‘গ্রামে যাচ্ছ, একজন কাজের মেয়ে নিয়ে এসো। ছোটখাটো একটা মেয়ে হলেও চলবে।’ একসময় শহরের অনেক পরিবারে এমন আবদার শোনা যেত। অভাবের তাড়নায় উপকূলীয় জনপদ খুলনার কয়রার কিছু দরিদ্র পরিবারের মেয়েদেরও পাঠানো হতো শহরের বাসাবাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করতে। বই-খাতা হাতে বিদ্যালয়ে যাওয়ার বয়সে তাদের অনেকের দিন কাটত অন্যের ঘরের কাজ আর জীবিকার সংগ্রামে।

তবে এখন সময় বদলেছে, বদলেছে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিও। অভাবের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করেও সন্তানদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন উপকূলের সচেতন অভিভাবকেরা। তাদের কাছে কায়িক শ্রমের চেয়ে শিক্ষা এখন অনেক বড় সম্পদ। দারিদ্র্যকে পেছনে ফেলে তাই বই-খাতা হাতে বিদ্যালয়ের পথে হাঁটছে কয়রার কন্যাশিশুরা।

রোববার (১১ অক্টোবর) বিশ্ব কন্যাশিশু দিবস। এ দিবসকে সামনে রেখে খুলনার উপকূলীয় উপজেলা কয়রার প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে তাকালে চোখে পড়ে এক আশাব্যঞ্জক পরিবর্তন। সকাল হলেই দল বেঁধে বিদ্যালয়ে যাচ্ছে শিশুরা। কারও গায়ে স্কুলের পোশাক, আবার কারও কাঁধে বইয়ের ব্যাগ। ছোট ছোট চোখে বড় হওয়ার স্বপ্ন। কেউ হতে চায় শিক্ষক, কেউ চিকিৎসক, আবার কেউ সমাজে প্রতিষ্ঠিত মানুষ হওয়ার স্বপ্ন দেখে।

সংসারে অভাব আছে, আছে নিত্যদিনের টানাপোড়েনও। তবু সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে নিজের সব কষ্ট আড়াল করে তাদের বিদ্যালয়ে পাঠাচ্ছেন অভিভাবকেরা। একসময় যেসব পরিবারে মেয়েদের অন্যের বাড়িতে কাজে পাঠানো ছিল অভাব মোকাবিলার একমাত্র উপায়, সেসব পরিবারের অনেকেই এখন মেয়েদের শিক্ষিত করে স্বাবলম্বী করার স্বপ্ন দেখছেন।

বিদ্যালয়মুখী শিশুরা, বদলাচ্ছে গ্রাম

কয়রা উপজেলার কয়েকটি প্রত্যন্ত এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। নির্ধারিত সময়ে শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে ব্যস্ত সময় পার করেন শিক্ষক-শিক্ষিকারা।

শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সরকারি উপবৃত্তি, বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ, বিদ্যালয়ে টিফিন বা খাবারের ব্যবস্থা এবং অভিভাবকদের সচেতনতা শিশুদের বিদ্যালয়মুখী করতে দারুণ ভূমিকা রাখছে। তাদের মতে, আগে পরিবারের বাড়তি আয়ের জন্য অনেক শিশুকে কাজে পাঠানো হলেও বর্তমানে সেই প্রবণতা অনেকটাই কমেছে।

মদিনাবাদ কলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এস এম নুরুল আমিন নাহিন জানান, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মাসে ১৫০ টাকা এবং প্রাক-প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা ৭৫ টাকা করে উপবৃত্তি পায়। এ ছাড়া বিদ্যালয়ে প্রতিদিন পুষ্টিকর বিস্কুট দেওয়া হয়, যা শিশুদের বিদ্যালয়ে আসতে উৎসাহিত করে।

৬ নম্বর কয়রা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ভবেশ চন্দ্র মণ্ডল বলেন, “গ্রামের মানুষও এখন শিক্ষার গুরুত্ব বুঝতে শুরু করেছেন। নিজেরা হয়তো লেখাপড়ার সুযোগ পাননি, কিন্তু সন্তানদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে চান। সরকার বিনা মূল্যে পড়াশোনার সুযোগ দিচ্ছে, অভিভাবকেরাও নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাচ্ছেন। তাই গ্রামে গেলেই কাজের লোক পাওয়া যাবে—এমন ধারণা এখন আর বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।”

স্থানীয়দের মতে, শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারি উপবৃত্তিসহ বিভিন্ন সহায়তা কার্যক্রম চালু থাকা এবং বিদ্যালয়ে খাবারের ব্যবস্থা উপস্থিতি বাড়াতে সহায়ক হয়েছে। তবে এসব সুবিধার পরিমাণ ও কার্যক্রমের বর্তমান অবস্থা সংশ্লিষ্ট শিক্ষা দপ্তরের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

অভাবের কাছে হার মানেনি আমজাদ হাওলাদারের পরিবার

৬ নম্বর কয়রা গ্রামের বাসিন্দা আমজাদ হাওলাদারের জীবনের বড় একটি অংশ কেটেছে অভাবের সঙ্গে লড়াই করে। সংসারে অনেক সন্তান থাকায় আর্থিক সংকট সামাল দিতে তার কয়েকজন মেয়েকে একসময় শহরে কাজের জন্য পাঠাতে হয়েছিল। সেই সিদ্ধান্তের কথা মনে করে আজও তিনি আক্ষেপ করেন।

আমজাদ হাওলাদার বলেন, “অনেক ছেলেমেয়ে হওয়ায় প্রথম দিকে কয়েকজন মেয়েকে শহরে কাজের জন্য পাঠিয়েছিলাম। তারা লেখাপড়া শিখতে পারেনি। এখন আর সেই ভুল করতে চাই না। বাকি ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে। সংসার চালাতে অনেক কষ্ট হয়, তারপরও চাই ওরা লেখাপড়া শিখে মানুষের মতো মানুষ হোক। আমি যে কষ্ট করেছি, ওরা যেন সেই কষ্টের মুখোমুখি না হয়।”

আমজাদের কথায় ফুটে ওঠে উপকূলের অসংখ্য দরিদ্র পরিবারের বাস্তবতা। অভাবের কারণে নিজেরা যে সুযোগ পাননি, সন্তানদের সেই সুযোগটুকু করে দিতে চান তারা। তাদের আশা, শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়ে সন্তানরা একদিন দারিদ্র্যের বৃত্ত ভেঙে বেরিয়ে আসবে।

দিনমজুর বাবার স্বপ্ন মেয়েদের প্রতিষ্ঠিত করা

দিনমজুর পরেশ মণ্ডলের জীবনেও অভাব নিত্যসঙ্গী। প্রতিদিনের শ্রমে চলে সংসার। সীমিত আয়ের মধ্যেও সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ হতে দেননি তিনি। বরং মেয়েদের শিক্ষিত করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন দেখেন।

পরেশ মণ্ডল বলেন, “দিনমজুরি করে সংসার চালাই। তারপরও আমার এক মেয়ে কলেজের গণ্ডি পেরিয়েছে, আরেকজন স্থানীয় স্কুলে পড়ে। আমি চাই, তারা লেখাপড়া শিখে প্রতিষ্ঠিত হোক। আমাদের মতো কষ্ট করে যেন তাদের জীবন কাটাতে না হয়।”

পরেশের মতো বহু দরিদ্র বাবার কাছেই সন্তানদের শিক্ষা ভবিষ্যতের সবচেয়ে বিনিয়োগ। নিজেদের আর্থিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও তারা চান, মেয়েরা যেন আত্মনির্ভরশীল হয়ে সম্মানি জীবনযাপন করতে পারে।

‘আমার কোনো সঞ্চয় নেই, মেয়েরাই আমার সঞ্চয়’

সবিতা মুন্ডার সংসারেও সচ্ছলতা নেই। অন্যের বাড়িতে দিনমজুরি করে মেয়েদের মুখে খাবার তুলে দিতে হয় তাকে। কখনো অভাবের তাড়নায় নিজের প্রয়োজনও মেটাতে পারেন না তিনি। তবু মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ হতে দেননি। অনেক কষ্টের মধ্যেও তাদের অন্যের বাড়িতে কাজে পাঠানোর কথা ভাবেননি।

সবিতা মুন্ডা বলেন, “অন্যের বাড়িতে দিনমজুরি করে মেয়েদের খাবার জোগাড় করেছি। সেই খাবার খেয়েই তারা পরীক্ষা দিতে গেছে। অনেক কষ্ট হয়েছে, তবু তাদের অন্যের বাড়িতে কাজে পাঠাইনি। আল্লাহ তাদের মেধা দিয়ে পাঠিয়েছেন। আমার কোনো সঞ্চয় নেই, এই মেয়েরাই আমার সঞ্চয়।”

একজন মায়ের এই কথায় ফুটে ওঠে সন্তানের প্রতি ভালোবাসা, আত্মত্যাগ আর ভবিষ্যতের প্রতি গভীর আস্থা। তার কাছে ব্যাংকে জমানো টাকা কিংবা জমিজমা নয়, মেয়েদের শিক্ষিত করে তোলার স্বপ্নই সবচেয়ে বড় সম্পদ। প্রতিকূলতার মধ্যেও মেয়েদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার এই চেষ্টা যেন বদলে যাওয়া সময়েরই এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি।

বদলাচ্ছে দৃষ্টিভঙ্গি, বাড়ছে শিক্ষার আলো

একসময় উপকূলীয় এলাকার দরিদ্র পরিবারের অনেক শিশু অর্থনৈতিক সংকটের কারণে শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতো। অল্প বয়সেই তাদের জড়িয়ে পড়তে হতো কায়িক শ্রমে। বিশেষ করে কন্যাশিশুদের ক্ষেত্রে পড়াশোনা বন্ধ করে অন্যের বাড়িতে কাজে পাঠানোর ঘটনাও ছিল নিয়মিত চিত্র। তবে সময়ের সঙ্গে অভিভাবকদের মধ্যে শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বেড়েছে। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে তারা এখন নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা করছেন।

বিদ্যালয়মুখী শিশুদের হাসিমুখ সেই পরিবর্তনেরই প্রতিচ্ছবি। তবে বিদ্যালয়ে ভর্তি ও উপস্থিতি বাড়ার পাশাপাশি ঝরে পড়া রোধ, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং দরিদ্র পরিবারের শিশুদের পড়াশোনার ব্যয় নির্বাহে সহায়তা অব্যাহত রাখাও জরুরি। কারণ, শুধু বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেই শিক্ষার লক্ষ্য পূরণ হয় না; প্রয়োজন নিয়মিত পড়াশোনা, নিরাপদ পরিবেশ এবং শিক্ষার ধারাবাহিকতা।

কয়রা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা তপন কুমার কর্মকার বলেন, “সব ছেলে-মেয়েকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করতে নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এ কারণে আগের তুলনায় অনেক বেশি শিক্ষার্থী এখন লেখাপড়া করছে। তা ছাড়া শিক্ষকদের ভালো ব্যবহারও শিশুদের বিদ্যালয়ের প্রতি আগ্রহ বাড়াচ্ছে। তারা এখন আর বাড়িতে বসে থাকতে চায় না।”

শিক্ষাই হোক কন্যাশিশুর এগিয়ে যাওয়ার শক্তি

কয়রার প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে যেসব শিশু বই-খাতা হাতে বিদ্যালয়ে যাচ্ছে, তাদের সবার জীবন হয়তো এক রকম নয়। কারও ঘরে খাবারের সংকট, কারও বাবার দিনমজুরির আয়েই চলে সংসার, আবার কারও মাকে নিজের চাওয়া-পাওয়া বিসর্জন দিতে হয় সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য।

তারপরও তারা স্কুলে যাচ্ছে, স্বপ্ন দেখছে সুন্দর একটি ভবিষ্যতের। কারণ তাদের বাবা-মা বুঝতে শিখেছেন, দারিদ্র্য সাময়িকভাবে জীবনকে আটকে রাখতে পারে, কিন্তু শিক্ষা খুলে দিতে পারে নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত। সেই পথ ধরেই কয়রার কন্যাশিশুরা এগিয়ে চলেছে আত্মনির্ভরতা, মর্যাদা ও সাফল্যের দিকে।