দ্রুত সময়ে রক্ত পরীক্ষা এবং সরকারি ব্যবস্থাপনায় কম খরচে নির্ভুল পরীক্ষার জন্য ২০২৩ সালে কেন্দ্রীয় ঔষধাগার (সিএমএসডি) থেকে ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালে একটি হেমাটোলজি অ্যানালাইজার মেশিন (রক্ত পরীক্ষার মেশিন) হস্তান্তর করা হয়। হস্তান্তরের এক মাস পরই যন্ত্রটির প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপাদান (রিএজেন্ট) সংকট দেখা দেয়। এরপর গত তিন বছর ধরে যন্ত্রটিতে রিএজেন্ট সরবরাহ করা হয়নি। ফলে যন্ত্রটি রোগীদের কোনো কাজে আসছে না।

রোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এলেও রক্ত পরীক্ষা করাতে তাদের বাইরে যেতে হচ্ছে। এতে অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি বাড়ছে ভোগান্তি। তাদের অভিযোগ, হাসপাতালে রক্ত পরীক্ষার মেশিন থাকলেও সেটি কাজে আসছে না। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জনবল সংকটের কথা বলছে। এতে সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়ছেন।

রোববার (১১ অক্টোবর) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্যাথলজি বিভাগের সামনে রোগীদের ভিড়। দীপু নামে এক রোগীর স্বজন বলেন, ‘সকাল ১০টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। শুধু আমি নই, আমার মতো অনেকেই সকাল থেকে দাঁড়িয়ে আছেন। তিন ঘণ্টা পর চিকিৎসকের কক্ষে ঢোকার সুযোগ পেয়েছি। চিকিৎসক রক্ত পরীক্ষা দিয়েছেন। পরীক্ষা করানোর পর চিকিৎসককে দেখাতে পারব কি না, তা নিয়ে চিন্তায় আছি। দ্রুত রিপোর্ট পেলে হয়তো চিকিৎসককে দেখাতে পারতাম।’

গত দুই দিন ধরে জ্বর নিয়ে সদর হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন বেগুনবাড়ি থেকে আসা রনজু আলী। তিনি বলেন, ‘আমি ভালোভাবে হাঁটতে পারি না। জ্বরে আমার অবস্থা অনেক খারাপ। ডাক্তার অনেক পরীক্ষা দিয়েছেন। কিছু পরীক্ষা এখানে করিয়েছি, আর কিছু বাইরে থেকে করাতে হবে। শুনেছি, এখানে রক্ত পরীক্ষার মেশিন আছে, তবে এটি বন্ধ। বাইরে পরীক্ষা করাতে ৫০০ টাকা চেয়েছিল। অনেক অনুরোধ করার পর ৪০০ টাকায় করিয়েছি। এখানে রক্ত পরীক্ষা করা গেলে টাকা বেঁচে যেত। অসুস্থ অবস্থায় আমাকে বাইরে যেতে হতো না। আমরা চাই, রক্ত পরীক্ষার মেশিনটি দ্রুত সচল করা হোক।’

সদর উপজেলার ভুল্লি থেকে আসা এক রোগীর স্বজন রোকেয়া বেগম বলেন, ‘রোগীর সেবা করব, নাকি পরীক্ষা করাতে দৌড়াব? ডাক্তার দেখিয়ে পরীক্ষা দিচ্ছেন। বাইরে গিয়ে পরীক্ষা করিয়ে ফিরে আসতে আসতে আবার ডাক্তার থাকেন না। কারণ, নির্দিষ্ট সময়ের পর বহির্বিভাগের চিকিৎসকেরা চেম্বার ছেড়ে চলে যান। এতে একদিকে যেমন সময় ব্যয় হচ্ছে, অন্যদিকে ভোগান্তি বাড়ছে। বেশির ভাগ সময় পরীক্ষার রিপোর্ট নিয়ে চিকিৎসককে দেখাতে এক দিন পর যেতে হয়। এসব সমস্যার সমাধান চাই আমরা।’

পৌরসভার জমিদারপাড়ার জনি রহমান নামে এক রোগী বলেন, ‘আমাদের সদর হাসপাতালটি এখন ২৫০ শয্যায় উন্নীত হয়েছে। সেবার মানও বেড়েছে অনেক। তবে অনেক পরীক্ষার মেশিন এখানে থাকলেও জনবল সংকটের কারণে সেগুলো ব্যবহার করা যাচ্ছে না। তাই বেশির ভাগ পরীক্ষা বাইরে থেকে করিয়ে আনতে হয়, এতে খরচও বেশি পড়ে। এখানে পরীক্ষা করা গেলে দ্রুত রিপোর্ট পাওয়া যেত। সময়মতো চিকিৎসককে পরীক্ষার রিপোর্ট দেখানো যেত।’

সদর হাসপাতালের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব ইনচার্জ) ফণীন্দ্রনাথ মণ্ডল বলেন, হাতে পরীক্ষা করতে যেখানে টেকনোলজিস্টদের প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগে, সেখানে হেমাটোলজি অ্যানালাইজার মেশিনের মাধ্যমে মাত্র দুই মিনিটে শতভাগ নিখুঁত রিপোর্ট দেওয়া যায়। তা ছাড়া হাতে করা পরীক্ষায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ নির্ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। প্রতিদিন গড়ে এ মেশিনে এক হাজার থেকে দেড় হাজার রোগীর রক্ত পরীক্ষা করা সম্ভব। তবে রিএজেন্টের অভাবে এটি চালু করা যাচ্ছে না। প্যাথলজি বিভাগে স্থাপনের এক মাস পরই এটি বন্ধ হয়ে যায়।

এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালের সিভিল সার্জন ডা. নূর নেওয়াজ আহমেদ বলেন, রক্ত পরীক্ষা করাতে গিয়ে রোগীরা কিছুটা ভোগান্তিতে পড়ছেন। রিএজেন্টের জন্য দরপত্র দেওয়া হয়েছে। রিএজেন্ট পাওয়া গেলে মেশিনটি আবার চালু হবে।