রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক জাওয়াদুল হককে পুনরায় তাঁর দপ্তরের চেয়ারে বসিয়ে দিয়েছেন ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু। গতকাল বৃহস্পতিবার রাত নয়টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী ক্যাম্পাসে গিয়ে তিনি উপাচার্যকে তাঁর দপ্তরে নিয়ে যান এবং সেখানে বসান।
উপাচারের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপ্রীতিকর ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ভূমিমন্ত্রী বলেন, ‘যারা এই দুর্ভাগ্যজনক আচরণ করেছে, তারা দুষ্কৃতকারী। তাদের কোনো দলীয় পরিচয় নেই। তারা সমাজের শত্রু।’
রাজশাহীতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বরদাশত করা হবে না বলে হুঁশিয়ার করেন ভূমিমন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট জানান, এই ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতিমধ্যে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করে আইনের আওতায় আনতে প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। উপাচার্য অধ্যাপক জাওয়াদুল হকের মনোবল বৃদ্ধিতে তাঁকে উদ্দেশ্য করে ভূমিমন্ত্রী বলেন, ‘আপনি সাহস ধরে থাকেন। রাজশাহীকে আমাদের এগিয়ে নিতে হবে।’
উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী কার্যালয়ে উপাচার্য জাওয়াদুল হককে হেনস্তা করে জোরপূর্বক একটি কাগজে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। ওই দিন বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে উপাচার্য জানান, ২০ থেকে ২৫ জনের একটি দল তাঁর কক্ষে ঢুকে তাঁকে একটি কাগজে সই করতে বাধ্য করে। কাগজটিতে কী লেখা ছিল তা তাঁকে পড়তে দেওয়া হয়নি। সই না করলে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হওয়ার আশঙ্কায় তিনি সেখানে স্বাক্ষর করেন। তাঁর ধারণা, ওই কাগজটি ছিল একটি পদত্যাগপত্র।
অভিযোগ রয়েছে যে, ঘটনার সময় উপাচার্যের ব্যক্তিগত সহকারী ও সেকশন অফিসার (অর্থ) মো. নাজমুল হোসাইন বাধা দিতে গেলে তাঁকেও লাঞ্ছিত করা হয়। পরবর্তীতে উপাচার্য ও তাঁর ব্যক্তিগত সহকারীকে কার্যালয় থেকে বের করে দেওয়া হয়। এছাড়া দপ্তরের কম্পিউটারের সিপিইউ, সিসিটিভি ক্যামেরার সরঞ্জাম ও অন্যান্য মালামাল সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি দপ্তরে তালা দেওয়ার অভিযোগও করেন উপাচার্য।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে গত মঙ্গলবার রাতে উপাচার্যের ব্যক্তিগত সহকারী নাজমুল হোসাইন বাদী হয়ে রাজপাড়া থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় অজ্ঞাতনামা ৫০ থেকে ৬০ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় সরকারি কাজে বাধা প্রদান, সরঞ্জাম চুরি ও ভাঙচুরের অভিযোগ আনা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, তারা ভিডিও ও ছবি বিশ্লেষণ করে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার কাজ করছে এবং এ ঘটনায় ইতিমধ্যে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা উপাচার্যকে তাঁর উপশহরের বাসা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী ক্যাম্পাসে নিয়ে আসেন। এরপর বেলা সোয়া ১১টার দিকে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আরিফ হোসেনের উপস্থিতিতে উপাচার্যের দপ্তরের তালা খুলে দেওয়া হয়। রাতে ভূমিমন্ত্রী সেখানে উপস্থিত হয়ে উপাচার্যকে তাঁর দপ্তরের চেয়ারে বসান।
সেখানে উপস্থিত হয়ে ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বিষয়ে আলোচনা করেন। তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের চারটি বড় প্রকল্প অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এর মধ্যে একটি বড় প্রকল্প গতকাল মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে অনুমোদন পেয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
চিকিৎসকদের প্রতি রোগী ও স্বজনদের সদয় আচরণের আহ্বান জানিয়ে ভূমিমন্ত্রী বলেন, একজন চিকিৎসকের পক্ষে সীমিত সময়ে অনেক রোগী দেখা সম্ভব নয়। তাই চিকিৎসকদের ওপর অযথা চাপ সৃষ্টি করা ঠিক নয়। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও হাসপাতাল এলাকায় অধিক পরিমাণে গাছ লাগানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
এ সময় রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শফিকুল হক মিলন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভবিষ্যতে কেউ অপকর্মের চেষ্টা করলে দল-মত বিবেচনা না করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত থাকলেই কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন।
পুনরায় চেয়ারে বসার পর উপাচার্য জাওয়াদুল হক জানান, ঘটনার পরপরই তিনি ভূমিমন্ত্রীসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সচিবসহ সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের বিষয়টি অবহিত করেছিলেন। তাঁরা সবাই তাঁকে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।
অনুষ্ঠানে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন, রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ, রাজশাহী মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ ফয়েজুল কবির, মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক শরিফুল ইসলাম, মহানগর ছাত্রদলের সদস্যসচিব ইমদাদুল হক প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।