সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় থানা পর্যায়ে মেধাতালিকায় দ্বিতীয় হয়েও নিয়োগপত্র পাননি ক্লীন্টন সাহা। নদীভাঙনের কারণে বসতভিটা বিলীন হয়ে যাওয়ায় স্থায়ী ঠিকানার জটিলতায় তাঁর এই নিয়োগ আটকে গেছে।

চট্টগ্রাম নগরের চৌমুহনী এলাকার বাসিন্দা ক্লীন্টন সাহা আক্ষেপ করে বলেন, “আমি বাংলাদেশের নাগরিক। আমার জাতীয় পরিচয়পত্র আছে। শুধু স্থায়ী ঠিকানা না থাকার কারণে আমি চাকরিটা পাইনি। অথচ মেধাতালিকায় আমি দ্বিতীয় হয়েছি। মেধার বিষয়টি বিবেচনা না করে শুধু স্থায়ী ঠিকানা না থাকায় নিয়োগপত্র দেওয়া হয়নি। মানবিক দিক বিবেচনা করে চাকরিটা দেওয়ার জন্য আবেদন করেছি। কিন্তু কর্তৃপক্ষ আমার আবেদন গ্রহণ করেনি।”

জানা গেছে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগের লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি থানাভিত্তিক মেধাক্রমে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছিলেন। নিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় সুপারিশও তাঁর অনুকূলে ছিল। তবে চূড়ান্ত যাচাই-বাছাইয়ের পর্যায়ে স্থায়ী ঠিকানার প্রমাণ দিতে না পারায় তাঁর নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি।

ক্লীন্টন সাহার পারিবারিক ইতিহাস অত্যন্ত করুণ। তিনি জানান, তাঁদের পরিবার দীর্ঘকাল ধরে নদীভাঙন ও বাস্তুচ্যুতির শিকার। প্রায় সাতবার নদীভাঙনের ফলে তাঁদের ঘরবাড়ি ও দোকানপাট বিলীন হয়ে গেছে। পরবর্তীতে তাঁদের যে বাড়িটি অবশিষ্ট ছিল, সেটিও অনেক আগে বিক্রি করে দেওয়া হয়। ফলে গত ২১ বছর ধরে তাঁরা শহরে ভাড়া বাসায় বসবাস করছেন এবং বর্তমানে তাঁদের নিজস্ব কোনো স্থায়ী বসতভিটা নেই।

গত মঙ্গলবার চট্টগ্রাম জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ে ক্লীন্টন সাহা একটি আবেদন জমা দিতে যান। তবে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সেদিন কার্যালয়ে উপস্থিত না থাকায় তাঁর আবেদনটি গ্রহণ করা হয়নি। মুঠোফোনে তিনি জানান, কার্যালয়ের অন্য একজন কর্মকর্তাকে আবেদনপত্রটি গ্রহণ করার অনুরোধ জানালেও তিনি তা নিতে রাজি হননি।

চট্টগ্রাম জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ মাসে ডবলমুরিং শিক্ষা থানার নিয়োগ তালিকায় ১২ জনের নাম ছিল। সেই তালিকায় ১০ নম্বরে ক্লীন্টনের নাম থাকলেও মেধাতালিকার ঘরে তাঁর অবস্থান ছিল ‘২’। প্রথম দফায় পাঁচজনকে নিয়োগপত্র দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে সেপ্টেম্বরে আরও ছয়জন নিয়োগ পান। তবে কেবল ক্লীন্টন সাহাকেই নিয়োগপত্র দেওয়া হয়নি।

ক্লীন্টন সাহার আদি নিবাস নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলায়। সেখানে তাঁর বাবার ব্যবসা ও দোকান ছিল এবং তাঁদের স্থায়ী ঠিকানাও ছিল সেখানেই। তবে ২০০৫ সালে তিনি যখন খুব ছোট ছিলেন, তখনই নদীভাঙনের কারণে তাঁদের চট্টগ্রামে চলে আসতে হয়। তাঁদের বাড়ি মোট সাতবার নদীতে ভেঙে যায়। চট্টগ্রামে আসার পর তাঁর বাবা সবজি ও ফলমূলের খুচরা ব্যবসা শুরু করে সংসার চালান।

পারিবারিক পরিস্থিতি বর্ণনা করে ক্লীন্টন বলেন, তিন বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার ছোট। বড় দুই বোনের বিয়ে হয়ে গেছে এবং ছোট বোন উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে মা-বাবা, এক বোন ও তিনি একই পরিবারের সদস্য হিসেবে বসবাস করছেন। বাবার বয়স বৃদ্ধি এবং অসুস্থতার কারণে পরিবারের আর্থিক খাতের বড় অংশই তাঁকে বহন করতে হয়। নিজের পড়াশোনার খরচ তিনি টিউশনি করেই চালিয়েছেন।

২০০৫ সালে চট্টগ্রামে আসার পর ক্লীন্টন সাহার পরিবার নগরের ডবলমুরিং থানার মোগলটুলী এলাকায় বাসা ভাড়া নেয় এবং সেখানেই তাঁর বেড়ে ওঠা। ২০১৪ সালে পাঠানটুলী সিটি করপোরেশন বালক উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং দেওয়ানহাট সিটি করপোরেশন কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন তিনি। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

যাচাই প্রক্রিয়ার অভিজ্ঞতা জানিয়ে ক্লীন্টন সাহা বলেন, “যাচাইয়ের সময় আমি জানিয়েছিলাম, আমাদের আগে বাড়ি ছিল। নদীভাঙনে সেই বাড়ি বিলীন হয়ে গেছে। জমির যেসব দলিল ছিল, সেগুলোও দেখিয়েছি। পরে সন্দ্বীপে আমার নানার বাড়ির ঠিকানা দিয়েছি। কিন্তু পরের দফার যাচাইয়েও স্থায়ী ঠিকানা জানতে চাওয়া হয়। তখনো আমি একই বিষয় জানিয়েছি। এরপরও আমার চাকরি হয়নি।”

এই ঘটনায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়া ক্লীন্টন জানান, এখন আর চাকরির পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার আগ্রহ তাঁর নেই। তিনি বলেন, “কোনো চাকরির পরীক্ষা দিতে এখন ভয় লাগে। মনে হয়, লিখিত পরীক্ষায় পাস করলেও মৌখিক পরীক্ষার সময় স্থায়ী ঠিকানা জানতে চাইলে আমি কী বলব? এ কারণে কোনো পরীক্ষায় আগ্রহ পাই না। বর্তমানে আমি মানসিকভাবে খুবই ভেঙে পড়েছি।”

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগে ৫৫১ জনের একটি তালিকা করা হয়েছিল। সেখান থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা না দেওয়ায় ২৪ জনকে বাদ দেওয়া হয়। বাকি ৫২৭ জনের মধ্যে ৫২৫ জনকে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছে। তবে বাকি দুজনের নিয়োগপত্র কেন দেওয়া সম্ভব হয়নি, সে বিষয়ে শিক্ষা দপ্তর বিস্তারিত কিছু জানায়নি। এই দুজনের একজন হলেন ক্লীন্টন সাহা।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফিরোজ আহাম্মদ এ বিষয়ে বলেন, “কারণ বলার এখতিয়ার আমাদের নেই। বিষয়টি গোপনীয়। আমাদের যেভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, সেভাবেই নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছে। ২৪ জন কাগজপত্র জমা দেননি। আর দুজনের নিয়োগপত্র জারি হয়নি। এর বাইরে আসলে আর কিছু বলার নেই।”

তবে কার্যালয়ের অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এবং স্থায়ী ঠিকানার জটিলতার কারণে কেউ কেউ বাদ পড়েছেন। ক্লীন্টন সাহার ক্ষেত্রেও স্থায়ী ঠিকানার জটিলতা একটি প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করেছে, যদিও সুনির্দিষ্ট কারণ প্রকাশ করা হয়নি।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ ও পদায়নের প্রক্রিয়ায় জেলা পদায়ন কমিটির প্রধান হিসেবে থাকেন জেলা প্রশাসক। এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানান, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এ ধরনের কোনো আবেদন এখনো জমা পড়েনি। তবে আবেদন করা হলে তা যথাযথ প্রক্রিয়ায় মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।