‘রানার ছুটেছে তাই ঝুমঝুম ঘণ্টা বাজছে রাতে, রানার চলেছে খবরের বোঝা হাতে, রানার চলেছে রানার।’ সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতার সেই রানারের কথা মনে করিয়ে দেয় চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার আলী আকবরকে। যদিও তিনি রাতের আঁধারে ছুটে চলেন না, তবে তাঁর যাত্রা এখনো থেমে নেই। গ্রামীণ পথের আঁকাবাঁকা রাস্তায় সাইকেলের ঘণ্টা বাজিয়ে আজও ছুটে চলেন তিনি। সঙ্গে থাকে পাটের ছোট বস্তা এবং সাইকেলের ঝুড়িতে স্তূপ করা মানুষের চিঠি।
আনওয়ারার বারখাইন ইউনিয়নে সবুজ গাছপালার মাঝ দিয়ে চলে গেছে একটি সড়ক। স্থানীয়ভাবে এই রাস্তার কোনো নির্দিষ্ট নাম নেই, তবে হাজারো মানুষের চলাচলের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন খুব ভোরে এই পথ ধরেই সাইকেল চালিয়ে ছুটে চলেন আলী আকবর। বয়স এখন পঞ্চাশের কাছাকাছি, মাথার চুলে পাক ধরেছে। পরনে খাকি পোশাক, যা দেখে দূর থেকেই বোঝা যায় তিনি ডাক বিভাগের একজন কর্মী। প্রায় ২৮ বছর ধরে পাটের বস্তা নিয়ে এক ডাকঘর থেকে অন্য ডাকঘরে চিঠিপত্র পৌঁছে দেওয়া এবং সংগ্রহ করাই তাঁর প্রধান কাজ। স্থানীয়দের কাছে তিনি অত্যন্ত পরিচিত এবং সবাই তাঁকে ‘রানার আকবর’ বলে ডাকেন।
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বাসিন্দা আলী আকবরের ডাক বিভাগের সঙ্গে পথচলা শুরু হয় ১৯৯৯ সালে। সে সময় তিনি ‘মেইল ক্যারিয়ার’ পদে যোগ দেন, তবে স্থানীয়ভাবে এই পদটি ‘রানার’ নামেই বেশি পরিচিত ছিল। এই চাকরির আয়ের মাধ্যমেই তিনি তাঁর পাঁচ ছেলেমেয়ে এবং পুরো পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
আলী আকবরের মূল কাজ হলো দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা চিঠি ও ডাক এক পোস্ট অফিস থেকে সংগ্রহ করে অন্য পোস্ট অফিসে পৌঁছে দেওয়া। আবার সেই পোস্ট অফিসগুলো থেকে অন্য জায়গায় পাঠানোর জন্য আসা চিঠিগুলো সংগ্রহ করে এলাকার বিভিন্ন পোস্ট অফিসে পৌঁছে দেওয়া। প্রতিদিন খুব সকাল থেকেই শুরু হয় তাঁর এই কর্মব্যস্ততা।
গত বৃহস্পতিবার সকালে আনোয়ারা উপজেলা ডাকঘরের সামনে দেখা হয় আলী আকবরের সঙ্গে। তাঁর সারাদিনের কর্মকাণ্ড দেখার জন্য সেখানে যাওয়া হয়েছিল। সামনে চিঠির বস্তা রেখে সাইকেলে উঠছিলেন তিনি। আলাপকালে তিনি জানান, প্রতিটি দিনই তাঁর কর্মব্যস্ততায় কাটে। কার চিঠি বা কিসের চিঠি—সে বিষয়ে তাঁর কোনো ধারণা নেই। তিনি শুধু জানেন, চিঠিগুলো সঠিক ঠিকানায় পৌঁছে দিতে হবে। কারণ, তিনি সময়মতো পৌঁছে না দিলে সংশ্লিষ্ট ডাকঘরের পোস্টম্যান বা ‘ডাকপিয়ন’ সেই চিঠিগুলো মানুষের হাতে পৌঁছে দিতে পারবেন না।
প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে নামাজ পড়েই কাজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েন আলী আকবর। সকাল নয়টার আগেই তাঁকে আনোয়ারা উপজেলা ডাকঘরে পৌঁছাতে হয়। সেখান থেকে চিঠির বস্তা নিয়ে শুরু হয় তাঁর যাত্রা। তাঁর প্রথম গন্তব্য চার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত তৈলার দ্বীপ শাখা ডাকঘর। তৈলার দ্বীপের পথে প্রথমে পড়ে পাকা সড়ক, যা সাইকেলে পাড়ি দিতে তাঁর সময় লাগে ১৫ মিনিট। এরপর গ্রামের মেঠো পথ ধরে প্রায় আধা ঘণ্টা চলার পর তিনি পৌঁছান তৈলার দ্বীপ ডাকঘরে। এখনো মাটির তৈরি একটি ঘরেই পরিচালিত হয় এই ডাকঘরের কার্যক্রম।
এই ডাকঘরের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলেন আকবর। তিনি জানান, অষ্টম শ্রেণির পর আর পড়াশোনা করা হয়নি তাঁর। অভাবের সংসারে খুব দ্রুতই কাজের খোঁজে নামতে হয়েছিল তাঁকে। ১৯৯৯ সালে ডাক বিভাগে যোগ দেওয়ার পর থেকে চিঠিই হয়ে উঠেছে তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী। এক পোস্ট অফিস থেকে অন্য পোস্ট অফিসে চিঠি পৌঁছে দিতে দিতেই কেটে গেছে দুই যুগের বেশি সময়।
আলী আকবর বলেন, “সরকারি বেতন-ভাতা আগের তুলনায় বেড়েছে; কিন্তু চিঠির জন্য মানুষের সেই অপেক্ষা নেই। এখন দাপ্তরিক কাগজপত্র বেশি আসে। তবে সাইকেলে চিঠি বিলি করতে অনেক পরিশ্রম হয়। সময়ও বেশি লাগে। একটি মোটরসাইকেল থাকলে কাজটা আরও সহজ হতো।”
দীর্ঘ এই কর্মজীবনে নিজের সংসারটি ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছেন আলী আকবর। এই চাকরির আয়েই তিনি তাঁর দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন এবং সংসারের যাবতীয় প্রয়োজন মিটিয়েছেন। ছেলেদের পড়াশোনাও চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। বড় ছেলের বয়স এখন ২০ বছর, সে গ্রামে ব্যবসা করছে। মেজ ছেলে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং ছোট ছেলে আগামী বছর মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবে।
কথার মাঝেই আবার সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দেন আলী আকবর। সামনে চিঠির বস্তা নিয়ে তাঁর গন্তব্য তৈলার দ্বীপ শাখা ডাকঘর। সেখানে পৌঁছে শাখা ডাকঘরের পোস্টমাস্টারকে চিঠি বুঝিয়ে দিয়ে তিনি আরেকটি বস্তা গ্রহণ করেন। সেগুলো নিয়ে তিনি পুনরায় রওনা হন উপজেলা ডাকঘরের উদ্দেশ্যে। এভাবে প্রতিদিন বিভিন্ন শাখা ডাকঘর ঘুরে বেলা তিনটার দিকে তিনি উপজেলা ডাকঘরে পৌঁছান। অন্যান্য কাজ শেষ করে বিকেল পাঁচটায় তিনি ঘরে ফেরেন।
আলী আকবর যে বিশাল ব্যবস্থার একটি ক্ষুদ্র অংশ হয়ে প্রতিদিন ছুটে চলেন, সেই ডাকব্যবস্থারই প্রতীকী দিন হিসেবে পালিত হয় ৯ অক্টোবর, বিশ্ব ডাক দিবস। ১৯৬৯ সাল থেকে এই দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। এবারের প্রতিপাদ্য হলো ‘ওয়ান পোস্টাল নেটওয়ার্ক, ইনফিনিট পসিবিলিটিজ’, যার বাংলা অর্থ ‘সমন্বিত ডাক নেটওয়ার্ক, সীমাহীন সম্ভাবনা’।
আলী আকবরের মোটরসাইকেলের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিভাগের ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেল মো. শফিউল আরেফিন বলেন, “ইউনিভার্সাল পোস্টাল ইউনিয়ন (ইউপিইউ) ও ডাক অধিদপ্তরের সমন্বিত উদ্যোগে সারা দেশে ১২০টি বৈদ্যুতিক বাইক দেওয়া হয়েছিল গত বছর শুরুতে। দেশের বিভিন্ন পোস্ট অফিসে এসব বাইক সরবরাহ করা হয়েছে। এ উদ্যোগ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।”