সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি সশস্ত্র গোষ্ঠীর চালানো এক ভয়াবহ হামলায় দুজন বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হয়েছেন। এই একই ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ২৪ জন বাংলাদেশি। সম্প্রতি এই হতাহত ব্যক্তিদের বিস্তারিত পরিচয় জানা গেছে।
পররাষ্ট্র এবং প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, নিহত দুই ব্যক্তি হলেন মো. শাহেদ আহম্মদ ও মো. নাসরুল্লাহ বদরপুরি।
নিহত শাহেদের বাড়ি বগুড়া জেলার শাহজাহানপুর উপজেলার মাদলা গ্রামে। তাঁর বাবার নাম মো. রফিকুল ইসলাম এবং মায়ের নাম শাহেরা বেগম। তিনি সৌদি আরবের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের জেদ্দা প্রকল্পে প্লাম্বার হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং তাঁর বৈধ কাজের অনুমতিপত্র (ইকামা) ছিল। সম্প্রতি ভাইয়ের মৃত্যুর পর ছুটি কাটিয়ে দেশে অবস্থান করছিলেন তিনি। সেখান থেকে রিয়াদ হয়ে পুনরায় কর্মস্থল জেদ্দায় ফেরার পথে এই দুর্ঘটনার শিকার হন তিনি।
অপর নিহত নাসরুল্লাহর বাড়ি কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার বদরপুর গ্রামে। তাঁর বাবার নাম মোহাম্মদ উল্লাহ ও মায়ের নাম জাহানারা বেগম। তিনি ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন এবং রিয়াদ থেকে জেদ্দায় যাওয়ার জন্য বিমানবন্দরে অপেক্ষা করার সময় হামলায় প্রাণ হারান।
রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, হামলায় আহত ২৪ বাংলাদেশির মধ্যে ১১ জন সৌদি আরবে কর্মরত এবং ১৩ জন ওমরাহ ভিসায় দেশটিতে যাওয়া ব্যক্তি। বর্তমানে তাঁদের রিয়াদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে। আহতদের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ এবং যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে বাংলাদেশ দূতাবাস।
হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন তিন বাংলাদেশি হলেন হাফেজ হাসান, কাজী নুরুল্লাহ ও মো. ওমর ফারুক। হাফেজ হাসানের বাড়ি ঢাকার কামরাঙ্গীরচরের পূর্ব রসুলপুর এলাকায়; তাঁর বাবার নাম ইসহাক ও মায়ের নাম কমলা বেগম। তিনি ওমরাহ ভিসায় সৌদি আরবে গিয়েছিলেন এবং ট্রানজিটে রিয়াদ থেকে জেদ্দায় যাওয়ার জন্য বিমানবন্দরে অপেক্ষায় ছিলেন। কাজী নুরুল্লাহর বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার ঘাটুরা গ্রামে; তাঁর বাবার নাম কাজী জয়নাল মিয়া এবং মায়ের নাম শিউলি বেগম। তিনিও ওমরাহ ভিসায় সৌদি আরবে গিয়েছিলেন এবং ট্রানজিটে রিয়াদ থেকে জেদ্দায় যাওয়ার জন্য বিমানবন্দরে অপেক্ষায় ছিলেন। আর মো. ওমর ফারুক সৌদি আরবে কর্মরত একজন বাংলাদেশি, যিনি রিয়াদ থেকে জেদ্দায় কর্মস্থলে যাওয়ার জন্য বিমানবন্দরে অবস্থান করছিলেন। দূতাবাসের প্রতিনিধিরা তাঁদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন এবং তাঁদের শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল বলে জানিয়েছেন।
অন্য একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন সাফফাত রহমান ও মো. দাউদুল ইসলাম। তাঁদের মধ্যে সাফফাত বর্তমানে অচেতন অবস্থায় আছেন। সাফফাতের বাড়ি নওগাঁর রানীনগর উপজেলার বদরপুর গ্রামে; তাঁর বাবার নাম মো. মোখলেসার রহমান এবং মায়ের নাম রোকেয়া বেগম। দাউদুলের বাড়ি কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার বদরপুর গ্রামে; তাঁর বাবার নাম মো. মহিব উল্লাহ এবং মায়ের নাম রোকেয়া বেগম। এই দুজনই ওমরাহ ভিসায় সৌদি আরবে গিয়েছিলেন এবং ট্রানজিটে রিয়াদ থেকে জেদ্দায় যাওয়ার জন্য বিমানবন্দরে অপেক্ষায় ছিলেন।
একই হাসপাতালে আরও দুজন বাংলাদেশি চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাঁরা হলেন মো. সাইদুল ইসলাম সৌরভ ও আবুল মনসুর মো. রিয়াজ উদ্দীন। সাইদুলের বাড়ি ঢাকার লালবাগের আমলিগোলা এলাকায়; তাঁর বাবার নাম মো. আবদুল হাই এবং মায়ের নাম রহিমা বেগম। আবুল মনসুর মো. রিয়াজ উদ্দীনের বাড়ি ঢাকার মিরপুরের জনতা হাউজিং এলাকায়; তাঁর বাবার নাম মো. আবুল ফজল এবং মায়ের নাম তাজকেরা বেগম। তাঁরা দুজনও ওমরাহ ভিসায় সৌদি আরবে গিয়েছিলেন এবং ট্রানজিটে রিয়াদ থেকে জেদ্দায় যাওয়ার জন্য বিমানবন্দরে অপেক্ষায় ছিলেন।
আরেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন মো. আবদুল্লাহ। তাঁর বাড়ি ঢাকার ডেমরা এলাকার পূর্ব বক্সনগরে। তাঁর বাবার নাম মো. মোখতার আহমেদ এবং মায়ের নাম ফজিলাতুন নেসা। তিনি ওমরাহ ভিসায় সৌদি আরবে গিয়েছিলেন।
সুলাইমান আল হাবিব হাসপাতালের তাখাসসুসি শাখায় তিন বাংলাদেশি চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাঁরা হলেন আরমান হোসেন, মোহাম্মদ ও ফয়সাল আহমদ আবদুল হক। আরমানের বাড়ি ঢাকার কামরাঙ্গীরচরের ইব্রাহিমনগর এলাকায়; তাঁর বাবার নাম মো. মজিবুল হক এবং মায়ের নাম শামসুন নাহার। তিনি ওমরাহ ভিসায় সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। অন্যদিকে মোহাম্মদ ও ফয়সাল সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশি এবং তাঁদের বৈধ কাজের অনুমতিপত্র (ইকামা) ছিল।
অন্য হাসপাতালে চিকিৎসাধীন একজন বাংলাদেশি হলেন মো. রফিক মিয়া। তিনি সৌদি আরবে কর্মরত এবং তাঁর বৈধ কাজের অনুমতিপত্র (ইকামা) ছিল।
আরেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তিন বাংলাদেশি হলেন ইসমাইল হোসেন, মো. মিসবাহ উদ্দীন হীরা ও মো. রায়হানুল ইসলাম। ইসমাইল ও রায়হানুল সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশি, তবে মিসবাহ উদ্দীন হীরার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
অন্য একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন পাঁচ বাংলাদেশি হলেন সালমা আক্তার, মো. শাহাদাত হোসেন, মোশাহাদ আহমেদ সৈকত, জাহিদ আহমেদ ও সোবেহ সাদেক মো. শাহজাহান সরকার। তাঁরা সবাই সৌদি আরবে কর্মরত এবং তাঁদের বৈধ কাজের অনুমতিপত্র (ইকামা) ছিল।
আরেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন দুজন হলেন মো. আসাদুল ইসলাম ও মো. জামাল। আসাদুল সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশি, তবে মো. জামালের বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায়নি।
এছাড়া একটি হাসপাতালে নাজমা আক্তার নামে একজন বাংলাদেশির চিকিৎসাধীন থাকার তথ্য থাকলেও তাঁর বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
আরেক হাসপাতালে উমায়ের ও আবদুল্লাহ কামিল নামে দুই বাংলাদেশি চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আহত ব্যক্তিদের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ এবং তাঁদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে দূতাবাসের যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
হামলার পর ফ্লাইট চলাচল ব্যাহত হওয়ায় রিয়াদ বিমানবন্দরে প্রায় ৫০০ বাংলাদেশি যাত্রী আটকে পড়েন। তাঁদের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে যাওয়া যাত্রী, ওমরাহ পালন করতে যাওয়া ব্যক্তি এবং সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা যাত্রীরা ছিলেন।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাস বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ, সৌদি ইমিগ্রেশন ও সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থাগুলোর সহায়তায় আটকে পড়া যাত্রীদের আবাসন, খাবার ও বিকল্প যাত্রার ব্যবস্থা করেছে। দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, ৩ নম্বর টার্মিনালে থাকা প্রায় ১০০ যাত্রীকে মেরিয়ট ও রেডিসন হোটেল এবং প্রিন্সেস নূরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে থাকার ও খাবারের ব্যবস্থা করা হয়।
এ ছাড়া ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে ইহরামের পোশাক পরে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া ৬৭ জনকে বিশেষ বাসে রিয়াদ থেকে জেদ্দায় পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। রিয়াদ থেকে ঢাকাগামী সৌদিয়া এয়ারলাইনসের বাতিল হওয়া এসভি৮০৪ ফ্লাইটের প্রায় ৪০০ বাংলাদেশি যাত্রীকে দাম্মামের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে রিয়াদ থেকে বাহরাইনগামী সৌদিয়া এয়ারলাইনসের দুই বাংলাদেশি কর্মীকে আল খোবারের স্থলসীমান্ত দিয়ে বাহরাইন যেতে সহায়তা করা হয়েছে।