দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বর্তমানে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট এবং ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের মাস্টার্স অব বিজনেজ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এমবিএ) ও এক্সিকিউটিভ এমবিএ (ইএমবিএ) ডিগ্রির চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রভাব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যাপক বিস্তার এবং প্রতিনিয়ত নতুন নতুন বিজনেস মডেলের উত্থান প্রচলিত ব্যবসা পরিচালনা পদ্ধতিকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। বর্তমানের এই অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক কর্মপরিবেশে কেবল গতানুগতিক অভিজ্ঞতা কিংবা একটি সাধারণ স্নাতক ডিগ্রি দিয়ে ক্যারিয়ারের শীর্ষস্থানে অবস্থান ধরে রাখা বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর ঠিক এই কারণেই বাংলাদেশের পেশাজীবীদের মধ্যে এমবিএ ও ইএমবিএ প্রোগ্রামগুলো অধিক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, যা তাদের প্রায়োগিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়িক পরিমণ্ডলের সমসাময়িক জটিল সমস্যা সমাধানে নিজেদের প্রস্তুত করার এক অনন্য সুযোগ করে দিচ্ছে।
ব্যবসায়িক কার্যক্রম যেমন আধুনিক হচ্ছে, তেমনি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার মাত্রা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে দেশের নামী ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোতে দক্ষ এবং আধুনিক জ্ঞানসম্পন্ন ম্যানেজারের প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বাড়ছে। ইএমবিএ প্রোগ্রামের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এর সব ক্লাস সন্ধ্যার পর থেকে শুরু হয়, যাতে পেশাজীবীরা তাদের চাকরির পাশাপাশি একাডেমিক কার্যক্রম অত্যন্ত সাবলীলভাবে পরিচালনা করতে পারেন। এই সুবিধার কারণে করপোরেট পেশাজীবীদের কাছে এই ডিগ্রিটি অধিক সমাদৃত হচ্ছে। অধিকাংশ করপোরেট প্রফেশনালের জন্য চাকরি ছেড়ে এমবিএ প্রোগ্রামে ভর্তি হওয়া বাস্তবসম্মত বা যুক্তিযুক্ত নয়। তাই ই-এমবিএ প্রোগ্রাম চাকরিজীবীদের জন্য এক অসাধারণ সুযোগ তৈরি করেছে, যার মাধ্যমে তারা পেশাগত জীবন অক্ষুণ্ণ রেখে একাডেমিক যোগ্যতা বৃদ্ধি করতে পারছেন এবং ক্যারিয়ারে উন্নতির পথ প্রশস্ত করছেন।
কর্মজীবীদের জন্য ইএমবিএ প্রোগ্রামটি হাতের নাগালে সহজলভ্য কারণ এটি সন্ধ্যায় পরিচালিত হয়, ফলে কাজ ও শিক্ষার মধ্যে সমন্বয় করা সহজ হয়। ইএমবিএ প্রোগ্রামে ব্যবসায়িক পরিবেশের সমসাময়িক চাহিদা পূরণে প্রয়োজনীয় বৈচিত্র্যময় দক্ষতা শেখানো হয়।
এক সময় সাধারণ এমবিএ প্রোগ্রাম ছিল করপোরেট ক্যারিয়ারে পদোন্নতির প্রধান চাবিকাঠি। সেখানে সামগ্রিকভাবে বিজনেস ম্যানেজমেন্ট এবং মৌলিক ব্যবসায়িক কৌশলগুলো শেখানো হতো। কিন্তু বর্তমান করপোরেট বিশ্ব অনেক বেশি জটিল হয়ে পড়েছে। এখন আর কেবল সাধারণ ব্যবস্থাপনার জ্ঞান দিয়ে জটিল করপোরেট সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হচ্ছে না; বরং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে গভীর ও বিশেষায়িত জ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিচ্ছে। ই-এমবিএ প্রোগ্রামের কোর্সগুলো দেশি ও বিদেশি অত্যাধুনিক, প্রতিযোগিতামূলক এবং পরিবর্তনশীল ব্যবসায়িক পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার কৌশলগত জ্ঞান ও বহুমাত্রিক জটিল সমস্যা নিরসনে বৈচিত্র্যপূর্ণ দক্ষতা প্রদান করে। দেশীয় বা বিদেশি শিল্প ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্বস্থানীয় পদ অর্জন করে একজন বিজনেস লিডার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে ই-এমবিএ প্রোগ্রামের বিকল্প নেই। বর্তমান সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ই-এমবিএ প্রোগ্রামে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিজনেস অ্যানালিটিকস, অ্যাগ্রি-বিজনেস ব্যবস্থাপনা, ফিনটেক, মেশিন লার্নিং, ডিপ লার্নিং ও কয়ান্টেটেটিভ বিজনেস অ্যানালিসিসের মতো অপরিহার্য বিষয়গুলো অভিজ্ঞ শিক্ষকদের মাধ্যমে শেখানো হচ্ছে। ক্লাসরুমভিত্তিক শিক্ষার পাশাপাশি করপোরেট মতবিনিময় সেশন, রিয়েল-টাইম কেস স্টাডি, গেস্ট লেকচার, করপোরেট ভিজিট, সিমুলেশন ও ইন্ডাস্ট্রি-লিড প্রজেক্ট এবং সেমিনার আয়োজনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ব্যতিক্রমধর্মী জ্ঞান ও কর্মদক্ষতা অর্জনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়। এর পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষেত্রের করপোরেট প্রফেশনালদের সঙ্গে একটি নির্ভরযোগ্য পেশাদার নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে।
শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ডেটানির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণের কৌশল আয়ত্ত করে, যা আধুনিক করপোরেট প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত কার্যকর। ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালিসিস, স্ট্র্যাটেজিক মার্কেটিং, সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট এবং হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্টের মৌলিক ধারণার পাশাপাশি বাস্তবধর্মী ডেটা বিশ্লেষণ করে ব্যবসায়িক ঝুঁকি কমানোর উপায় শেখানো হয়। ক্লাসে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কেস স্টাডি সমাধানের মাধ্যমে উদীয়মান বাজারের অর্থনৈতিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে কোম্পানির সম্পদ সঠিক ব্যবস্থাপনার প্রায়োগিক দিকগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এছাড়া শ্রেণিকক্ষের গ্রুপ ডিসকাশন ও প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে স্ট্র্যাটেজিক লিডারশিপ ও নেগোসিয়েশন স্কিল অর্জিত হয়। কীভাবে একটি মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিম পরিচালনা করতে হয় এবং সংকটকালে কৌশলগত পরিবর্তন বা ‘পিভট’ করে ব্যবসাকে লাভজনক রাখা যায়, তা ক্লাসরুম সিমুলেশনের মাধ্যমে হাতে-কলমে শেখা সম্ভব হয়। ব্যবসায়িক নীতিশাস্ত্র, করপোরেট গভর্ন্যান্স এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার মানসিকতা তৈরিতেও এই শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। এমবিএ ডিগ্রিধারী প্রফেশনালরা ব্যবসায়িক পরিমণ্ডলে ফলপ্রদ ও নির্ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ব্যবসার উন্নতি সুনিশ্চিত করেন। এতে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মক্ষমতা লক্ষণীয় মাত্রায় বৃদ্ধি পায়, যার মাধ্যমে দেশি ও বিদেশি বাজারে শক্ত অবস্থান প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়। আবার এমবিএ ও ইএমবিএ প্রোগ্রামে অংশগ্রহণের মাধ্যমে করপোরেট প্রফেশনালদের বুদ্ধিদিপ্তি বিকশিত হয়, যা তাদের মেধাকে পরিপূর্ণভাবে সঠিক ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নির্ধারণে সাহায্য করে। করপোরেট প্রফেশনালরা প্রতিনিয়ত নতুন ও আধুনিক জ্ঞান আরোহণের চর্চা শুরু করেন, এমনকি ই-এমবিএ প্রোগ্রাম সম্পন্ন হওয়ার পরও। এই নিরন্তর চর্চার কারণে নতুন কোনো দুর্বোধ্য সমস্যা দেখা দিলে তারা নিমিষেই তার সমাধান বের করতে সক্ষম হন।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে হার্ভার্ড, ইনসিয়াড কিংবা আইআইএমের মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানগুলো এখন প্রচলিত ডিগ্রির পাশাপাশি টেইলর-মেড ই-এমবিএ প্রোগ্রাম গুরুত্বের সঙ্গে পরিচালনা করছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এমবিএ ও ইএমবিএ প্রোগ্রাম চালুর মাধ্যমে পাঠ্যক্রম পুনর্গঠন করছে। পেশাজীবীরা বছরে দুটি বা তিনটি সেশনে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে এই প্রোগ্রামে যুক্ত হতে পারেন। এছাড়া উইকেন্ড বা হাইব্রিড মডেলের মাধ্যমে কর্মজীবীরা আরও স্বাচ্ছন্দ্যের সময়সূচি পাচ্ছেন। ভর্তি পরীক্ষা বহুনির্বাচনী ও লিখিত প্রশ্নের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ইংরেজি, অঙ্ক, যুক্তিবিদ্যা, সাম্প্রতিক ঘটনাবলি ও সাধারণ জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে প্রশ্ন করা হয়। দেশের অনুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি এবং গ্রহণযোগ্য ফলাফল থাকলেই এই প্রোগ্রামে ভর্তি হওয়া যায়। এই প্রোগ্রামটি সম্পন্ন করতে সাধারণত কমপক্ষে দুই বছর সময় লাগে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় ভেদে পরীক্ষার সেশন, নিয়ম, বিষয় এবং ভর্তির যোগ্যতা ভিন্ন হতে পারে।