বর্তমানে রাজধানী ঢাকার আকাশচুম্বী অট্টালিকার দৃশ্যপট বা স্কাইলাইন বদলে দেওয়ার ক্ষেত্রে শান্তা হোল্ডিংসের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। পিনাকল এবং ফোরামের মতো উচ্চতা ও আধুনিকতায় অনন্য ভবন নির্মাণের নেপথ্য কাহিনী এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বললেন প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ প্রতিনিধি শিহাব আহমেদ।
আবাসন খাতের বিবর্তন নিয়ে শিহাব আহমেদ বলেন, “বাংলাদেশে আবাসন খাত বলতে একসময় মূলত একটি গ্যারেজ আর কয়েকটি ফ্ল্যাটের সমন্বয় বোঝাত। পরবর্তী সময়ে ডেভেলপার কোম্পানি বড় কমপ্লেক্স তৈরি করে নিচতলায় শিশুদের খেলার জায়গা রেখেছিল। তবে আমাদের প্রতিষ্ঠানের পরিকল্পনা ছিল আন্তর্জাতিক মানের সুযোগ-সুবিধা ঘরের ভেতরের পাশাপাশি প্রাঙ্গণেও ইনকরপোরেট করা। পরীবাগের ‘দিগন্ত’ কন্ডোমিনিয়াম দিয়ে আমাদের সেই সফল যাত্রা শুরু হয়।”
তিনি আরও জানান, নিউইয়র্ক বা লন্ডনের ক্যানারি ওয়ার্ফের মতো আন্তর্জাতিক মানের ব্যবসাকেন্দ্র ঢাকায় গড়ে তোলার লক্ষ্যেই তারা বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণে মনোনিবেশ করেন। ঢাকার স্কাইলাইন পরিবর্তন করে বিশ্বমানের বাণিজ্যিক স্থাপত্য তৈরি এবং তা ব্যবহারের সুযোগ করে দেওয়াই ছিল তাদের মূল স্বপ্ন।
তেজগাঁও এলাকায় ধারাবাহিক বেশ কিছু আইকনিক বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করেছে শান্তা। এসব ভবনের কারিগরি উৎকর্ষ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শিহাব আহমেদ বলেন, “তেজগাঁও শিল্প এলাকা থেকে বাণিজ্যিক এলাকায় রূপান্তরের পর প্রথম কমার্শিয়াল ভবন হিসেবে আমরা ‘শান্তা ওয়েস্টার্ন টাওয়ার’ করি। তখনকার ফার বিধিমালার কারণে এটি ১৪ তলার মধ্যে শেষ করতে হয়।”
পরবর্তীতে ‘ফোরাম’ নির্মাণের মাধ্যমে তারা তেজগাঁওয়ে টুইন টাওয়ার, ডেস্টিনেশন কন্ট্রোল এলিভেটর, বিএমএস রুম এবং দেশে প্রথমবারের মতো ইউনিটাইজড গ্লাস ফাসাদ যুক্ত করেন। এই বিশেষ কাচের থার্মাল প্রোটেকশন অত্যন্ত কার্যকর হওয়ায় এসি ও বিদ্যুতের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।
এরপর তারা নির্মাণ করে ৫০০ ফুট উচ্চতার ‘পিনাকল’, যা দেশের প্রথম উইন্ড টানেল টেস্টেড ভবন। এই ভবনে ৩ মিটার ম্যাট ঢালাই, প্রতি সেকেন্ডে ৪ মিটার গতির এলিভেটর এবং লিড প্লাটিনাম সার্টিফায়েড প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া ৪০ তলার ওপরে ৫৬ ফুট উঁচু এক অসাধারণ ছাদ তৈরি করা হয়েছে।
বর্তমানে তেজগাঁওয়ের সবচেয়ে বড় ৬ বিঘা জমির ওপর নির্মিত হচ্ছে ‘ঢাকা টাওয়ার’। এই প্রকল্পের বিশেষত্ব সম্পর্কে তিনি জানান, সেখানে মাটির নিচে ৯ মিটার গভীর ম্যাট ঢালাই করা হয়েছে। নির্মাণকাজে প্রথমবার বিআইএম (বিল্ডিং ইনফরমেশন মডেলিং) সফটওয়্যার, ৪২ মিলিমিটার পুরু কাচ এবং দ্রুততম নির্মাণের জন্য অ্যালুমিনিয়াম ফরমওয়ার্ক প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। নেদারল্যান্ডসের বিখ্যাত স্থপতি প্রতিষ্ঠান ওএমএ এর নকশা এবং ফরাসি প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্টের তদারকিতে এই ভবন নির্মিত হচ্ছে। এর ছাদে থাকবে ‘ঢাকা আই’, বাগান ও রেস্তোরাঁ।
বাণিজ্যিক ভবনে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের বিষয়ে শিহাব আহমেদ বলেন, “শুরুতে ওয়েস্টার্ন টাওয়ার বা ফোরাম বিক্রিতে কাস্টমারদের অনেক বোঝাতে হয়েছিল। তবে বর্তমানে কাজ শুরুর আগেই ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ বিক্রি হয়ে যায়।”
তার মতে, বাণিজ্যিক প্রপার্টিতে রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট অত্যন্ত বেশি। আবাসিক ফ্ল্যাটের তুলনায় কম দামে কিনে চার গুণ বেশি ভাড়া পাওয়া সম্ভব। এছাড়া কমার্শিয়াল স্পেসে একসঙ্গে ২৪ মাসের অগ্রিম ভাড়া এবং ১০ বছরের দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি করা যায়। ইন্টেরিয়র ও রক্ষণাবেক্ষণ সম্পূর্ণ ভাড়াটের দায়িত্ব থাকে এবং প্রতি দুই বছরে ১০ শতাংশ হারে ভাড়া বৃদ্ধি পায়। ফলে বিনিয়োগকারীরা প্রথম দিনেই ২০ শতাংশ এবং প্রথম বছরেই প্রায় ৩০ শতাংশ ক্যাশ ব্যাক পান। ১০ বছরের মধ্যে বিনিয়োগ করা সম্পূর্ণ টাকা উঠে আসে এবং সাথে বড় অংকের ক্যাপিটাল গেইন হয়। উদাহরণ হিসেবে তিনি জানান, ওয়েস্টার্ন টাওয়ারের ৯-১০ হাজার টাকার বর্গফুট এখন ৩০ হাজার টাকা ছাড়িয়ে গেছে; একইভাবে ফোরাম বা পিনাকলের দামও বহুগুণ বেড়েছে।
উঁচু ভবনের ব্যবহারযোগ্য জায়গা ও কমন স্পেস সম্পর্কে ক্রেতাদের ধারণা থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। শিহাব আহমেদ জানান, এটি একটি নিখুঁত কারিগরি বিষয়। নিয়ম অনুযায়ী ১০ তলার বেশি ভবন হলে দুটি ফায়ার স্টেয়ার, লিফট ও লবি নিশ্চিত করতে হয়। প্লট ও ফ্লোরের আকৃতি যত বড় হয়, কমন স্পেসের শতকরা হার তত কমে আসে, যার ফলে গ্রাহকরা অধিকতর ব্যবহারযোগ্য স্পেস পান।