃদয়জুড়ে একরাশ আবেগ, চোখজুড়ে পবিত্র বাইতুল্লাহ ও মদিনাতুর রাসূলের (সা.) পবিত্র আঙিনা দেখার স্বপ্ন!’
একই রাতে প্রস্তুতির মুহূর্তগুলোকে স্মৃতির অংশ করে রাখার কথাও লিখেছিলেন নাসরুল্লাহ বদর। তার দোয়া ছিল, আল্লাহ যেন উমরার সফর সহজ করে দেন এবং তা কবুল করেন। কিন্তু তার ফেসবুকের সেই স্বপ্নমাখা কথাগুলো এখন এক অপূর্ণ যাত্রার সাক্ষ্য। পবিত্র ভূমিতে যাওয়ার আনন্দ নিয়ে যিনি সবার কাছে দোয়া চেয়েছিলেন, তার জন্যই এখন প্রার্থনায় শামিল হচ্ছেন স্বজন, শুভাকাঙ্ক্ষী ও অনুসারীরা।
উল্লেখ্য, সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শনিবার রাতে হওয়া হামলায় দুই বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
রোববার (১১ অক্টোবর) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, নিহতদের মধ্যে একজন ওমরাহ যাত্রী নাসরুল্লাহ বদরপুরী, তিনি কুমিল্লার বাসিন্দা। আরেকজন প্রবাসী শ্রমিক মোহাম্মদ শহীদ, তার বাড়ি বগুড়া।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, শনিবার রাতে কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এ হামলার ঘটনা ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই ওই দুই বাংলাদেশি প্রাণ হারান। নিহতদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি আইনি ও অন্যান্য প্রক্রিয়ার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং রিয়াদে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।
এদিকে, এ ঘটনায় দুই বাংলাদেশিসহ মোট ১২ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে সৌদি আরবের জেনারেল অথরিটি অব সিভিল অ্যাভিয়েশন (জিএসিএ)।
সংস্থাটির এক বিবৃতিতে বলা হয়, নিহতদের মধ্যে চারজন সৌদি নাগরিক, দুইজন বাংলাদেশি এবং যুক্তরাষ্ট্র, মিশর, জর্ডান, সিরিয়া, ফিলিস্তিন ও সুদানের একজন করে নাগরিক রয়েছেন।
হামলার পর নিরাপত্তার কারণে আগামী ১২ অক্টোবর বাংলাদেশ সময় রাত ৩টা পর্যন্ত বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় বিমান চলাচল ও যাত্রীসেবায় বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে।