বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের নামে ৭০০টি অটোরিকশার মালিকানার দাবি করেছেন ডিএনসিসি প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান। প্রশাসকের এই মন্তব্যের প্রেক্ষিতে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করে এর প্রমাণ চেয়েছেন।
গত শুক্রবার (৮ অক্টোবর) নিজের ফেসবুক আইডিতে এক দীর্ঘ পোস্টে ডিএনসিসি প্রশাসকের এই মন্তব্যের নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন জামায়াত নেতা। পোস্টে তিনি লেখেন, “রাজনৈতিক আদর্শের মোকাবিলায় আদর্শ দিয়ে, চরিত্র দিয়ে, নৈতিকতা দিয়ে যারা মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়, তারা যে কতটা বিকৃত রুচির, আদর্শহীন ও বিবেকবর্জিত হতে পারে, কথার শালীনতা কতটা নিম্নগামী হতে পারে, তা তাদের কর্মকাণ্ডেই প্রকাশ পায়।”
মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন যে, বেশ কিছু দিন ধরে একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গ্রুপ এবং ভুয়া ফটোকার্ডের মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, “কয়েক দিন ধরে ভুয়া ফটোকার্ড এবং একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গ্রুপের পক্ষ থেকে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। অথচ যার নিজের একটি রিকশাও নেই, তিনি নাকি ৭০০-৮০০ রিকশার মালিক! এ ধরনের প্রচারণা মানুষকে অবাক করেছে, বিস্মিত করেছে।”
এই ধরনের মিথ্যা প্রচারণার পেছনে রাজনৈতিক দেউলিয়াপনা ও অসহায়ত্বের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আদর্শহীনতা, চরিত্রহীনতা, রাজনৈতিক অসহায়ত্ব ও দেউলিয়াপনার কতটা সংকটে পড়লে মানুষ এ ধরনের মিথ্যা প্রচারে লিপ্ত হতে পারে, তা এই অপপ্রচার থেকেই কিছুটা উপলব্ধি করা যায়।”
নিজের রুচির কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, “আমি ভেবেছিলাম, আমার নামে বিভিন্ন মহলের এ ধরনের অহেতুক মিথ্যা প্রচারণা নিয়ে কিছু বলব না। কারণ, এ বিষয়ে কথা বলা আমি নিজের রুচির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ মনে করি না। বিষয়টি আমার রুচিতে আসে না, আমার রুচির সঙ্গে মেলে না।”
ডিএনসিসি প্রশাসকের রাজনৈতিক নিয়োগের কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “অবশেষে ঢাকা সিটি করপোরেশনের রাজনৈতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত একজন প্রশাসকও যখন এই মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে একই কথা বলতে থাকেন, তখন আর কী বলার থাকে! কিছু করার না থাকলে খই ভাজ, অবস্থা যেন এমনই!”
শিক্ষিত ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “কোনো শিক্ষিত, ভদ্র ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ কি এ ধরনের মিথ্যাচার করতে পারেন? তাদের রাজনৈতিক দেউলিয়াপনা দেখে তাদের জন্য আমার খুব মায়া হয়। তাদের জন্য আমি অত্যন্ত দুঃখিত।”
টেলিভিশন টক শোতে অংশ নেওয়া কিছু সুশীল ব্যক্তির সমালোচনা করে তিনি বলেন, “আবার এসব অসত্য তথ্য নিয়ে টক শোতে তথাকথিত কিছু সুশীল ব্যক্তি, যারা সরকারি দলের তেলবাজি ও চাটুকারিতার মাধ্যমে তাদের প্রিয়ভাজন হতে চান, বিভিন্ন পদ-পদবি কিংবা পদোন্নতি পাওয়ার আশায় টকশোর টেবিলে বসেন, তারাও এসব অসত্য তথ্য নিয়ে মিথ্যা গল্প ফাঁদছেন, যা মানুষের কাছে অরুচিকর ও হাস্যকর মনে হচ্ছে।”
মিয়া গোলাম পরওয়ার এই পুরো প্রক্রিয়ার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, “আমি এসব কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানাই। সাহস থাকলে রাজনীতিকে রাজনীতি দিয়ে, আদর্শকে আদর্শ দিয়ে এবং নৈতিকতাকে নৈতিকতা দিয়ে মোকাবিলা করুন। এত মিথ্যাচার, বক্তব্যের শালীনতার এত নিম্নগামিতা, এসব আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এবং সুন্দর রাজনীতির সম্ভাবনাকে কলঙ্কিত করা ছাড়া আর কোনো ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে বলে আমার মনে হয় না।”
ভুয়া আইডি ও ফটোকার্ড ব্যবহারকারীদের সতর্ক করে তিনি বলেন, “যারা ফেইক আইডি ও ভুয়া ফটোকার্ড দিয়ে শুধু আমার বিরুদ্ধেই নয়, বরং অনেক সম্মানিত রাজনৈতিক নেতার নামেও মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছেন, তাদের এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাই। এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তারা মানুষের কাছে নিন্দিত হচ্ছেন এবং নিজেদের অরাজনৈতিক ও বিকৃত রুচির পরিচয় তুলে ধরছেন।”
রাজনীতিতে আদর্শবান ব্যক্তিদের আসার পথে এই ধরনের বাধা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “ভদ্র, শিক্ষিত, জ্ঞানী ও আদর্শবান ব্যক্তিদের রাজনীতিতে আসার পথ যদি এ ধরনের মিথ্যাচার, অসত্য তথ্য ও অরুচিকর বক্তব্যের কারণে বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে তা জাতির সামনে রাজনীতিতে একটি সংকট তৈরি করবে। এটি আমাদের দেশ, সভ্যতা ও রাজনীতির জন্য কখনোই কল্যাণকর নয়।”
সুস্থ রাজনীতির চর্চার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “আমি সংশ্লিষ্ট সবাইকে এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাই। সুস্থ রাজনীতির চর্চা করা উচিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এমন একটি প্ল্যাটফর্ম, যেখানে অনেক ক্ষেত্রে সম্পাদকীয় নীতিমালা ও জবাবদিহির ঘাটতি রয়েছে।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অপপ্রচার নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন, “সমাজের সম্মানিত, মর্যাদাবান ও গুণী ব্যক্তিদের নিয়ে এ ধরনের একাধিক অপপ্রচার ও অসত্য তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। যারা এসব লেখেন, তাদের বিবেক কি একবারও বাধা দেয় না? তাদের আচরণে মানবতা ও মনুষ্যত্বের পরিচয় কতটা প্রতিফলিত হয়, সেই প্রশ্নও আজ সামনে আসছে।”
রিকশার মালিকানা দাবির বিষয়ে চূড়ান্ত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে তিনি বলেন, “৭০০-৮০০ রিকশার মালিক যদি আমাকে কেউ বানিয়ে দেন, তাহলে হাসি-রসিকতা ছাড়া আর কী-ই বা করার আছে! আমি তো বলেছি, ৭০০-৮০০টি রিকশা লাগবে না, সারা বাংলাদেশের যেকোনো জায়গায়, যেকোনো শহরে আমার নামে একটি রিকশা আছে, এমন প্রমাণও যদি কেউ দিতে পারেন, তা-ই যথেষ্ট। এত দিন ধরে এত গল্প বলা হচ্ছে, অথচ সরকারের এতগুলো সংস্থা ও বিভিন্ন বিভাগ থাকা সত্ত্বেও আমার নামে একটি রিকশারও সন্ধান দিতে পারলেন না! শুধু গল্পই বলে যাচ্ছেন। এত ভিত্তিহীন গল্প বলতে আপনাদের রুচিতে বাধে না?”
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পারিবারিক শিক্ষা ও মূল্যবোধ নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “আপনাদের পিতা-মাতা ও সন্তানদের কাছে আপনাদের পরিচয় কী হবে? মানুষ যে পরিবেশে বড় হয় এবং পিতা-মাতার কাছ থেকে যে শিক্ষা, ভদ্রতা ও সভ্যতার পাঠ পায়, সেখান থেকেই তার আদর্শবোধ গড়ে ওঠে। তাই এ ধরনের আচরণ দেখে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পারিবারিক শিক্ষা ও মূল্যবোধ নিয়েও সমাজে প্রশ্ন উঠছে।”
সবশেষে তিনি অনুরোধ জানান, “আমি সংশ্লিষ্ট সবাইকে সব ধরনের অপপ্রচার ও অসত্য তথ্য ছড়ানোর এই সর্বনাশা পথ থেকে ফিরে আসার অনুরোধ জানাই।”
দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “দেশবাসীর প্রতি আমার আহ্বান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এ ধরনের বিকৃত ও অসত্য তথ্যের কারণে কেউ যেন বিভ্রান্ত না হন। বরং এ ধরনের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলা উচিত।”
হলুদ সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে জামায়াত নেতা বলেন, “যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সত্য তুলে ধরতে ব্যস্ত, যারা হলুদ সাংবাদিকতা ও অসত্য প্রচারের বিরুদ্ধে সত্যনিষ্ঠ তথ্য দিয়ে সাংবাদিকতাকে সমৃদ্ধ করতে চান, তাদের এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা উচিত।”,