চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি এক আকস্মিক অভিযানে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করে। এই ভয়াবহ হামলায় বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। বিশেষ করে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মার্কিন মিসাইল আঘাত হানার ফলে ১৫০ জন নিরপরাধ মানুষ মারা যান, যাদের অধিকাংশ ছিলেনই শিশু। এই নৃশংসতার প্রতিক্রিয়ায় ইরান মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালায়। পাশাপাশি তারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ বন্ধ করে দেয়।

ইরানের ওপর পরিচালিত এই একতরফা আক্রমণটি আইনগতভাবে বৈধ ছিল না এবং এর ফলে পুরো মধ্যপ্রাচ্য এক চরম অস্থিরতার মুখে পড়ে। যেসব আরব দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ছিল, তারা ইরানের পাল্টা আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। এর প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ায় উপসাগরীয় দেশগুলোর আন্তর্জাতিক সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

পরবর্তীতে ৭ এপ্রিল নিউইয়র্ক টাইমস–এর একটি প্রতিবেদনে এই তথ্য সামনে আসে যে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুই মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানে হামলা চালানোর জন্য প্ররোচিত করেছিলেন। এই ঘটনাটি দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত সহজেই একটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে। একটি পারমাণবিক পরাশক্তি হিসেবে যুদ্ধ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের আরও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন ছিল।

দ্বিতীয়ত, ভেনেজুয়েলায় সাম্প্রতিক সাফল্যের কারণে ট্রাম্প প্রশাসন চরম আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছিল। তারা মনে করেছিল যে কেবল সামরিক শক্তির মাধ্যমেই সব জয় করা সম্ভব। কিন্তু ইরানের বাস্তব পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমেরিকানরা যখন উপলব্ধি করল যে তেলের খনি ছাড়া ভেনেজুয়েলা ও ইরানের মধ্যে আর কোনো মিল নেই, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। এই যুদ্ধ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমেরিকার ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করেছে। চীন ও রাশিয়ার পাশাপাশি এখন ইরানও আমেরিকার এক বড় প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর। ২০১৯ সালে তাদের তেলের স্থাপনায় হামলার পর আমেরিকা নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় আস্থায় ফাটল ধরেছিল। বর্তমানে এসব দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো সুরক্ষার বদলে নতুন ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে আমেরিকার ওপর তারা আর ভরসা রাখতে পারছে না।

ইরানকে এখন অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সামনে এগোতে হবে। সাময়িক কোনো সাফল্যকে তারা যেন চূড়ান্ত জয় বলে ভুল না করে। শক্তির দম্ভে চরমপন্থী নীতি আঁকড়ে ধরলে তা ইরানের জন্যই দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি বয়ে আনবে। বরং এই অর্জনকে কাজে লাগিয়ে বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল গ্রহণ করা উচিত। বর্তমানে দুটি বিষয়ের ওপর বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন: প্রথমত, ইরানের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও সাধারণ জনগণের কল্যাণ এবং দ্বিতীয়ত, আঞ্চলিক শান্তি ও পারস্পরিক সহযোগিতা।

উপসাগরীয় দেশগুলো এখন আমেরিকার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে চীনসহ অন্যান্য দেশের সাথে সামরিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ করবে। এটি এই অঞ্চলে আমেরিকার প্রভাব আরও কমিয়ে দেবে, যার সবচেয়ে বড় সুবিধা পাবে চীন। উল্লেখ্য, চীন ২০২৩ সালের আগেই ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে মধ্যস্থতা করে এই সুযোগ তৈরি করে নিয়েছে।

অন্যদিকে, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখেও ইরান প্রমাণ করেছে যে তারা মার্কিন ও ইসরায়েলি আক্রমণের জোরালো জবাব দিতে সক্ষম। পশ্চিমা বিশ্ব যা আশা করেছিল (সরকার পতন বা গৃহযুদ্ধ), তার কিছুই ঘটেনি। বরং বহিঃশক্তির আক্রমণের মুখে ইরানের সাধারণ মানুষ আরও বেশি ঐক্যবদ্ধ হয়েছে।

তবে ইরানকে এখন খুব সাবধানে এগোতে হবে। সাময়িক কোনো সাফল্যকে তারা যেন বড় জয় বলে ভুল না করে। শক্তির অহংকারে চরমপন্থী নীতি আঁকড়ে ধরলে তা ইরানের জন্যই ক্ষতি ডেকে আনবে। বরং এই অর্জনকে কাজে লাগিয়ে বুদ্ধিমান কৌশল নেওয়া উচিত। এখন দুটি বিষয়ে নজর দেওয়া দরকার: প্রথমত, ইরানের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও জনগণের কল্যাণ এবং দ্বিতীয়ত, আঞ্চলিক শান্তি ও সহযোগিতা।

যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার ক্ষমতা ইরানের থাকলেও তাদের ভেবে দেখতে হবে এর মূল্য কতটা চড়া। জনগণের সুরক্ষা ও সুদিন ফেরানোই যেকোনো সরকারের প্রধান কাজ হওয়া উচিত। উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টিতেও নজর দেওয়া দরকার। ইসরায়েল চেয়েছিল সৌদি আরব যেন আমেরিকার সঙ্গে মিলে ইরানের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, কিন্তু সৌদি আরব বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে তা এড়িয়ে গেছে। ইরানের উচিত বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখা।

মুসলিম দেশগুলোর সম্পর্ক উন্নত হলে তা ফিলিস্তিন সংকটের সমাধানেও কাজে দেবে। এ বিষয়ে ইরানকেও নিজের অতীত ভূমিকার মূল্যায়ন করতে হবে। কেবল উগ্র বক্তব্য দিয়ে ফিলিস্তিনের কোনো লাভ হয়নি, বরং তা ইসরায়েলকে আমেরিকার সামরিক সহায়তায় যা খুশি করার অজুহাত এনে দিয়েছে।

তাই ইরানকে তাদের একগুঁয়ে অবস্থান থেকে সরে আসতে হবে। কোনো ধরনের আত্মসমর্পণ ছাড়াই কেবল সঠিক কূটনৈতিক পথে হেঁটে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা তোলা ও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসা সম্ভব। তবে সময় খুবই সীমিত। নভেম্বরে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন পার হয়ে গেলে ট্রাম্প প্রশাসন সমঝোতার তাগিদ হারিয়ে ফেলতে পারে।

— আবদুল্লাহ গুল, তুরস্কের সাবেক প্রেসিডেন্ট। (প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে অনূদিত)