চলতি বছরের ২৩ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ সফর করবেন জাতিসংঘের শিক্ষা অধিকার বিষয়ক বিশেষ র‍্যাপোর্টিয়ার ফরিদা শাহীদ। তার এই রাষ্ট্রীয় সফরে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা প্রদান করবে জাতিসংঘের শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকোর ঢাকা অফিস।

সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর ছড়িয়েছে যে, ২০২৪ সালের আগস্টের পর দেশজুড়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মবের শিকার হওয়া শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অভিযোগ তদন্ত করতে আসছেন তিনি। খবরে আরও দাবি করা হয়, বাংলাদেশে অবস্থানকালে তিনি মবে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং এই ধরনের সহিংস ঘটনায় প্রাণ হারানো শিক্ষকদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলবেন। গণমাধ্যমে এই খবর প্রকাশের পর দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

ফরিদা শাহীদের এই সফরের প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং মবের শিকার শিক্ষকদের বিষয়ে তদন্তের বিষয়টি নিশ্চিত হতে মুক্তকণ্ঠ অনুসন্ধান চালিয়েছে। এই বিষয়ে জানতে ইউনেসকোর ঢাকা অফিসে যোগাযোগ করা হলে সেখানকার কর্মকর্তারা সফরের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট তথ্য দিতে পারেননি। তবে ইউনেস্কো ঢাকা অফিসের সেক্রেটারি টু দ্য হেড শেরিন সুলতানা স্নিগ্ধা ফরিদা শাহীদের সফরের আসল উদ্দেশ্য এবং মবের শিকার শিক্ষকদের তথ্য অনুসন্ধানের বিষয়টি জানতে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ে (ওএইচসিএইচআর) যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।

এরপর মুক্তকণ্ঠের প্রতিবেদক জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ে ই-মেইল পাঠিয়ে ফরিদা শাহীদের বাংলাদেশ সফর এবং মবের শিকার হয়ে চাকরি ছাড়তে বাধ্য হওয়া শিক্ষকদের বিষয়ে তদন্তের বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে জানতে চান।

সেই ই-মেইলের জবাবে ওএইচসিএইচআর-এর ‘সেক্রেটারিয়েট অব দ্য মান্ডেট’ নিশ্চিত করেছে যে, শিক্ষার অধিকার-বিষয়ক বিশেষ র‍্যাপোর্টার ফরিদা শাহীদ সরকারের আমন্ত্রণে ২০২৬ সালের ২৩ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ সফর করবেন। এই সফরে তাকে সহায়তা করবে ঢাকায় অবস্থিত ওএইচসিএইচআর কার্যালয়।

সফরের মূল লক্ষ্য সম্পর্কে জানানো হয়েছে, “এই সফরে বাংলাদেশে সবার জন্য মানসম্মত, সমতাভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আজীবন শিক্ষার অধিকার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ভালো চর্চা এবং চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে আলোচনা করা হবে। সফরকালে বৈষম্যহীনভাবে সবার জন্য মানসম্মত সরকারি শিক্ষার সুযোগ এবং শিক্ষায় অর্থায়নের বিষয়গুলোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে; পাশাপাশি বিভিন্ন অংশীজনের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে উদ্ভূত অন্যান্য বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া হবে।”

আরও জানানো হয়েছে যে, সফরকালে বিশেষ র‍্যাপোর্টিয়ার বাংলাদেশ সরকার এবং স্থানীয় শিক্ষা কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এছাড়া তিনি আন্তর্জাতিক সংস্থা, সুশীল সমাজ, বেসরকারি ও তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠন, শিক্ষাবিদ, শিক্ষক, গবেষক ও অন্যান্য শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট কর্মী এবং শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রতিনিধিদের সাথে গোপনীয় বৈঠক করবেন। তবে মবের শিকার হয়ে চাকরি ছাড়তে বাধ্য হওয়া শিক্ষকদের বিষয়ে ই-মেইলের উত্তরে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।

সেক্রেটারিয়েট অব দ্য মান্ডেট আরও উল্লেখ করেছে যে, সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী সফরের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বিশেষ র‍্যাপোর্টিয়ার তথ্য ও মতামত প্রদানের জন্য একটি উন্মুক্ত আহ্বান জানিয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি আগ্রহী সব অংশীজনকে বৈষম্যহীন সরকারি শিক্ষার সুযোগ এবং শিক্ষায় অর্থায়ন—উভয় ক্ষেত্রেই ভালো চর্চা ও সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ সংক্রান্ত তথ্য ও পরামর্শ গোপনীয়ভাবে জমা দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন।

প্রতিবেদককে জানানো হয়েছে, সফরে প্রাপ্ত সব তথ্য ও মতামত অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে বিবেচনা করা হয় এবং তা প্রকাশ করা হয় না; এমনকি তথ্যের উৎসও গোপন রাখা হয়। এই সংগৃহীত তথ্য ও মতামতগুলো দেশ সফরের প্রস্তুতি এবং মানবাধিকার কাউন্সিলে উপস্থাপনের জন্য প্রতিবেদন তৈরির কাজে ব্যবহৃত হবে।

মুক্তকণ্ঠের প্রতিবেদককে ই-মেইলে আরও জানানো হয়, আগামী ৩ ডিসেম্বর ঢাকায় একটি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই সফর শেষ হবে, যেখানে বিশেষ র‍্যাপোর্টিয়ার তার প্রাথমিক পর্যবেক্ষণগুলো তুলে ধরবেন। পরবর্তীতে ২০২৭ সালের জুনে জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে ফরিদা শাহীদ তার সফরের চূড়ান্ত প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করবেন। এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশে শিক্ষার অধিকার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পক্ষের প্রচেষ্টাকে সহায়তা করার জন্য বিভিন্ন সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত থাকবে বলে জানানো হয়েছে।