মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগরে শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে আয়োজিত একটি প্রস্তুতিমূলক ও আইনশৃঙ্খলা সভায় উপজেলা জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমির নুরুজ্জামান মীরকে মারধর ও লাঞ্ছিত করার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ করা হয়েছে, বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা এই ঘটনার সাথে জড়িত। গতকাল বুধবার বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে মুন্সিগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবদুল্লাহর উপস্থিতিতে এই অপ্রীতিকর ঘটনাটি ঘটে।
ঘটনার সময় সেখানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হাসিবুর রহমান এবং শ্রীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জুয়েল মিয়া উপস্থিত ছিলেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশ নুরুজ্জামান মীরকে সভাকক্ষ থেকে সরিয়ে নিয়ে যায়।
উপজেলার ৮৫টি পূজামণ্ডপের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ উপজেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের নেতাদের উপস্থিতিতে বিকেল পাঁচটার দিকে সভাটি শুরু হয়। সভার একপর্যায়ে উপজেলা জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমির নুরুজ্জামান মীরকে মারধর ও লাঞ্ছিত করা হয় বলে জানা গেছে।
এই ঘটনার একটি ভিডিও মুক্তকণ্ঠের হাতে এসেছে। ভিডিওতে দেখা যায়, নুরুজ্জামান মীর মাইক্রোফোন হাতে বক্তব্য প্রদান করছেন। সেই মুহূর্তে মঞ্চে এবং মঞ্চের পাশে অবস্থানরত বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের কয়েকজন নেতা-কর্মী উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। একপর্যায়ে পাশ থেকে এক ব্যক্তি নুরুজ্জামান মীরের হাত থেকে মাইক্রোফোনটি কেড়ে নেন। এরপর কালো শার্ট পরিহিত এক ব্যক্তি পেছন থেকে নুরুজ্জামান মীরকে ঘুষি মারেন। এই ঘটনায় মঞ্চে ব্যাপক হট্টগোল শুরু হয়। পরবর্তীতে পুলিশের এক কর্মকর্তা নুরুজ্জামান মীরকে আগলে ধরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন এবং ইউএনও হাসিবুর রহমান উত্তেজিত লোকজনকে শান্ত করার চেষ্টা করেন।
এ বিষয়ে শ্রীনগর থানার ওসি জুয়েল মিয়া আজ বৃহস্পতিবার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “ভুল-বোঝাবুঝির কারণে কিছুটা বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়েছিল। পরে পরিস্থিতি ঠিক হয়ে যায়। সবার মধ্যে বিষয়টি মীমাংসা করা হয়েছে। এ বিষয়ে কেউ কোনো অভিযোগ করেনি।”
তবে ঘটনার কোনো মীমাংসা হয়নি বলে দাবি করেছেন জামায়াত নেতা নুরুজ্জামান মীর। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “আমাদের পরিচয় জেনেই অনুষ্ঠানে ইউএনও দাওয়াত করেছিলেন। মঞ্চেও বসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তবে সময়স্বল্পতার কারণে প্রথমে বক্তব্য দিতে চাইলে বক্তব্য দিতে দেওয়া হয়নি। বিএনপির নেতারা আমাকে না চেনার বাহানা করে হলরুম থেকে অপমান করে বের করে দেন। বাইরে নিয়ে আমাকে পেছন থেকে কিল-ঘুষি দেওয়া হয়।”
নুরুজ্জামান মীর আরও বলেন, “ইউএনও সাহেব আমাকে ডেকে এনে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেন। তখন বিএনপি নেতা হাফিজুল ইসলাম খানের বক্তব্যের নিন্দা জানাতেই সংসদ সদস্যের সামনে তাঁর লোকজন আবার ঘুষি ও ধাক্কা দেন। দলীয় নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা পরবর্তী ব্যবস্থা নেব।”
এই ঘটনার বিষয়ে জানতে সংসদ সদস্য মো. আবদুল্লাহর মুঠোফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, সভায় হাফিজুল ইসলাম খান তাঁর বক্তব্যে বলেন, “সংসদের ভেতরে ও বাইরে কিছু দল বিএনপিকে ব্যর্থ দেখতে চায়। একদল ডিসেম্বরের কথা বলছে, আরেক দল জাতীয় সংসদে বিএনপির পাশে থেকেও সরকারকে ব্যর্থ করতে চায়। সব মিলিয়ে চারদিক থেকে সরকারকে ব্যর্থ করার চেষ্টা চলছে। আসন্ন দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে কেউ যাতে দেশকে অস্থিতিশীল করতে না পারে, সে জন্য বিএনপি অতন্দ্রপ্রহরীর মতো সজাগ আছে।”
এরপর সংসদ সদস্য মো. আবদুল্লাহকে বক্তব্য দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হলে পেছন থেকে নুরুজ্জামান মীর বক্তব্য দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। এই সময়ে বিএনপির কয়েকজন নেতা-কর্মী তাঁকে চিনতে না পারার কথা বলে ধাক্কা দিয়ে হলরুম থেকে বের করে দেন। পরবর্তীতে ইউএনও ও অন্যান্যরা তাঁকে পুনরায় হলরুমে ডেকে এনে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেন।
নুরুজ্জামান মীর মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে হাফিজুল ইসলাম খানের বক্তব্যের ওই অংশের প্রতিবাদ করেন। এ সময় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের কয়েকজন নেতা-কর্মী তাঁকে আওয়ামী লীগের দোসর বলে আখ্যা দেন। একপর্যায়ে তাঁর হাত থেকে মাইক্রোফোনটি কেড়ে নেওয়া হয়।
উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাফিজুল ইসলাম খান বলেন, “আমরা তাঁকে (নুরুজ্জামান মীর) এর আগে কেউ দেখিনি। তাঁকে চিনিও না। তাঁর বক্তব্য দেওয়ার থাকলে আমার বক্তব্যের পরপরই তিনি বক্তব্য দিতে পারতেন। যখন আমাদের সংসদ সদস্য বক্তব্য দিতে আসেন, তখন তিনি বক্তব্য দিতে চান। যা কোনো শিষ্টাচারের মধ্যে পড়ে না।”
মারধর ও হেনস্তার বিষয়ে হাফিজুল ইসলাম খান বলেন, “জামায়াতের ওই নেতাকে ধাক্কা দিয়ে স্টেজ (মঞ্চ) থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। মারধরের বিষয়টি আমার জানা নেই। সেখানে হিন্দু নেতৃবৃন্দ ও আমাদের নেতা-কর্মীরা ছিলেন। কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে, সেটি স্পষ্ট করে বলতে পারছি না।”