আশ্বিন মাসের প্রখর দুপুরের রোদ। গ্রামীণ সড়কের দুই পাশে বিস্তৃত আমন ধানের খেতগুলো রোদে ঝকঝক করছে। দৃষ্টি যতদূর যায়, গ্রামের সীমানা পর্যন্ত কেবল সবুজের সমারোহ। তবে সেই দিগন্ত বিস্তৃত সবুজের মাঝে হঠাৎই চোখে পড়ে ভিন্ন রঙের কিছু ছোপ। মনে হয়, প্রকৃতির তুলিতে ধানের মাঠের বুকে এক অনন্য নকশা আঁকা হয়েছে।

এই মনোমুগ্ধকর দৃশ্যটি দেখা যায় মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কাগাবলা ইউনিয়নের রতনপুর-বীরগাঁও গ্রামে। শহর থেকে সড়কপথে এই গ্রামের দূরত্ব প্রায় ১০–১২ কিলোমিটার।

গত বুধবার দুপুরে গ্রামের ভেতর দিয়ে যাওয়া পাকা সড়ক ধরে এগিয়ে গেলে দেখা যায়, সড়ক থেকে বেশ কিছুটা দূরে ধানখেতের মাঝখানে একটি জলাভূমি। সেখানে পৌঁছানোর একমাত্র পথ হলো ধানখেতের আলপথ। গত কয়েকদিন তেমন বৃষ্টি না হওয়ায় আলগুলো শুকিয়ে গেছে এবং ঘাসে ঢাকা পড়েছে। কিছু কিছু আলে খেতের আগাছা বেছে জমা করে রাখা হয়েছে, যা রোদে খড়ের মতো শুকিয়ে পড়ে আছে।

এই জলাভূমিটি মূলত একটি পদ্মবিল। বিশাল এলাকা জুড়ে এখানে অসংখ্য পদ্মফুল ফুটেছে। তবে আলের কাছাকাছি অংশে কেবল পাতা, শাপলা ও শালুক দেখা গেলেও ফুলের দেখা পাওয়া যায় না। বিলের গভীরে গেলে দেখা যায় প্রচুর পদ্মফুল ফুটে আছে। সেই মুহূর্তে সেখানে মানুষ বলতে কেবল একজন ছিলেন—নয়ন সরকার। রতনপুর-বীরগাঁওয়ের এই তরুণ গবাদিপশুর জন্য জলাভূমি থেকে ঘাস সংগ্রহ করতে এসেছেন। হাঁটুপানিতে নৌকা ঠেলে তিনি তখন পদ্মবিলের আরও গভীরে যাচ্ছিলেন।

নয়ন সরকার জানালেন, “জায়গাটির নাম ‘আটাইকিরি পদ্মবিল’। বর্ষার শুরু থেকেই এখানে পদ্ম ফুটতে শুরু করে। বোরো ধানের চাষ শুরু না হওয়া পর্যন্ত ফুল থাকে। প্রতিবছরই এ বিলে এমন পদ্ম ফোটে। কম পানির ফুলগুলো অনেকে এসে তুলে নিয়েছেন।”

বিলের যেদিকেই দৃষ্টি দেওয়া হয়, জল থেকে অনেকটা ওপরে বাতাসে দুলছে পদ্মফুল। দু-একটি ভ্রমরের আনাগোনা লক্ষ্য করা যায়। পুরো বিলটি সাদা ও গোলাপি ফুলে ছেয়ে আছে। কোথাও ছোট-বড় কলিগুলো আকাশের দিকে মাথা তুলে ফোটার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। ফুলের পাশেই ভাসছে পদ্মফল, যার কিছু পরিপক্ব এবং কিছু এখনো কচি। পদ্মের ফাঁকে ফাঁকে ফুটে আছে শুভ্র সাদা শাপলা।

প্রাকৃতিক জলাশয় ক্রমশ কমে যাওয়ায় বর্তমানে পদ্মফুল খুব একটা দেখা যায় না। এটি একটি কন্দজাতীয় জলজ উদ্ভিদ। সাধারণত পুরোনো পুকুর, বিল, হ্রদ, হাওর ও জলাভূমির কাদাময় মাটিতে এই উদ্ভিদ জন্মায়। এর মূল বা কন্দ থাকে জলের নিচের মাটিতে, আর পাতা ও ফুল ভেসে থাকে ওপরে। পানির উচ্চতা বাড়ার সাথে সাথে গাছটিও বৃদ্ধি পায়। এর পাতাগুলো বেশ বড়, পুরু এবং গোলাকার। ফুল সাধারণত সাদা ও গোলাপি রঙের হয়ে থাকে। বর্ষা ও শরৎকালে এই ফুল ফোটে, তবে শরতেই এর আধিক্য বেশি থাকে এবং হেমন্ত পর্যন্ত স্থায়ী হয়।