বিদ্যমান ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর পণ্য উৎপাদন, আমদানি, বাজারজাত ও বিক্রি করা নিষিদ্ধ। তবে এখন এই বিধানের পরিধি আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। নতুন প্রস্তাবনায় শুধু মানুষই নয়, বরং গবাদিপশু, মৎস্যসহ যেকোনো প্রাণীর জীবন ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর পণ্য উৎপাদন, আমদানি, বাজারজাত বা বিক্রি করা নিষিদ্ধ হবে। অর্থাৎ, প্রাণীর স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য বাজারজাত করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে সরকার।

দীর্ঘ ১৭ বছর পর ২০০৯ সালের ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনটি সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ (সংশোধন) আইন’-এর একটি খসড়া তৈরি করেছে। গত ১০ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠকের পর এই খসড়াটি প্রস্তুত করা হয় এবং ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত এই খসড়ার ওপর সংশ্লিষ্ট মহলের মতামত নেওয়া হচ্ছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ‘ওয়ান হেলথ’ ধারণার গুরুত্ব বাড়ছে। এই ধারণার মূল কথা হলো মানুষের স্বাস্থ্য, প্রাণীর স্বাস্থ্য এবং পরিবেশের স্বাস্থ্যকে আলাদা করে না দেখে বরং একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হিসেবে বিবেচনা করা। এই সামগ্রিক সুস্থতার কথা মাথায় রেখেই প্রাণীর জীবন ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর পণ্যকেও আইনের আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ বিষয়ে বাণিজ্যসচিব মো. আতাউর রহমান খান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার পাশাপাশি প্রাণী ও পরিবেশের স্বাস্থ্যও এখন গুরুত্বপূর্ণ। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনকে সময়োপযোগী করতে তাই বিষয়টিকে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে ডিজিটাল কমার্সকে। মোটকথা, আইনটিকে আমরা হালনাগাদ করতে চাইছি। জনমত পাওয়ার পর চূড়ান্ত খসড়া তৈরি করা হবে। এরপর তা অনুমোদনের জন্য যাবে মন্ত্রিসভার বৈঠকে।’

আইনের খসড়ায় নিষিদ্ধ পণ্য, ওষুধ বা ভেজাল খাদ্য ও পণ্য বিক্রি, বিক্রির প্রস্তাব কিংবা প্রদর্শনকেও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সরকারি অনুমোদন বা নিবন্ধন ছাড়া কোনো পণ্য, ওষুধ বা সেবা প্রস্তুত, উৎপাদন, বিক্রি বা সরবরাহ করা যাবে না। নিষিদ্ধ পণ্য বা সেবার বিজ্ঞাপনের বিষয়টিও অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এছাড়া ভোক্তাদের বিভ্রান্ত করার জন্য মিথ্যা বিজ্ঞাপন, অসত্য ঘোষণা বা ভুল তথ্য প্রচার করা যাবে না।

২০০৯ সালে যখন আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছিল, তখন ডিজিটাল কমার্সের বিষয়টি বর্তমানের মতো বিস্তৃত ছিল না। তাই এবার ডিজিটাল বাণিজ্যের সংজ্ঞা স্পষ্ট করে আইনে যুক্ত করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদিত পেমেন্ট গেটওয়ে এবং লাইসেন্সধারী কুরিয়ার সার্ভিসের সংজ্ঞাও অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অনলাইন জুয়া বা বেটিংয়ের আয়োজন এবং এতে সহায়তার জন্য শাস্তির বিধান রাখা হচ্ছে। এসব অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড বা তিন লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের সুপারিশ করা হয়েছে।

ক্রেতাদের অধিকার রক্ষায় খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, পণ্য, ওষুধ বা সেবা বিক্রির সময় ক্রেতাকে রসিদ না দেওয়া অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। রসিদ না দেওয়ার অপরাধে সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড বা এক লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হতে পারে।

পণ্য বা সেবার নির্ধারিত মান নিশ্চিত না করার ক্ষেত্রেও শাস্তির কথা বলা হয়েছে। খসড়া অনুযায়ী, কোনো বিক্রেতা সরকার নির্ধারিত মান অথবা আইন বা বিধিতে নির্ধারিত মান বজায় না রাখলে সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

ভেজাল পণ্য বা ওষুধ বিক্রির শাস্তিতেও পরিবর্তনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বর্তমান আইনে এই অপরাধে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। সংশোধনীতে কারাদণ্ডের সর্বোচ্চ মেয়াদ কমিয়ে দুই বছর করার পাশাপাশি জরিমানার পরিমাণ বাড়িয়ে তিন লাখ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

আইনি প্রক্রিয়ায় দেওয়ানি মামলার আপিল ব্যবস্থাতেও পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। বর্তমানে কোনো রায় বা ডিক্রির বিরুদ্ধে ৯০ দিনের মধ্যে হাইকোর্টে আপিল করা যায়। সংশোধনীতে এই সময়সীমা কমিয়ে ৬০ দিন করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আপিলের আদালত হাইকোর্ট বিভাগ থেকে পরিবর্তন করে সংশ্লিষ্ট জেলা জজ আদালত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার পর একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পুনরায় একই ধরনের অপরাধ করলে ফৌজদারি কার্যক্রমের বিষয়টি আরও স্পষ্ট করার প্রস্তাব করা হয়েছে। মহানগরে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এবং মহানগরের বাইরে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এ ধরনের মামলা পরিচালনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ও সাবেক সচিব এ এইচ এম সফিকুজ্জামান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘১৭ বছরে ভোক্তা অধিকারের অনেক মাত্রা বদলে গেছে। ফলে আইনটিকে যুগোপযোগী করা জরুরি। মানুষ সুস্থ থাকতে হলে প্রাণী ও পরিবেশেরও সুস্থতা দরকার। ফলে এসব বিষয় আইনে আসা উচিত। আইন সংশোধনে ওয়ান হেলথ ধারণাকে মাথায় রাখা হচ্ছে জেনে ভালো লাগছে। ডিজিটাল বাণিজ্যও শেষ পর্যন্ত থাকছে,এটা ভালো দিক।’