ভারতের দিল্লিতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আয়োজিত প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘিরে ব্যাপক ধরপাকড় ও কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এই পরিস্থিতির প্রতিবাদে সরব হয়েছেন চলচ্চিত্র অঙ্গনের একাধিক পরিচিত মুখ। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল সন্ধ্যায় মুম্বাইয়ে এক প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে আটক হয়েছেন অভিনেতা ইমরান খান। আজাদ ময়দানের নিকটবর্তী এলাকায় পুলিশের চালানো এক অভিযানে প্রায় ৪০০ জন প্রতিবাদকারীকে আটক করা হয়, যাদের মধ্যে ইমরান খানও ছিলেন। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে সিজেপি এই আন্দোলনের ডাক দিয়েছিল। তাদের প্রধান দাবি হলো, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে অবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে এবং বর্তমান সংশোধনপ্রক্রিয়া বন্ধ করতে হবে।
আটক অভিযানের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি কার্টুন শেয়ার করেছেন অভিনেতা প্রকাশ রাজ। ব্যঙ্গচিত্রশিল্পী সতীশ আচার্যের আঁকা সেই কার্টুনটি শেয়ার করে তিনি লিখেছেন, “নাগরিকদের ভিন্নমত প্রকাশ থেকে আর কত দিন পালাবেন?” এছাড়া অভিজিৎ দিপ, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে বিমান থেকে আটক করার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে একটি ভিডিও বার্তাও প্রকাশ করেন তিনি। প্রকাশ রাজ প্রশ্ন তোলেন, তরুণদের বিমান কিংবা বাড়ি থেকে আটক করা হচ্ছে এবং এমনকি প্রতিবাদস্থলে পৌঁছাতেও দেওয়া হচ্ছে না—এমন পরিস্থিতি কীভাবে সম্ভব?
আবেগের সাথে অভিনেতা বলেন, “আপনারা আমাদের কণ্ঠকে গ্রেপ্তার করেননি, নিজেদেরই গ্রেপ্তার করেছেন।” গণতন্ত্রকে ধ্বংস হতে দেওয়া হবে না বলে ঘোষণা করে তিনি জানান, প্রশ্ন তোলার লড়াই অব্যাহত থাকবে। উল্লেখ্য, এর আগেও দিল্লিতে অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং প্রতিবাদ কর্মসূচির অনুমতি না দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন প্রকাশ রাজ।
অন্যদিকে, পরিচালক অনুরাগ কাশ্যপ ইনস্টাগ্রামে লিখেছেন, “দুই ভিতু, ৪০ হাজার দাস, লাখ লাখ সাহসী মানুষ।” দিল্লিতে আন্দোলনকারীদের ওপর দমন-পীড়ন ও ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থার পরিপ্রেক্ষিতেই তাঁর এই মন্তব্য। এছাড়া তিনি অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) সভাপতি নেহা বোরার লাইভ অনুসরণ করার আহ্বান জানান। ‘হিন্দুস্তান টাইমস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দিল্লি হাট এলাকায় কয়েক শ মানুষকে নিয়ে প্রতিবাদ শুরু করার পর নেহা বোরাকেও আটক করা হয়।
সংগীতশিল্পী বিশাল দাদলানি ইনস্টাগ্রামে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে সরকারের পদক্ষেপের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তাঁর দাবি, একজনকে রক্ষা করার জন্য সরকার নিজের দেশের মানুষের প্রতিবাদ করার মৌলিক অধিকারের বিরুদ্ধেই অবস্থান নিয়েছে। বিশাল জানান, প্রতিবাদ দমনে ২৩টি ব্যাটালিয়ন মোতায়েন করা হয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে ব্যারিকেড দেওয়ার ফলে ট্রেন ও মেট্রো চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে এবং স্বাভাবিক জনজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
বিশালের অভিযোগ, একজনকে রক্ষা করার জন্য পুরো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে এমনভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা নিয়ে সাধারণ নাগরিকদের প্রশ্ন তোলা উচিত। উল্লেখ্য, বিশাল এর আগেও সিজেপির প্রতিবাদ কর্মসূচিতে সমর্থন জানিয়েছিলেন। গত ২ অক্টোবর মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্কে সংগঠনটির কর্মসূচিতে অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ ও শাবানা আজমিও অংশ নিয়েছিলেন।
চলচ্চিত্র সম্পাদক ও নির্মাতা অপূর্ব আসরানি অভিজিৎ দিপ, রত্না সিং ও ইউটিউবার ধ্রুব রাঠির আটকের প্রসঙ্গ তুলে লিখেছেন, “আমাকে বলুন, এটা স্বৈরাচার নয়।” আরেকটি পোস্টে তিনি লিখেছেন, “গণতন্ত্রের অবসান।” পরিচালক শিরীষ কুন্দর প্রশ্ন তুলেছেন, নিজের দেশের মানুষের কাছ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে বলপ্রয়োগ করতে হলে কত দিন টিকে থাকা সম্ভব? তিনি আরও বলেন, শিশুরাও যখন কাউকে নিয়ে ঠাট্টা করতে শুরু করে, তখন বুঝতে হবে যে মানুষ আর তাকে ভয় পাচ্ছে না। পরিচালক বিক্রমাদিত্য মোতওয়ানে ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে আন্দোলনকারীদের আটকের নিন্দা জানিয়ে একাধিক পোস্ট দিয়েছেন। অভিনেতা মোহাম্মদ জিশান আইয়ুব জার্মান নাট্যকার বার্টোল্ট ব্রেখটের একটি কবিতার হিন্দি অনুবাদ শেয়ার করে প্রতিবাদকারীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন।
কৌতুকশিল্পী বীর দাস এক্সে ‘স্ট্রাইস্যান্ড এফেক্ট’-এর অর্থসংবলিত একটি স্ক্রিনশট পোস্ট করেছেন। সাধারণত কোনো বিষয় চাপা দেওয়ার চেষ্টা করলে তা উল্টো আরও বেশি মানুষের নজরে আসে, যাকে স্ট্রাইস্যান্ড এফেক্ট বলা হয়। তাঁর পোস্টের মাধ্যমে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, প্রতিবাদ ঠেকানোর সরকারি পদক্ষেপের ফলে ঘটনাটি আরও বেশি আলোচনায় এসেছে।
দিল্লির বাইরে মুম্বাইয়েও এই প্রতিবাদের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে। ‘হিন্দুস্তান টাইমস’-এর লাইভ আপডেট অনুযায়ী, আজাদ ময়দানের কাছে পুলিশের অভিযানে আটক প্রায় ৪০০ প্রতিবাদকারীর মধ্যে অভিনেতা ইমরান খানও ছিলেন। তবে তাঁকে আটকের সুনির্দিষ্ট কারণ, আটকের পর কোথায় নেওয়া হয়েছে কিংবা তিনি মুক্তি পেয়েছেন কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য জানানো হয়নি।
রামায়ণ সিরিজে লক্ষ্মণের চরিত্রে অভিনয় করে পরিচিতি পাওয়া সুনীল লাহিড়ি সরাসরি কোনো পক্ষের সমর্থনে না গিয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। একটি ভিডিও পোস্ট করে তিনি লিখেছেন, “বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের প্রত্যেককে খুব সতর্কভাবে ও ভেবেচিন্তে প্রতিটি পদক্ষেপ নিতে হবে। একটি ভুল পদক্ষেপের পরিণতি অত্যন্ত গুরুতর হতে পারে।”
অন্যদিকে, গীতিকার মনোজ মুনতাশির আন্দোলনের নেতৃত্ব ও উদ্দেশ্য নিয়ে সমালোচনা করেছেন। প্রায় ৮ মিনিট ৪২ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে তিনি সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপ ও ইউটিউবার ধ্রুব রাঠির বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন। মনোজের দাবি, তরুণেরা ভোট চুরির অভিযোগ নিয়ে প্রতিবাদে অংশ নিচ্ছেন, কিন্তু আন্দোলনের পেছনের প্রকৃত তথ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে তাঁদের আরও জানা প্রয়োজন। তিনি অভিযোগ করেন, অভিজিৎ দিপকের সঙ্গে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের দলের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এবং আম আদমি পার্টির নির্বাচনী পরাজয়ের পর পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার লক্ষ্যে তরুণদের উদ্যমকে কাজে লাগানো হচ্ছে।