২০০৮ সালের ৮ মে রাতের ঘটনা। লাস ভেগাসের জরুরি সেবা নম্বরে ফোন করে থমাস র্যান্ডলফ দাবি করেন, তাঁর স্ত্রীকে গুলি করা হয়েছে এবং তিনি বাড়িতে ঢুকে পড়া এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করেছেন। প্রথম দৃষ্টিতে ঘটনাটি আত্মরক্ষার একটি সাধারণ মামলা বলে মনে হলেও, তদন্ত যত গভীরে গিয়েছে, ততই উন্মোচিত হয়েছে র্যান্ডলফের জীবনের এক অন্ধকার অধ্যায়। একের পর এক বিয়ে, স্ত্রীদের রহস্যজনক মৃত্যু এবং জীবনবিমার মোটা অঙ্কের অর্থ—সব মিলিয়ে এক রোমহর্ষক চিত্র ফুটে উঠেছে।
এই দীর্ঘ তদন্তের বিস্তারিত বিবরণ এখন সামনে এসেছে নেটফ্লিক্সের নতুন তথ্যচিত্র ‘দ্য উইডোয়ার: টিল ডেথ ডু আস পার্ট’-এ। পরিচালক ক্রিস স্মিথের এই তথ্যচিত্রের অন্যতম প্রধান চরিত্র হলেন ‘ডেটলাইন এনবিসি’-র প্রযোজক ড্যান স্লেপিয়ান। ২০০৮ সালের সেই ঘটনার পর থেকে পরবর্তী প্রায় ১৫ বছর তিনি এই তদন্তের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
র্যান্ডলফের অপরাধের সূত্র ধরে যাওয়া হলে দেখা যায়, ১৯৭৫ সালে তিনি ক্যাথিকে বিয়ে করেছিলেন। তাঁদের দুই সন্তান ছিল এবং র্যান্ডলফ ক্যাথির নামে জীবনবিমাও করিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ক্যাথি বিবাহবিচ্ছেদ করে অন্য একজনকে বিয়ে করেন। ক্যাথির বর্তমান স্বামী স্টিভ থমাস তদন্তকারীদের জানান, র্যান্ডলফ একসময় তাঁকে প্ররোচিত করার চেষ্টা করেছিলেন যাতে তিনি ক্যাথিকে হত্যা করেন।
এরপর আসে দ্বিতীয় স্ত্রী বেকি গল্টের প্রসঙ্গ। ১৯৮৩ সালে ক্যাথির সঙ্গে বিচ্ছেদের দিনই বেকিকে বিয়ে করেন র্যান্ডলফ। তবে তিন বছর পর ইউটাহর বাড়িতে মাথায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় বেকির মরদেহ পাওয়া যায়। শুরুতে এটিকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়া হলেও পরে তদন্তের মোড় ঘোরে। জানা যায়, বেকির জীবনবিমা থেকে ৫ লাখ ডলার পেয়েছিলেন র্যান্ডলফ। ১৯৮৮ সালে হত্যার অভিযোগে র্যান্ডলফকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। তাঁর বন্ধু এরিক টারান্টিনো আদালতে সাক্ষ্য দেন যে, তাঁকে বেকিকে হত্যার জন্য নিয়োগ করা হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত র্যান্ডলফ খালাস পান, কারণ তাঁর আইনজীবীরা আদালতকে বিশ্বাস করাতে সক্ষম হন যে বেকির মৃত্যু আত্মহত্যা হতে পারে। কিন্তু সন্দেহ সেখানেই শেষ হয়নি।
যে রাত সবকিছু বদলে দিল, সেদিন র্যান্ডলফ তাঁর ষষ্ঠ স্ত্রী শ্যারন কসকে নিয়ে মাদার্স ডে উপলক্ষে রাতের খাবার খেয়ে বাড়ি ফেরেন। তাঁর ভাষ্যমতে, বাড়িতে পৌঁছে তিনি গাড়িতে বসে রেডিও শুনছিলেন এবং শ্যারন একাই ঘরে ঢোকেন। কিছুক্ষণ পর গুলির শব্দ শোনা যায়। র্যান্ডলফ দাবি করেন, শব্দ শুনে ঘরে ঢুকে তিনি শ্যারনকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন এবং এরপর একটি ছায়ামূর্তি দেখে পাশের ঘর থেকে বন্দুক এনে সেই মুখোশধারী ব্যক্তিকে গুলি করেন।
তদন্তকারী ডিন ও’কেলি এই বর্ণনায় বেশ সন্দেহ পোষণ করেন। তাঁর প্রশ্ন ছিল, মুখোশে রক্তের দাগ নেই কেন? করিডোরে গুলি চললেও গুলির খোসা পাওয়া গেল না কেন? সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল সময়ের ব্যবধান নিয়ে; প্রতিবেশী রাত ৮টা ৩৩ মিনিটে গুলির শব্দ শুনলেও র্যান্ডলফ পুলিশকে ফোন করেন ৮টা ৪৫ মিনিটে। কেন এই ১২ মিনিটের দেরি? এই অসংগতিগুলোই তদন্তের গতিপথ বদলে দেয়।
তদন্তকারীরা শ্যারনের জীবনবিমা এবং র্যান্ডলফের পুরোনো ইতিহাস খতিয়ে দেখেন। শ্যারনের মেয়ে কলিন জানান, বিয়ের মাত্র তিন মাসের মধ্যে র্যান্ডলফ তাঁর মায়ের উইলে নিজেকে সুবিধাভোগী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করিয়েছিলেন এবং একই সঙ্গে শ্যারনের নামে ৩ লাখ ৫০ হাজার ডলারের জীবনবিমা করেছিলেন। এরপর তদন্তকারীরা উত্তর ক্যারোলাইনায় মাইক মিলারের পরিবারের কাছে যান। মিলার ছিলেন র্যান্ডলফের পরিচিত ও কর্মী। তাঁর পরিবার জানায়, র্যান্ডলফের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ ছিল এবং এমনকি স্ত্রীকে হত্যার বিষয়ে র্যান্ডলফ একবার মিলারের সঙ্গে কথা বলেছিলেন।
তদন্তকারীরা বুঝতে পারেন, শ্যারনের ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। তাঁরা র্যান্ডলফের আগের বিয়েগুলো পুনরায় খতিয়ে দেখতে শুরু করেন। প্রথম স্ত্রী ক্যাথির ঘটনা এবং দ্বিতীয় স্ত্রী বেকি গল্টের মৃত্যুর রহস্য আবারও সামনে আসে। ১৯৮৮ সালের মামলায় এরিক টারান্টিনোর সাক্ষ্য সত্ত্বেও র্যান্ডলফ যে খালাস পেয়েছিলেন, তা ছিল কেবল আইনি কৌশলের ফল।
বেকির পর র্যান্ডলফের জীবনে আরও তিন নারী আসেন। গেইনাল অলমন জানান, র্যান্ডলফ তাঁর নামেও জীবনবিমা করেছিলেন, যদিও পরে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে যায়। ফ্রান্সিস র্যান্ডলফের ক্ষেত্রে ঘটনাটি আরও অস্বাভাবিক ছিল। হৃদ্যন্ত্রের সমস্যায় অস্ত্রোপচারের জন্য চিকিৎসক বেছে দিয়েছিলেন র্যান্ডলফ। অস্ত্রোপচারের পর ফ্রান্সিসের মৃত্যু হলে র্যান্ডলফ দাবি করেন, চিকিৎসায় ভুলের কারণেই এই পরিণতি। এরপর তিনি জীবনবিমার অর্থ পান এবং হাসপাতালের বিরুদ্ধে মামলা করেন। উল্লেখ্য, এর আগে ফ্রান্সিসের কাছ থেকে নিজের উইল পড়ে শোনানোর একটি ভিডিও ধারণ করেছিলেন তিনি। এরপর লিওনা স্ট্যাপলটনকে বিয়ে করেন র্যান্ডলফ, যার কিছুদিন পর ক্যানসারে তাঁর মৃত্যু হয়।
একাধিক স্ত্রী, রহস্যময় মৃত্যু এবং জীবনবিমার অর্থের এই ধারাবাহিকতা র্যান্ডলফকে এনে দেয় ‘ব্ল্যাক উইডোয়ার’ তকমা। যদিও তিনি বরাবরই নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন।
‘দ্য উইডোয়ার’ তথ্যচিত্রের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো, র্যান্ডলফ যে ক্যামেরাকে নিজের পক্ষে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেটিই তাঁর বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে দাঁড়ায়। ১৫ বছর ধরে ধারণ করা সাক্ষাৎকার, তদন্তের মুহূর্ত, র্যান্ডলফের বক্তব্য এবং তাঁর আচরণ—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এমন এক আর্কাইভ, যা সময়ের সঙ্গে তাঁর কথাগুলোকেই বারবার যাচাই করার সুযোগ দিয়েছে।
ড্যান স্লেপিয়ান ২০০৮ সালে শ্যারনের মৃত্যুর পর তদন্তে যুক্ত হয়ে ও’কেলির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ঘুরে সাক্ষীদের সঙ্গে কথা বলেন। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে ইউটাহতে মায়ের বাড়িতে থাকাকালীন র্যান্ডলফকে গ্রেপ্তার করা হয়, যার দৃশ্য স্লেপিয়ানের ক্যামেরায় ধরা পড়ে। কারাগারে যাওয়ার পরও র্যান্ডলফ স্লেপিয়ানের সঙ্গে কথা বলতেন। তাঁর ধারণা ছিল, ক্যামেরা তাঁকে নিজের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ দিচ্ছে। স্লেপিয়ানের ভাষায়, র্যান্ডলফ সন্দেহকে ভয় পাওয়ার বদলে সেটিকেই নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইতেন। একসময় তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘আমরা একসঙ্গে কুখ্যাত হয়ে যাব।’ স্লেপিয়ানের কাছে সবচেয়ে অস্বস্তিকর ছিল কথাটির বিষয় নয়; বরং র্যান্ডলফের স্বাভাবিক ভঙ্গি।
২০১৭ সালে শ্যারন কস হত্যার প্রায় আট বছর পর র্যান্ডলফের বিচার হয়। তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র এবং দুটি প্রথম ডিগ্রি হত্যার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তবে তিন বছর পর নেভাদা সুপ্রিম কোর্ট সেই দণ্ড বাতিল করেন। আদালতের মতে, বেকি গল্টের পুরোনো মামলার প্রমাণ আগের বিচারে যেভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল, তা গ্রহণযোগ্য ছিল না।
২০২৩ সালে পুনরায় বিচার অনুষ্ঠিত হয়। তদন্তকারী ডিন ও’কেলি আদালতে শ্যারনের মৃত্যুর রাতের অসংগতিগুলো তুলে ধরেন এবং র্যান্ডলফের নিজের তৈরি করা ঘটনার পুনর্নির্মাণের ভিডিও গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। শেষ পর্যন্ত জুরি তাঁকে আবারও দোষী সাব্যস্ত করে এবং ৬০ বছর থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা দেওয়া হয়।
বর্তমানে ৭১ বছর বয়সী র্যান্ডলফ নেভাদার লাভলক কারেকশনাল সেন্টারে বন্দী। তিনি এখনো নিজেকে নির্দোষ দাবি করছেন। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরেও তাঁর একটি আপিল খারিজ হয়েছে। একটি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করতে গিয়ে যে গল্প শুরু হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠেছে একাধিক বিয়ে, মৃত্যু, জীবনবিমা, সন্দেহ এবং বিচারব্যবস্থার সঙ্গে দীর্ঘ লড়াইয়ের এক বাস্তব কাহিনী।