বারান্দাজুড়ে ছড়িয়ে আছে নানা রঙের মোম, ছোট-বড় ছাঁচ, সুতা ও সুগন্ধির শিশি। ঘরের ভেতর চুলার ওপর গলছে মোম। এই ব্যস্ততার মধ্যেই ছাঁচে সুতা বসাচ্ছিলেন ঊর্মিলা মণ্ডল (৩৬)। পাশাপাশি থার্মোমিটার দিয়ে তিনি নিখুঁতভাবে মাপছিলেন মোমের তাপমাত্রা। পাশে বসে তিন বছর বয়সী সন্তান তনুজা মুগ্ধ হয়ে দেখছিল মায়ের এই সৃজনশীল কাজ।
খুলনার কয়রা উপজেলার সুন্দরবন-সংলগ্ন নয়ানী গ্রামের গৃহবধূ ঊর্মিলা তাঁর ঘরের বারান্দাতেই এই ক্ষুদ্র শিল্প পরিচালনা করেন। তাঁর স্বামী মিহির কান্তি মৃধা পটুয়াখালীর একটি কীটনাশক বিক্রয় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। যে হাতে একসময় লোনাপানিতে চিংড়ির পোনা ধরতে হতো, সেই হাতেই এখন তিনি তৈরি করছেন রঙিন ও সুগন্ধি মোমবাতি।
সম্প্রতি তাঁর বাড়িতে গিয়ে কথা বলে জানা যায়, খুলনা বিএল কলেজ থেকে রসায়নে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন ঊর্মিলা। তবে নানা প্রতিকূলতার কারণে সেই স্বপ্ন অপূর্ণ থেকে যায়। কিন্তু বেকার হয়ে ঘরে বসে থাকার কথা তিনি ভাবেননি। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা 'উত্তরণ'-এর সহায়তায় তিনি মোমবাতি তৈরির প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। সংস্থাটি তাঁকে লোহার মোমবাতি তৈরির কাঠামো প্রদান করে। পরবর্তীতে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী প্রয়োজনীয় অন্যান্য সরঞ্জাম কিনে নেন তিনি।
এক সময়ের জীবনসংগ্রামের কথা স্মরণ করে ঊর্মিলা বলেন, “আগে নিয়মিত এই জাল নিয়ে নদীতে নামতাম চিংড়ির পোনা ধরতে। বুকসমান কাদা আর লোনাপানিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জাল টানতে হতো।”
তৎকালীন অভাবের কথা বর্ণনা করে তিনি জানান, ‘গোলপাতার বেড়ার ছিদ্র দিয়ে ভেতর দেখা যেত। সংসারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। এখন মোমবাতির কাজ শুরু করার পর একটু একটু করে ঘরটা বদলাতে পারছি। এর মাধ্যমে সংসারের অভাব ঘোচানোর চেষ্টা করছি।’
ঊর্মিলা সয়া ওয়াক্স, প্যারাফিন ওয়াক্স এবং প্রাকৃতিক মৌ মোম ব্যবহার করে মোমবাতি তৈরি করেন। স্বল্প আঁচে মোম গলিয়ে নির্দিষ্ট অনুপাতে স্টেরিক অ্যাসিড, রং ও সুগন্ধি মেশানো হয়। এরপর থার্মোমিটার দিয়ে সঠিক তাপমাত্রা মেপে মিশ্রণটি ছাঁচে ঢালা হয়। একটি মোমবাতি পুরোপুরি জমতে প্রায় ১ ঘণ্টা ২০ মিনিট সময় লাগে।
খুলনা বিএল কলেজ থেকে রসায়নে স্নাতকোত্তর করা ঊর্মিলা শিক্ষক হতে না পারলেও উদ্যোক্তা হয়ে নিজের পরিচয় গড়েছেন। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা উত্তরণের প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতায় তিনি এই পথে এগিয়ে আসেন।
আর্থিক হিসাব অনুযায়ী, প্রতি কেজি মোমের কাঁচামালের দাম প্রায় ২৮০ টাকা। এই পরিমাণ কাঁচামাল দিয়ে ৬০-৭০টি উন্নত মানের মোল্ড মোমবাতি তৈরি করা সম্ভব। সম্প্রতি একটি বেসরকারি সংস্থা তাঁর কাছ থেকে ২০০টি মোমবাতি ক্রয় করেছে। প্রতি পিস ৬০ টাকা দরে ওই ক্রয়াদেশ থেকে তিনি ১২ হাজার টাকা আয় করেছেন।
ঊর্মিলার এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে উপকূলীয় নারীদের দীর্ঘ জীবনসংগ্রামের ইতিহাস। বাড়ির পাশে রাখা পুরোনো একটি জাল দেখিয়ে তিনি বলেন, “আগে নিয়মিত এই জাল নিয়ে নদীতে নামতাম চিংড়ির পোনা ধরতে। বুকসমান কাদা আর লোনাপানিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জাল টানতে হতো।”
উপকূলীয় অঞ্চলে নারীদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। তবে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও দিকনির্দেশনা পেলে ঊর্মিলার মতো আরও অনেক নারী উদ্যোক্তা তৈরি হতে পারে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে।
বর্তমানে নিজের আয়ের পাশাপাশি অন্য নারীদের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করতে আগ্রহী ঊর্মিলা। তাঁর এই উদ্যোগের প্রশংসা করছেন প্রতিবেশীরাও। স্থানীয় বাসিন্দা লক্ষ্মী মণ্ডল বলেন, ‘আমরা এলাকায় এভাবে মোমবাতি তৈরি আগে দেখিনি। পূজা-পার্বণে এখন ঊর্মিলা বৌদির কাছ থেকেই মোমবাতি কিনি।’
নয়ানী গ্রামের বাসিন্দা এবং স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মণি শঙ্কর রায়ের মতে, উপকূলীয় এলাকায় নারীদের কাজের সুযোগ খুব সীমিত। প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে ঊর্মিলার মতো উদ্যোগ থেকে আরও অনেক নারীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।