ব্রিটেনের ১৭৭ বছরের ঐতিহ্যবাহী ফার্মেসি ও খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান বুটস কিনে নিচ্ছে কানাডার ধনকুবের ওয়েস্টন পরিবার। নতুন মালিকানায় আসার পর প্রতিষ্ঠানটিতে বেশ কিছু আমূল পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে দোকানের আধুনিকায়ন, স্বাস্থ্যসেবার পরিধি সম্প্রসারণ এবং গ্রাহকসেবার মানোন্নয়নে বিনিয়োগ বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে নতুন মালিকপক্ষের। তবে বর্তমান সময়ে ক্রেতাদের অনলাইন কেনাকাটার প্রতি ক্রমবর্ধমান ঝোঁক এবং বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার বিষয়টি প্রতিষ্ঠানটির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যুক্তরাজ্যে ওষুধ, স্বাস্থ্যসেবা ও সৌন্দর্যপণ্যের ক্ষেত্রে অত্যন্ত বিশ্বস্ত নাম বুটস। প্রায় ৮৯০ কোটি ডলারে প্রতিষ্ঠানটি কিনে নিচ্ছে ওয়েস্টন পরিবারের হোল্ডিং কোম্পানি উইটিংটন ইনভেস্টমেন্টস। সম্প্রতি এই অধিগ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান সাইকামোর পার্টনার্স এবং পেসিনা পরিবারের কাছ থেকে বুটসের মালিকানা গ্রহণ করছে তারা। আগামী ২০২৭ সালের শুরুর দিকে এই চুক্তিটি চূড়ান্তভাবে সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।

১৮৪৯ সালে নটিংহামে একটি ভেষজ ওষুধের দোকান হিসেবে বুটসের যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে যুক্তরাজ্যজুড়ে তাদের প্রায় ১ হাজার ৮০০টি দোকান রয়েছে এবং ৫১ হাজার কর্মী এই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। ওষুধ ও টিকা সরবরাহের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা, সৌন্দর্যপণ্য, প্রসাধনী এবং ভ্রমণের প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিক্রির মাধ্যমে তারা তাদের ব্যবসা পরিচালনা করে।

দোকান আধুনিকায়নে বিনিয়োগ

নতুন মালিকদের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হবে বুটসের শাখাগুলোর আধুনিকায়ন। তবে ঠিক কী ধরনের পরিবর্তন আনা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

খুচরা বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান গ্লোবালডেটা রিটেইলের সহযোগী পরিচালক সোফি উইলমট বলেন, “বড় কয়েকটি দোকানে সৌন্দর্যপণ্যের বিভাগ নতুন করে সাজানো হয়েছে। এতে ক্রেতারা অনেকটা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের অভিজ্ঞতা পাচ্ছেন।” তিনি আরও জানান, ২০২৩ সালে লন্ডনের ব্যাটারসি পাওয়ার স্টেশনে সৌন্দর্যপণ্যের প্রথম বিশেষায়িত দোকান খোলার পর ১৮০টির বেশি দোকানে এই বিভাগের আধুনিকায়ন করেছে বুটস।

তবে ছোট দোকানগুলোতে আরও বিনিয়োগের প্রয়োজন বলে মনে করেন উইলমট। তাঁর মতে, সব দোকানে একই ধরনের পরিবেশ ও সেবার মান নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবার জন্য নির্ধারিত জায়গাও এমনভাবে সাজাতে হবে, যাতে ক্রেতারা খুব সহজে সেবা গ্রহণ করতে পারেন।

অ্যাডভান্টেজ কার্ডের গুরুত্ব বাড়বে

বুটসের নিয়মিত ক্রেতাদের বিশেষ সুবিধা দিতে ১৯৭৭ সালে চালু করা হয়েছিল ‘অ্যাডভান্টেজ কার্ড’। এই কার্ডের মাধ্যমে প্রতি এক পাউন্ড কেনাকাটায় তিন পয়েন্ট পাওয়া যায় এবং প্রতিটি পয়েন্টের মূল্য এক পেনি। নিয়মিত ক্রেতাদের কাছে এই কার্ডটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় হলেও পয়েন্ট ব্যবহারের নিয়মের ক্ষেত্রে আরও শিথিলতা আনা সম্ভব বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।

খুচরা ব্যবসার বিশ্লেষক ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এনবিকে রিটেইলের প্রতিষ্ঠাতা নাটালি বার্গের মতে, এই কার্ডের মাধ্যমে গ্রাহকদের পছন্দ এবং কেনাকাটার অভ্যাস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করে বুটস। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে মানুষের কেনাকাটার ধরন বদলে যাওয়ায় গ্রাহকদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক বজায় রাখা এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা

বুটসের ব্যবসার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো স্বাস্থ্যসেবা। তাদের দোকানভিত্তিক ফার্মেসিগুলোতে প্রেসক্রিপশনের ওষুধ ও টিকা দেওয়ার পাশাপাশি চোখ ও কানের পরীক্ষাসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সেবা প্রদান করা হয়। এছাড়া তারা ওজন কমানোর সেবাও দিয়ে থাকে, যার পরিসর সম্প্রতি আরও বৃদ্ধি করা হয়েছে।

নতুন মালিক গ্যালেন ওয়েস্টন জানিয়েছেন, স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বাড়ানো এবং দোকানগুলোর আধুনিকায়নে বিনিয়োগ করা হবে। তিনি মনে করেন, স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসা ক্রেতাদের কাছে সৌন্দর্যপণ্য বিক্রির সুযোগ রয়েছে, অর্থাৎ এই দুই ব্যবসার মধ্যে একটি গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। তাই এই দুই খাতকে একসঙ্গে সম্প্রসারণ করার সুযোগ রয়েছে।

প্রতিযোগিতার মুখে বুটস

বুটসের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো তীব্র বাজার প্রতিযোগিতা। বিশেষ করে তরুণ ক্রেতাদের একটি বড় অংশ এখন দোকানে না গিয়ে অনলাইনে পণ্য কেনাকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। কেনাকাটার অভ্যাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বড় প্রভাব রয়েছে এবং বিজ্ঞাপন তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সুপারড্রাগের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সৌন্দর্যপণ্যের বাজারে অন্যান্য খুচরা বিক্রেতারাও এখন শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। সব মিলিয়ে বুটসের জন্য ব্যবসা পরিচালনা করা খুব একটা সহজ হবে না।

২০২৫ সালে বুটসের বিক্রির পরিমাণ ছিল ৭৫০ কোটি পাউন্ড, যা আগের বছরের তুলনায় ৩ দশমিক ২ শতাংশ বেশি। তবে প্রতিযোগিতার কারণে রাজস্বের ওপর চাপ রয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাজ্যে শত শত দোকান বন্ধ করতে হয়েছে বুটসকে। মানুষ এখন ঘরে বসে কাজ করতে পছন্দ করায় শহরের কেন্দ্রস্থলে ক্রেতাদের আনাগোনা আগের চেয়ে কমেছে।

উল্লেখ্য যে, ওয়েস্টন পরিবারের মালিকানায় কানাডার মুদি বিক্রেতা লব্লজ এবং ফার্মেসি ব্যবসা শপার্স ড্রাগ মার্ট রয়েছে। এছাড়া যুক্তরাজ্যেও এই পরিবারের আরও কিছু ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে।

নতুন মালিকানায় বুটসের মূল চ্যালেঞ্জ হবে দীর্ঘদিনের গ্রাহক আস্থা ধরে রেখে তরুণ ক্রেতাদের আকৃষ্ট করা। দোকান আধুনিকায়ন, স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন এবং অনলাইন কেনাকাটার সঙ্গে তাল মেলাতে পারলে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিযোগিতায় সুবিধাজনক অবস্থানে ফিরতে পারে।