ভারতে নিজস্ব স্যাটেলাইট ইন্টারনেট পরিষেবা স্টারলিংকের যাত্রা বিলম্বিত হওয়ার পেছনে দেশটির প্রভাবশালী কিছু ধনকুবের বা 'অলিগার্কদের' দায়ী করেছেন স্পেসএক্সের মালিক ও প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক। তবে ভারত সরকার এই অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, স্যাটেলাইট সেবার অনুমোদন প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের অন্যায্য আচরণ করা হচ্ছে না।
গত বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) এই মন্তব্য করেন মাস্ক। মূলত ভারতের যেসব প্রত্যন্ত এলাকায় প্রচলিত টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক পৌঁছাতে পারেনি, সেখানে সংযোগ দিতে স্টারলিংকের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে একটি পোস্টের জবাবে তিনি এই প্রতিক্রিয়া জানান। ওই পোস্টে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, গত মে মাস পর্যন্ত ভারতের ১১ হাজার ২৫৬টি গ্রাম ফোর-জি নেটওয়ার্কের আওতার বাইরে ছিল।
এই পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে মাস্ক তার পোস্টে লিখেছেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে কিছু অলিগার্ক আমাদের আটকে দিচ্ছেন, যাতে ভারতীয় জনগণের ওপর তাঁদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে।..তাঁরা কারা, তা আপনারা অনুমান করতে পারেন।’
উল্লেখ্য, ভারতে স্টারলিংক ছাড়াও আরও দুটি প্রতিষ্ঠানের স্যাটেলাইটের মাধ্যমে বৈশ্বিক ব্যক্তিগত মোবাইল যোগাযোগসেবা (জিএমপিসিএস) প্রদানের লাইসেন্স রয়েছে। স্টারলিংকের লাইসেন্স থাকলেও সেবা শুরুর জন্য প্রয়োজনীয় চূড়ান্ত অনুমোদন এখনো মেলেনি। লাইসেন্সপ্রাপ্ত অন্য প্রতিষ্ঠান দুটির মধ্যে একটি হলো ভারতীয় মালিকানাধীন ভরতি গ্রুপ-সমর্থিত ইউটেলস্যাট ওয়ানওয়েব এবং অন্যটি রিলায়েন্স জিও-সমর্থিত জিও স্যাটেলাইট কমিউনিকেশনস।
রিলায়েন্স জিওর মালিক মুকেশ আম্বানি, যিনি ভারতের দ্বিতীয় শীর্ষ ধনী ব্যক্তি। অন্যদিকে ভরতি গ্রুপের মালিক ধনকুবের সুনীল মিত্তাল। জানা গেছে, রিলায়েন্স জিও প্রায় ১ হাজার ৬০০টি লো-আর্থ-অরবিট বা এলইও স্যাটেলাইটের (পৃথিবীর তুলনামূলক নিচু কক্ষপথে থাকা উপগ্রহ) নিজস্ব নেটওয়ার্ক তৈরির পরিকল্পনা করছে, যা সরাসরি স্টারলিংকের স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারে।
ইলন মাস্কের এই অভিযোগের জবাবে ভারতের যোগাযোগ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, লাইসেন্সপ্রাপ্ত তিনটি অপারেটরই বর্তমানে নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের প্রায় একই পর্যায়ে রয়েছে এবং তাদের নিরাপত্তা মূল্যায়ন প্রক্রিয়া চলছে। কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগকে মন্ত্রণালয় ‘ভিত্তিহীন ও ভুল ধারণাপ্রসূত’ বলে অভিহিত করেছে।
ভারতে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরুর জন্য দীর্ঘ চার বছর ধরে অপেক্ষা করছে স্টারলিংক। গত বছরের জুনে প্রতিষ্ঠানটি টেলিযোগাযোগ লাইসেন্স পেলেও নিরাপত্তা ছাড়পত্র এবং স্পেকট্রাম বরাদ্দ বা বেতারতরঙ্গ ব্যবহারের অনুমতি এখনো পায়নি।
গত বুধবার ইন্ডিয়া মোবাইল কংগ্রেসে স্টারলিংকের বিজনেস অপারেশনস বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট লরেন ড্রেয়ার জানান, প্রতিষ্ঠানটি ইতিমধ্যে ২০টি গেটওয়ে সাইট তৈরি করেছে, যা স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ককে স্থলভিত্তিক অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করে। এসব স্থাপনায় শত শত অ্যান্টেনাও বসানো হয়েছে। ড্রেয়ার আরও উল্লেখ করেন, ভারতের নিরাপত্তাসংক্রান্ত শর্তাবলি বিবেচনা করেই স্টারলিংক তাদের কার্যক্রমের নকশা তৈরি করেছে।
গত মাসে নয়াদিল্লি স্যাটেলাইট স্পেকট্রামের মূল মূল্যকাঠামো অনুমোদন করেছে, যেখানে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত এলাকায় সেবার ক্ষেত্রে কম চার্জ রাখার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত অনুমোদন এখনো বাকি।
মজার বিষয় হলো, মাস্ক যখন ভারতে এই প্রতিবন্ধকতার কথা বলছিলেন, ঠিক সেই দিনই প্রতিবেশী বাংলাদেশে স্টারলিংকচালিত স্যাটেলাইট-টু-মোবাইল সেবা চালু হয়। টেলিযোগাযোগ অপারেটর বাংলালিংকের সঙ্গে যৌথভাবে এই সেবা চালু করা হয়েছে, যার ফলে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এই আধুনিক প্রযুক্তির আওতায় এল।