বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী নিহত আবরার ফাহাদের পরিবারের সদস্যরা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এই সাক্ষাতের সময় আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ তার সন্তানের হত্যা মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করে রায় কার্যকর করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহযোগিতা কামনা করেন।

পরিবারের সদস্যরা আরও দাবি জানিয়েছেন যে, কুষ্টিয়ায় গড়াই নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণ করা হোক, বুয়েটে আবরারের নামে একটি নতুন হল তৈরি করা হোক এবং পাঠ্যবইয়ে তার জীবন ও ঘটনার কথা অন্তর্ভুক্ত করা হোক।

উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের দ্বারা নৃশংসভাবে আবরার ফাহাদকে হত্যা করা হয়।

গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বিকেলে সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন আবরারের বাবা মো. বরকত উল্লাহ। এই সাক্ষাতে তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন ফাহাদের মা রোকেয়া খাতুন, ছোট ভাই আবরার ফাইয়াজ এবং পরিবারের একজন মামা ও এক চাচা।

সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রী তাদের আশ্বস্ত করে বলেন, “মামলাটি বর্তমানে উচ্চ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। আদালত স্বাধীনভাবে মামলার বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন করবেন। এ ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে তার পরিবারকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।”

সাক্ষাৎ চলাকালীন প্রধানমন্ত্রী আবরার ফাহাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের সার্বিক অবস্থার খোঁজখবর নেন। প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেস সচিব মো. সুজাউদ্দৌলা (সুজন মাহমুদ) এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

আবরার ফাহাদের বাবা মো. বরকত উল্লাহ প্রধানমন্ত্রীকে জানান, ওই এলাকার প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার মানুষ একটি সাঁকো দিয়ে নদী পারাপার করেন। এছাড়া তিনি আবরার ফাহাদের কবর পাকাকরণ এবং পাশের মসজিদটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা চান।

প্রধানমন্ত্রী সেতুটি নির্মাণের বিষয়ে আশ্বাস প্রদান করেন এবং আবরার ফাহাদের নামে সেতুটির নামকরণের প্রতিশ্রুতি দেন। পাশাপাশি তিনি মসজিদটির নির্মাণকাজ অবিলম্বে সম্পন্ন করার নির্দেশনা দেন।

বরকত উল্লাহ আরও অভিযোগ করেন যে, আবরার হত্যা মামলার একজন আসামি কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়ার প্রায় ছয় মাস পর পরিবারকে বিষয়টি জানানো হয়েছিল। তিনি কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া এবং বর্তমানে পলাতক আসামিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।

আর যেন কোনো মায়ের বুক এভাবে খালি না হয়, সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে আবরারের মা রোকেয়া খাতুন বলেন, “প্রত্যেক ক্যাম্পাসের ছেলেমেয়েই আমার মতো কোনো না কোনো মায়ের সন্তান। আমি চাই, কোনো ক্যাম্পাসেই যেন আর আগের মতো পরিবেশ ফিরে না আসে। আমার মতো কোনো মায়ের বুক যেন এভাবে খালি না হয়।”

আবরার ফাহাদের ছোট ভাই আবরার ফাইয়াজ প্রধানমন্ত্রীকে বুয়েট ক্যাম্পাসে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানান। একই সঙ্গে তিনি বুয়েটে আবরার ফাহাদের নামে একটি নতুন হল নির্মাণের দাবি জানান। নতুন প্রজন্মকে আবরার ফাহাদের কথা জানাতে পাঠ্যবইয়ে তার ঘটনা অন্তর্ভুক্তির দাবিও তোলেন আবরার ফাইয়াজ।

এই সব দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে শিক্ষাসচিবের সঙ্গে কথা বলেন।

আবরার ফাইয়াজ আরও বলেন, জুলাই আন্দোলনে নিহতদের তালিকা সরকারের পক্ষ থেকে তৈরি করা হয়েছে। এর আগে আবরার ফাহাদের মতো বিভিন্ন সময়ে যারা নিহত হয়েছেন, তাদেরও একটি তালিকা করা হোক।

এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী জানান, এ-সংক্রান্ত একটি প্রকল্প মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এবং এ নিয়ে কাজ চলছে।

সাক্ষাতের সময় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছিরও উপস্থিত ছিলেন।

স্মরণ করা হয় যে, ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে শেরেবাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। আবরারের বাড়ি কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার কয়া ইউনিয়নের রায়ডাঙ্গা গ্রামে। হত্যাকাণ্ডের আগের দিন ২০১৯ সালের ৫ অক্টোবর ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে আবরার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে স্বাক্ষরিত কয়েকটি চুক্তি ও সমঝোতার সমালোচনা করেন।

পোস্টে তিনি মোংলা বন্দর ব্যবহারের সুযোগ, ফেনী নদীর পানি এবং গ্যাস রপ্তানি নিয়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন।

পরদিন রাতে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা তাকে হলে ডেকে নিয়ে ফেসবুক পোস্টের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং একপর্যায়ে মারধর করেন। পরে তিনি অচেতন হয়ে পড়লে তাকে হলের সিঁড়িতে ফেলে রাখা হয়। ময়নাতদন্তে অতিরিক্ত মারধরের কারণে তার শরীরে গুরুতর আঘাত ও অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের প্রমাণ পাওয়া যায়।

হত্যাকাণ্ডের পর বুয়েটসহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। শিক্ষার্থীরা হত্যাকারীদের শাস্তিসহ ১০ দফা দাবি জানান।

৭ অক্টোবর আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ চকবাজার থানায় ১৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। তদন্ত শেষে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ২৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়।

২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ মামলার রায়ে ২০ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। ২০২৫ সালের ১৬ মার্চ হাইকোর্ট ওই রায় বহাল রাখেন।

পরবর্তী সময়ে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা ৯ আসামি হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আপিল করেন। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত একজন আসামিও লিভ টু আপিল করেন। বর্তমানে মামলাটি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে।