পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার সারেংকাঠি ইউনিয়নের বাসিন্দা ৬৬ বছর বয়সী অমল কৃষ্ণ সুতার। জীবনের দীর্ঘ এই পথচলায় তিনি পাননি নিজের কোনো মাথা গোঁজার ঠাঁই, গড়ে ওঠেনি কোনো সংসার। স্ত্রী কিংবা সন্তান তো দূরের কথা, দিন শেষে ফিরে যাওয়ার মতো কোনো স্থায়ী ঠিকানাও নেই তার। জীবনধারণের পাশাপাশি খাদ্যের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে তাকে প্রকৃতির ওপরই সম্পূর্ণ নির্ভর করতে হয়েছে।

গত প্রায় ২৬ বছর ধরে জঙ্গল, নদীর চর, খাল-বিল ও জলাভূমিতে জন্মানো বিভিন্ন লতাপাতা, টগরা, কচুরিপানা এবং কচুর ডগাসহ নানা ধরনের উদ্ভিদ সংগ্রহ করে জীবন অতিবাহিত করছেন অমল কৃষ্ণ। কখনো কাঁচা, আবার কখনো নিজের মতো করে প্রস্তুত করে এসব উদ্ভিদই হয়ে উঠেছে তার প্রধান খাবারের ভরসা। তার কোনো নির্দিষ্ট খাদ্যতালিকা নেই; প্রকৃতিতে সেদিন যা পাওয়া যায়, সেটিই তার আহার। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এমন খাদ্যাভ্যাস সত্ত্বেও তার শরীরে নেই কোনো রোগ-বালাই।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, প্রায় ২৫ থেকে ২৬ বছর ধরে তারা অমল কৃষ্ণকে একইভাবে জীবনযাপন করতে দেখছেন। সকাল কিংবা দুপুরে কখন খাবেন বা কী খাবেন, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই তার জীবনে। খাবারের সন্ধানে দিনের একটি বড় অংশ তাকে বন-জঙ্গল, নদীর চর কিংবা জলাভূমিতে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়।

এত দীর্ঘ সময় ধরে এমন জীবনযাপন করা সত্ত্বেও বর্তমানে তাকে শারীরিকভাবে বেশ সতেজ দেখা যায় বলে জানান স্থানীয়রা। নেছারাবাদ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত চিকিৎসকদের মাধ্যমে তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে তার শরীরে উল্লেখযোগ্য কোনো রোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

নিজের জীবনধারা সম্পর্কে অমল কৃষ্ণ সুতার বলেন, “প্রায় ২৬ বছর ধরে এসব খেয়ে আমি ভালো আছি। বিষাক্ত কোনো কিছু খাই না। অভাবের কারণে এসব খাওয়া শুরু করেছিলাম। পরে সেটাই অভ্যাস হয়ে গেছে। এখনো খেয়ে যাচ্ছি। আমার কোনো রোগ-বালাই নেই।”

স্থানীয় শিক্ষক অনুপ কুমার সুতার বলেন, “প্রায় ২৫-২৬ বছর ধরে অমলকে এভাবেই দেখে আসছি। জঙ্গল ও খাল-বিল থেকে খাবার সংগ্রহ করে খায়। এত বছর পরও তাকে বেশ সতেজ মনে হয়।”

অন্যদিকে স্থানীয় বাসিন্দা রিপন জানান, এ ধরনের জীবনযাপন করা মানুষ ওই এলাকায় খুবই বিরল। প্রায় ২৫-২৬ বছর ধরে তাকে একইভাবে জীবন কাটাতে দেখছেন তিনি।

জানা গেছে, ১৯৮১ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন অমল কৃষ্ণ। এরপর জীবনের নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে তার দিন কাটে। প্রায় ২৬ বছর আগে চরম দারিদ্রতা ও তীব্র খাদ্যসংকটের সময়ে তিনি জঙ্গল ও জলাভূমির বিভিন্ন উদ্ভিদ খাওয়া শুরু করেন। সময়ের আবর্তে সেই অভাবের তাড়নায় শুরু হওয়া অভ্যাসই তার জীবনের নিয়মে পরিণত হয়েছে। নিজের কোনো ঘরবাড়ি না থাকায় তিনি কখনো পরিচিতদের বাড়িতে, আবার কখনো অন্যের ঘরে রাত কাটান। মাঝেমধ্যে তাকে ইন্দেরহাট ফেরিঘাট এলাকার একটি জরাজীর্ণ ঘরে অবস্থান করতে দেখা যায়। কোনো সংসার না থাকায় জীবনের এই শেষ প্রান্তে এসেও একাকী পথ চলছেন তিনি।

নেছারাবাদ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা ডা. আসাদুজ্জামান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “এ ধরনের জীবনযাপন অত্যন্ত বিরল। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বন্য বা জলজ উদ্ভিদ খেয়ে একজন মানুষের টিকে থাকা অবশ্যই ব্যতিক্রমী। অমল কৃষ্ণকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বর্তমানে কোনো রোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।”

তবে চিকিৎসকেরা কোনো রোগের প্রমাণ না পেলেও অপরিচিত বা বন্য উদ্ভিদ খাওয়ার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। কোন উদ্ভিদ নিরাপদ আর কোনটি বিষাক্ত তা নিশ্চিত না হয়ে এসব খাওয়া বিপজ্জনক হতে পারে বলে তাদের অভিমত।

৬৬ বছর বয়সে এসে অমল কৃষ্ণের জীবনের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো, পৃথিবীর চারপাশে অসংখ্য ঘরবাড়ি থাকলেও তার নিজের বলে নেই কোনো ঘর। নেই স্ত্রী, নেই সংসার, নেই নিয়মিত খাবারের নিশ্চয়তাও। অভাবের তাড়নায় শুরু হওয়া ২৬ বছরের এই জীবনযাপন এখন স্থানীয় মানুষের কাছে এক ব্যতিক্রমী ও বিস্ময়কর জীবনকাহিনি হয়ে দাঁড়িয়েছে।