দেড় দশক আগেও ঢাকার আকাশরেখা বা স্কাইলাইন ছিল অত্যন্ত সাদামাটা। সেই সময়ে ২০ তলা বা তার চেয়ে বেশি উচ্চতার ভবনের সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। তবে আবাসন কোম্পানিগুলোর নিরন্তর প্রচেষ্টায় গড়ে উঠতে থাকে আধুনিক ধারার নিত্যনতুন আবাসন প্রকল্প। সেই ধারাবাহিকতায় এখন ঢাকার স্থাপত্যশৈলীতে এক নতুন রূপ দেখা যাচ্ছে। বর্তমানে ঢাকায় ৪০ তলা ভবন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। সমসাময়িক সময়ে প্রায় একই উচ্চতার আরও বেশ কিছু ভবন নির্মিত হচ্ছে। আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলো এসব ভবনে আধুনিক সুযোগ-সুবিধার সন্নিবেশ ঘটিয়েছে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করছে, যার ফলে বাসিন্দারা জীবনযাপন ও কর্মক্ষেত্রে এক নতুন অভিজ্ঞতা পাচ্ছেন।
শুধু উচ্চতা বৃদ্ধি নয়, এখন পরিবেশবান্ধব আবাসন প্রকল্পের দিকেও নজর দেওয়া হচ্ছে। এসব প্রকল্পে সবুজের সমারোহের পাশাপাশি দিনের আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার, জ্বালানিসাশ্রয়ী আলোকসজ্জা, পানির অপচয় রোধ এবং শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার কমিয়ে প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশের ওপর চাপ কমানোর চেষ্টা চলছে। আবাসন খাতের একাধিক উদ্যোক্তার মতে, এক দশক আগেও ৫ বা ১০ কাঠার ছোট প্লটে অধিকাংশ প্রকল্প হতো। কিন্তু এখন পাশাপাশি থাকা একাধিক জমির মালিকরা একত্রিত হয়ে আবাসন কোম্পানির কাছে যাচ্ছেন। ফলে ৮০–৯০ কাঠা বা তার চেয়ে বড় জায়গায় বৃহৎ আবাসন প্রকল্প নির্মাণের সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যের পথ প্রশস্ত করেছে।
আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাবের সভাপতি আলী আফজাল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশে ১৮ কোটি মানুষ বসবাস করে। ২০৩৫ সালে জনসংখ্যা বেড়ে ২৫ কোটি হতে পারে। তখন সরকারকে দুটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এক. বিপুলসংখ্যক মানুষের খাদ্যের সংস্থান এবং দুই. আবাসনের চাহিদা মেটানো। এমন প্রেক্ষাপটে আমাদের সুউচ্চ ভবন করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। এসব ভবন পরিবেশবান্ধব হিসেবেও নির্মাণ করা যায়। মাথা গোঁজার জন্য উঁচু ভবন করা না গেলে কৃষিজমি থাকবে না। সে জন্য দু–চারটি ব্যতিক্রম ছাড়া উঁচু ভবন করার ক্ষেত্রে সব ধরনের বিধিনিষেধ তুলে দেওয়া দরকার। এ ক্ষেত্রে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, অগ্নিনির্বাপণ ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা সরকারকে করতে হবে।’
একটি পরিকল্পিত শহরের হাইরাইজ এলাকা সাধারণত ৫ শতাংশেরও কম হয়ে থাকে। তাই যত্রতত্র ছোট প্লটের পরিবর্তে কেবল সুনির্দিষ্ট স্থানে ব্লক ডেভেলপমেন্টের মাধ্যমেই টেকসই উঁচু ভবন নির্মাণ করা সম্ভব। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন আকাশচুম্বী ভবন নির্মাণে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। ঢাকায়ও এই প্রবণতা বাড়ছে, যদিও বিশ্বের সর্বোচ্চ ভবন দুবাইয়ের বুর্জ খলিফার পাঁচ ভাগের এক ভাগ উচ্চতার ভবন এখন পর্যন্ত ঢাকায় নির্মিত হয়েছে।
আবাসন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানান, একসময় সুউচ্চ ভবন কেবল জায়গার সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যম ছিল, কিন্তু আজ তা আধুনিক জীবনধারা, আভিজাত্য এবং আন্তর্জাতিক মানের কর্মপরিবেশের প্রতীক। এসব ভবনে সর্বাধুনিক লিফট প্রযুক্তি, স্মার্ট বিল্ডিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (বিএমএস), শক্তিসাশ্রয়ী কেন্দ্রীয় এসি, সুপরিসর পার্কিং এবং পরিবেশবান্ধব ফিচার যুক্ত করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে সুউচ্চ ভবন নির্মাণের ইতিহাস স্বাধীনতার আগের। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সবচেয়ে উঁচু ভবন হিসেবে দিলকুশায় জীবন বীমা টাওয়ারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছিল, যার উচ্চতা ছিল প্রায় ৮৫ মিটার। স্বাধীনতার পর এর নির্মাণকাজ শেষ হয়। পরবর্তীতে ১০০ মিটারের কাছাকাছি উচ্চতার বেশ কিছু ভবন নির্মিত হয়। গত শতাব্দীতে নির্মিত ৩১ তলাবিশিষ্ট বাংলাদেশ ব্যাংক ভবনের উচ্চতা ছিল ৪৫০ ফুট। আর চলতি শতাব্দীতে বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু ভবন হলো সিটি সেন্টার, যার উচ্চতা ৫৬১ ফুট।
বর্তমানে ঢাকায় ৫০০ ফুট উচ্চতার বেশ কয়েকটি ভবনের নির্মাণকাজ চলছে। এর মধ্যে শান্তা পিনাকেলের কাজ শেষ হয়েছে, যা দেশের প্রথম ৪০ তলা ভবন। এছাড়া ঢাকা টাওয়ার, ট্রপিক্যাল হোমসের টিএ টাওয়ার, সেনাকল্যাণ কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টসের এসকেএস স্কাইরিচ এবং মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের এমজিআই টাওয়ারের নির্মাণকাজ চলছে। টিএ টাওয়ার মালিবাগে এবং বাকিগুলো তেজগাঁও-গুলশান লিংক রোডে অবস্থিত। এই ভবনগুলো সবই বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে নির্মিত হচ্ছে।
শান্তা হোল্ডিংস লিমিটেডের প্রধান বিক্রয় কর্মকর্তা (সিএসও) শিহাব আহমেদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা ভবনের শৈল্পিক নান্দনিকতার পাশাপাশি কাঠামোগত নিরাপত্তা ও স্থায়িত্বকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে থাকি। সুউচ্চ ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে ভূমিকম্প ও বায়ুচাপের ঝুঁকি মোকাবিলায় আমরা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, উইন্ড টানেল টেস্ট এবং বিশ্বখ্যাত প্রকৌশলীদের পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করি।’
তবে এই অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নগর-পরিকল্পনাবিদরা। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সভাপতি ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান মুক্তকণ্ঠকে জানান, দেশে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও ব্লক ডেভেলপমেন্টের নিয়ম না মেনেই যত্রতত্র উঁচু ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে, যা শহরের ঝুঁকি ও জনঘনত্ব মারাত্মকভাবে বাড়াচ্ছে।
অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খানের মতে, ঢাকা শহরে মিডরাইজ (মাঝারি উচ্চতার) ভবনেই সর্বোচ্চ জনঘনত্ব তৈরি হয়েছে। অথচ বছিলা বা কাঁঠালবাগানের মতো এলাকায় ৮-১০ ফুট সরু রাস্তার পাশে ছোট প্লটে ১৪ তলা ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। ফায়ার ফাইটিংয়ের সুযোগ না থাকায় এসব ভবনে অগ্নিঝুঁকি বাড়ছে এবং পর্যাপ্ত আলো-বাতাস না থাকায় একপর্যায়ে বস্তিসুলভ পরিবেশ তৈরি হবে। তাঁর মতে, অন্তত এক একর জমিতে চারপাশে পর্যাপ্ত ফাঁকা জায়গা ও সবুজায়ন রেখে ব্লক ডেভেলপমেন্টের মাধ্যমে উঁচু ভবন করা উচিত। সিঙ্গাপুরে দুটি সুউচ্চ ভবনের মাঝে ৫০-৭০ মিটার ফাঁকা থাকে, অথচ আমাদের দেশে তা মাত্র ৫-১০ মিটার।
আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘একটি পরিকল্পিত শহরে হাইরাইজ এলাকা সাধারণত ৫ শতাংশেরও কম থাকে। তাই যত্রতত্র ছোট প্লটের পরিবর্তে কেবল সুনির্দিষ্ট স্থানে ব্লক ডেভেলপমেন্টের মাধ্যমেই টেকসই উঁচু ভবন নির্মাণ করা সম্ভব।’
পরিবেশবান্ধব পোশাক কারখানায় বাংলাদেশ যেমন বিশ্বে শীর্ষস্থানে, তেমনি এখন আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনগুলোও পরিবেশবান্ধব করার চেষ্টা চলছে। বিশেষ গ্লাস এবং প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের চলাচলের নকশার কারণে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হচ্ছে। ৪ অক্টোবর গুলশানে পরিবেশবান্ধব বাণিজ্যিক ভবন সিম্পল ট্রি জিএসআরে সিম্পল ট্রি গ্রুপের কর্ণধার স্থপতি মোহাম্মদ ফয়েজ উল্লাহর সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, ভবনটির নকশা এমনভাবে করা হয়েছে যাতে দিনের অধিকাংশ সময় সূর্যের আলো ব্যবহার করে কাজ করা যায়। দ্বিস্তরবিশিষ্ট বিশেষ কাচ ব্যবহারের ফলে ভেতরটা কম গরম হয় এবং শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) কম চালাতে হয়, যার ফলে ১৫–২০ শতাংশ বিদ্যুৎ সাশ্রয় হচ্ছে।
মোহাম্মদ ফয়েজ উল্লাহ বলেন, ‘বর্তমান সময়ে যেসব আধুনিক ভবন নির্মিত হচ্ছে, তার সঙ্গে বাড়তি ১–২ শতাংশ অর্থ ব্যয় করলে পরিবেশবান্ধব ভবন নির্মাণ সম্ভব।’
দেশের আবাসনসংকট সমাধানে সুউচ্চ ভবন নির্মাণ বড় সমাধান হতে পারে বলে মনে করেন রিহ্যাবের সাবেক সভাপতি ও বিল্ডিং ফর ফিউচারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তানভীরুল হক প্রবাল। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের জমির স্বল্পতা প্রকট। ফলে উঁচু ভবনই সমাধান। সে জন্য যথাযথ নীতিমালা করতে হবে। বেসরকারি আবাসন প্রতিষ্ঠান আধুনিক ভবন নির্মাণ করবে। তবে গ্যাস–বিদ্যুৎ, গণপরিবহনসহ অন্যান্য নাগরিক সুযোগ–সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে।’
পরিবেশবান্ধব ভবন নির্মাণ এখনো ব্যয়বহুল উল্লেখ করে তানভীরুল হক প্রবাল বলেন, ‘সরকার যদি কোনোভাবে প্রণোদনা দেয়, তাহলে পরিবেশবান্ধব ভবন নির্মাণে উৎসাহ বাড়বে। না হলে পরিবেশবান্ধব আবাসিক ভবন অনেকের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকবে না। সে জন্য পরিবেশবান্ধব ভবন নির্মাণ জনপ্রিয় করতে হলে সরকারকে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’