বাবার অকাল প্রয়াণের পর পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার বা পিটিএসডিতে আক্রান্ত হয়েছিলেন আরিফ রহমান খান। দীর্ঘ মানসিক লড়াই এবং শোক কাটিয়ে তিনি যেভাবে পুনরায় পড়াশোনায় ফিরেছেন, সেই অভিজ্ঞতার কথা ভাগ করে নিয়েছেন তিনি। ১০ অক্টোবর আন্তর্জাতিক মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের বিশেষলিপিতে উঠে এসেছে তাঁর এই জীবনযুদ্ধের কথা।

আরিফ রহমান খান জানান, জীবনের প্রকৃত অর্থ বুঝে ওঠার আগেই কোভিড মহামারীর সময়ে তিনি তাঁর বাবাকে হারান। সেই মুহূর্তটি তাঁর জন্য ছিল চরম বিপর্যয়। তিনি বলেন, “জীবনের অর্থটা ঠিকমতো বুঝে ওঠার আগেই যখন কোভিডে আব্বুকে হারালাম, তখন মনে হয়েছিল, আমার পৃথিবীটা যেন এক মুহূর্তেই থমকে গেছে। এমন এক শূন্যতা ঘিরে ধরেছিল, যেখান থেকে কোনো দিন উঠে দাঁড়াতে পারব, এমনটা কল্পনাও করতে পারিনি। আব্বু আমার শিক্ষক, মেন্টর এবং আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণার জায়গাও ছিলেন। অথচ একটা সময় এসে জীবনের সবচেয়ে কঠিন পাঠটা আমার তাঁকে ছাড়াই শিখতে হচ্ছে—আব্বুকে ছাড়া বেঁচে থাকা।”

বাবার মৃত্যুর পর আরিফ পিটিএসডিতে আক্রান্ত হন, যার ফলে তাঁর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। তিনি ধীরে ধীরে সামাজিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। তাঁর ভাষায়, “আব্বুকে হারানোর পর আমি পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডারে (পিটিএসডি) ভুগতে শুরু করি। পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার মতো মানসিক অবস্থায় ছিলাম না। ধীরে ধীরে নিজেকে সবকিছু থেকে গুটিয়ে নিতে থাকি। বন্ধু, সহপাঠী, আত্মীয়স্বজন—সবার কাছ থেকেই যেন দূরে সরে যাচ্ছিলাম। বাইরে থেকে হয়তো আমাকে স্বাভাবিক মনে হতো, কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমি প্রতিনিয়ত নিজের সঙ্গে লড়াই করছিলাম। যে জীবনটা একসময় এত পরিচিত ছিল, সেটাই যেন হঠাৎ অচেনা হয়ে গেল।”

শৈশব থেকেই পড়াশোনায় ভালো হওয়ায় পরিবারের প্রত্যাশা ছিল অনেক। বিশেষ করে বড় ছেলে হিসেবে সেই চাপ আরও বেশি ছিল। তবে মানসিক বিপর্যয়ের সময়ে এই প্রত্যাশাগুলোই তাঁর কাছে অসহনীয় হয়ে ওঠে। আরিফ জানান, এক পর্যায়ে তিনি পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার কথা ভেবেছিলেন। সেই কঠিন সময়ে তিনি লক্ষ্য করেন, মানুষ কেবল সাফল্যের পাশে থাকে, ব্যর্থতার সময়ে অনেকে সেই পিছিয়ে পড়াকেই পরিচয় বানিয়ে ফেলতে চায়। অনেকে তাঁর হাল ছেড়ে দেওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন, যা তাঁর লড়াইকে আরও কঠিন করে তোলে।

তবে নিজের ভেতরে থাকা বিশ্বাসের জোরে তিনি পুনরায় ঘুরে দাঁড়ানোর সংকল্প করেন। বাবার স্বপ্ন পূরণের তাগিদ তাঁকে অনুপ্রাণিত করে। তিনি উপলব্ধি করেন, বাবাকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব না হলেও তাঁর দেখানো পথে হাঁটা সম্ভব। পিটিএসডি থেকে উত্তরণের জন্য তিনি প্রথমে নিজের কষ্টকে স্বীকার করে নিতে শেখেন। তিনি মনে করেন, প্রিয়জনকে হারানোর পর ভেঙে পড়া কোনো দুর্বলতা নয় এবং স্বাভাবিক থাকার অভিনয় করার প্রয়োজন নেই। নিজেকে সময় দেওয়া, অনুভূতি বোঝা এবং প্রয়োজনীয় মানসিক সহায়তা নেওয়ার মাধ্যমে তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন।

মানসিকভাবে শান্ত হতে তিনি ধ্যানের আশ্রয় নেন। বর্তমান মুহূর্তে মনোযোগ দেওয়া এবং অপ্রয়োজনীয় দুশ্চিন্তা থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করেন। ছোট ছোট পদক্ষেপের মাধ্যমে তিনি পুনরায় রুটিনে ফিরে আসেন। প্রতিদিন অল্প করে পড়াশোনা এবং ছোট কাজ শেষ করার মাধ্যমে তিনি আত্মবিশ্বাস ফিরে পান। তিনি বলেন, “সবকিছু এক দিনে ঠিক হয়ে যায়নি, আত্মবিশ্বাসও এক রাতের মধ্যে ফিরে আসেনি। তবু ধীরে ধীরে আবার পড়াশোনায় ফেরার কথা ভাবলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম, যত সময়ই লাগুক, নিজের জীবনটা নতুন করে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করব। আব্বুর স্বপ্ন পূরণের পথে আবারও হাঁটব।”

কোভিডে বাবাকে হারানোর পর অণুজীবের কার্যকারিতা সম্পর্কে জানার তীব্র আগ্রহ তৈরি হয় তাঁর। এই আগ্রহ থেকেই তিনি ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির (আইইউবি) মাইক্রোবায়োলজি বিভাগে ভর্তি হন। দীর্ঘ বিরতির পর কঠিন বিষয়ে পড়াশোনা করা নিয়ে অনেকের সংশয় থাকলেও আরিফ ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি জানান, এখন তিনি মাইক্রোবায়োলজি বিষয়টিকে উপভোগ করছেন এবং পড়াশোনা তাঁর কাছে এখন কেবল ডিগ্রির জন্য নয়, বরং নিজের আগ্রহ অনুসরণের মাধ্যম।

পেছনের দিনগুলোর কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, শোক, অনিশ্চয়তা এবং চারপাশের মানুষের নেতিবাচক মন্তব্যের মধ্য দিয়ে তাঁকে যেতে হয়েছে। অনেকে বলেছিলেন পড়াশোনার আর প্রয়োজন নেই, কিন্তু তিনি জানতেন তাঁর গন্তব্য কোথায়। বর্তমানে তাঁর লক্ষ্য অত্যন্ত স্পষ্ট। তিনি ভবিষ্যতে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স নিয়ে গবেষণা করতে চান এবং একাডেমিয়ায় থেকে জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে অন্যদের সহায়তা করতে চান।

বাবার অভাব তিনি এখনো অনুভব করেন। তবে সেই শূন্যতাকে তিনি শক্তিতে রূপান্তর করেছেন। তাঁর মতে, প্রিয়জনদের ভালোবাসা ও শিক্ষা আমাদের ভেতরে বেঁচে থাকে। আরিফের কাছে তাঁর বাবার স্মৃতিই এখন সবচেয়ে বড় শক্তি, যা তাঁকে প্রতিনিয়ত সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দেয়।