বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জের যৌক্তিকতা এবং গণশুনানি ছাড়াই জ্বালানির দাম বাড়ানোর বিষয়ে সংসদীয় কমিটির কড়া প্রশ্নের মুখে পড়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। আইন অনুযায়ী গত ২৩ বছরেও জ্বালানির দাম নির্ধারণে প্রয়োজনীয় গণশুনানি-সংক্রান্ত প্রবিধান তৈরি না করার কারণ জানতে চেয়েছেন কমিটির এক সদস্য। পাশাপাশি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর প্রকৃত উৎপাদন সক্ষমতা যাচাই এবং ক্যাপাসিটি চার্জের যৌক্তিকতা নিশ্চিত করতে ফরেনসিক অডিটের দাবি জানিয়েছেন আরেক সদস্য।
আজ শনিবার জাতীয় সংসদ ভবনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে কমিটির সদস্য জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান এবং এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।
বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে ২ লাখ ৮৯ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ প্রদান করা হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রদান নিয়ে প্রশ্ন তুলে নাজিবুর রহমান বলেন, “ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে হাইকোর্টে একটি মামলার রায় হয়েছে। পরে একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছিল। সে কিমিটির সুপারিশ কী ছিল, সুপারিশ কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে—এ বিষয়ে পরবর্তী বৈঠকে জানাতে বলা হয়েছে।”
নাজিবুর রহমান আরও উল্লেখ করেন, ২০০৩ সালের বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইনের ৩৪ ধারায় স্পষ্টভাবে বলা আছে যে, কমিশন শুনানির মাধ্যমে জ্বালানির দাম নির্ধারণ করবে এবং এর জন্য একটি প্রবিধান তৈরি করবে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, গত ২৩ বছরে কেন এই প্রবিধান তৈরি করা হলো না। বৈঠকে মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কোনো সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেনি। এছাড়া সম্প্রতি এলপিজি এবং জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে কোনো গণশুনানি করা হয়েছে কি না, সেই বিষয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। পাশাপাশি ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের বর্তমান অগ্রগতি কতটুকু, সে বিষয়েও মন্ত্রণালয় সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে ব্যর্থ হয়।
কমিটির অন্য সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ সাংবাদিকদের জানান, ডিজেল একটি কৌশলগত জ্বালানি হওয়া সত্ত্বেও দেশে এর মজুত মাত্র ৩১ দিনের। এই মজুতের পরিমাণ কীভাবে বাড়ানো যায়, তা দেখার কথা বলা হয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে ২৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও প্রকৃত উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ১৪ হাজার মেগাওয়াট। অথচ এখন পর্যন্ত ২ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া হয়েছে। এই অসংগতির বিষয়ে তিনি ফরেনসিক অডিটের দাবি জানান।
রান্নার এলপিজি গ্যাসের বাজার পরিস্থিতি নিয়ে হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, “রান্নার এলপিজির সিলিন্ডার এখন ২ হাজার ৫০০-৬০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। বাজারে সরকার অনুপস্থিত, কোনো নজরদারি নেই।” তিনি এই ক্ষেত্রে সরকারের নজরদারি বাড়ানোর আহ্বান জানান।
সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলে হাসনাত আব্দুল্লাহ দাবি করেন, ভবনের ছাদে ৫০ মেগাওয়াটের একটি সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনায় খরচ হওয়ার কথা প্রায় ১৫০ কোটি টাকা। কিন্তু সরকারি প্রকল্পে এই ধরনের খরচের পরিমাণ ধরা হয়েছে ৩৫০ কোটি টাকারও বেশি। আগামী বৈঠকে কোন খাতে কত খরচ ধরা হয়েছে, তার বিস্তারিত বিবরণ দিতে মন্ত্রণালয়কে বলা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, “বিটিভি ও বাসসকে ব্যবহার করে এক ধরনের অসত্য তথ্য প্রচার করা হয়েছে যে সরকার এই কিছুদিনের মধ্যে ৩২টি গ্যাস কূপ খনন করেছে। এগুলো কোথায় তা জানানো উচিত।”
বৈঠক শেষে সংসদ সচিবালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ভবনের ছাদের সোলার প্যানেল থেকে কতটুকু বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে, তা আগামী বৈঠকে উপস্থাপনের সুপারিশ করেছে কমিটি। বৈঠকে জানানো হয়, বর্তমানে দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১২ হাজার ২২ মেগাওয়াট হলেও প্রকৃত উৎপাদন মাত্র ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার মেগাওয়াট। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ সক্ষমতা ৬ হাজার ৯২৭ মেগাওয়াট এবং প্রকৃত উৎপাদন ৫-৬ হাজার মেগাওয়াট। তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ সক্ষমতা ৬ হাজার ৪০৯ মেগাওয়াট হলেও প্রকৃত উৎপাদন আড়াই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে।
কমিটির সভাপতি মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপুর সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদ ভবনে এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, মোহাম্মদ কয়ছর আহমেদ, রফিকুল ইসলাম হিলালী, এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন, নায়াব ইউসুফ আহমেদ, মমতাজ আলো, মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান এবং মো. আবুল হাসনাত (হাসনাত আব্দুল্লাহ)।