রাজকীয় বলরুমের আভিজাত্য, ঝলমলে পোশাকের বাহার, মুখোশের আড়ালে গোপন প্রেম, সামাজিক শ্রেণিবিভাজন আর সম্পর্কের জটিল টানাপোড়েন—সব মিলিয়ে ‘ব্রিজারটন’ যেন এক অনন্য জগৎ। যেখানে ইতিহাসের সাথে কল্পনার এক চমৎকার মিশেলে গড়ে উঠেছে এক রোমান্টিক সাম্রাজ্য। ২০২০ সালে যাত্রা শুরুর পর থেকেই নেটফ্লিক্সের এই সিরিজটি দর্শকদের মাঝে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আর চতুর্থ মৌসুমে এসে সেই জনপ্রিয়তা এক বিশাল আকার নিয়েছে।
নেটফ্লিক্সের ২০২৬ সালের প্রথমার্ধের দর্শকসংখ্যার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যবর্তী সময়ে ‘ব্রিজারটন’–এর চতুর্থ মৌসুমটি ১০ কোটি বার দেখা হয়েছে। এই ব্যাপক জনপ্রিয়তার প্রভাবে আগের মৌসুমগুলোর দর্শকসংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রথম ছয় মাসে পুরো ‘ব্রিজারটন’ ফ্র্যাঞ্চাইজি—যার মধ্যে চার মৌসুম এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কনটেন্ট অন্তর্ভুক্ত—সব মিলিয়ে মোট ১৮ কোটি ভিউ পেয়েছে। নেটফ্লিক্সের ভাষ্যমতে, চতুর্থ মৌসুমটি ফেরার পর আগের মৌসুমগুলোর সম্মিলিত দর্শকসংখ্যা ২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেড়েছে।
তাহলে চতুর্থ মৌসুমে বিশেষ কী আছে? দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পরও কেন ‘ব্রিজারটন’ দর্শকদের ধরে রাখতে পারছে? আর জনপ্রিয়তার পাশাপাশি কেন এই মৌসুমটি নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে?
মুখোশের আড়ালে যে প্রেম
‘ব্রিজারটন’–এর চতুর্থ মৌসুমের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন পরিবারের দ্বিতীয় ছেলে বেনেডিক্ট ব্রিজারটন। এই চরিত্রটি শুরু থেকেই পরিবারের অন্য সদস্যদের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন। বিয়ে, সংসার কিংবা প্রচলিত সামাজিক নিয়মকানুনের প্রতি তার খুব একটা আগ্রহ নেই। স্বাধীনচেতা, কিছুটা খামখেয়ালি এবং শিল্পমনস্ক বেনেডিক্ট বরং নিজের মতো করে জীবন কাটাতে পছন্দ করেন।
তবে একটি মুখোশধারী নারীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর তার জীবন বদলে যেতে শুরু করে। বেনেডিক্টের দেখা হয় এক রহস্যময় নারীর সঙ্গে। রুপালি পোশাক পরিহিত সেই নারীকে তিনি কেবল ‘লেডি ইন সিলভার’ হিসেবেই চেনেন। নারীটি হঠাৎ করে তার জীবনে এসে আবার রহস্যজনকভাবে অদৃশ্য হয়ে যান। এরপর থেকেই বেনেডিক্ট তাকে খুঁজতে শুরু করেন।
তবে দর্শকরা জানেন, সেই রহস্যময় নারীটি আসলে সোফি বেক—এমন এক তরুণী, যার সামাজিক অবস্থান বেনেডিক্টের সম্পূর্ণ বিপরীত। একসময় সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান হলেও সৎমায়ের নিষ্ঠুরতার কারণে সোফি পরিণত হয়েছেন একজন গৃহকর্মীতে। তার জীবন কেটেছে অবহেলা, অপমান এবং বেঁচে থাকার কঠিন লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে।
ফলে বেনেডিক্টের কাছে সোফি একজন রহস্যময় নারী হলেও দর্শকদের কাছে শুরু থেকেই স্পষ্ট যে, লেডি ইন সিলভার আর সোফি একই ব্যক্তি। এই ‘জানলেও না জানা’ পরিস্থিতিটিই গল্পের ভেতরে এক টানটান উত্তেজনা তৈরি করে।
সোফির চরিত্রে অভিনয় করেছেন অস্ট্রেলীয় অভিনেত্রী ইয়েরিন হা এবং বেনেডিক্টের চরিত্রে ফিরেছেন লুক থম্পসন। চতুর্থ মৌসুমের মূল কাহিনী নেওয়া হয়েছে জুলিয়া কুইনের ‘ব্রিজারটন’ উপন্যাসমালার তৃতীয় বই ‘অ্যান অফার ফ্রম আ জেন্টলম্যান’ থেকে।
ধনী ছেলে, গরিব মেয়ে—তবে শুধু ‘সিন্ডারেলা’ নয়
গল্পের কাঠামো বিশ্লেষণ করলে ‘ব্রিজারটন’–এর চতুর্থ মৌসুমকে সোজাসাপটা ‘সিন্ডারেলা’র একটি আধুনিক সংস্করণ মনে হতে পারে। সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলে, নির্যাতিত তরুণী, মুখোশের আড়ালে পরিচয়, নিষিদ্ধ প্রেম এবং শেষ পর্যন্ত সুখের সমাপ্তি—সবই এখানে বিদ্যমান। তবে সিরিজটি সোফিকে কেবল একজন অসহায় তরুণী হিসেবে উপস্থাপন করেনি। নির্মাতারা চরিত্রটিকে নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের ক্ষমতা দিয়েছেন। সোফি পরিস্থিতির শিকার হলেও কেবল ভাগ্যের অপেক্ষায় থাকেননি; বরং নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে চেয়েছেন। শোরানার জেস ব্রাউনেলও জানিয়েছেন, বইয়ের তুলনায় সিরিজে সোফির নিজের অবস্থান তৈরি করার ক্ষমতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এখানেই চতুর্থ মৌসুমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি লক্ষ্য করা যায়। জুলিয়া কুইনের বই থেকে মূল প্রেমের কাহিনী নেওয়া হলেও নেটফ্লিক্সের সিরিজটি চরিত্রগুলোর পটভূমি, পার্শ্বকাহিনি এবং সম্পর্কের ধরন বদলে দিয়েছে।
প্রেমের পাশাপাশি শ্রেণিবিভাজন
‘ব্রিজারটন’ বরাবরই প্রেমের গল্পের সাথে সামাজিক শ্রেণিবিভাজনের বিষয়টি ফুটিয়ে তুলেছে। চতুর্থ মৌসুমে তা আরও স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
বেনেডিক্ট সমাজের উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান। তার কাছে প্রেমের স্বাধীনতা থাকলেও সোফির কাছে প্রেম মানেই এক বিরাট ঝুঁকি। কারণ, তাদের সম্পর্ক কেবল দুজন মানুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়—এর সাথে জড়িয়ে আছে ‘টন’–এর কঠোর সামাজিক নিয়ম।
একদিকে ক্ষমতা, অর্থ ও পরিচয়ের সুবিধা নিয়ে বেড়ে ওঠা বেনেডিক্ট; অন্যদিকে নিজের পরিচয় ও মর্যাদা টিকিয়ে রাখতে লড়াই করা সোফি। ফলে দুজনের প্রেম যত সামনের দিকে এগোয়, ততই প্রকট হয়ে ওঠে শ্রেণিগত বাধা।
ঠিক এই জায়গাতেই চতুর্থ মৌসুমের একটি আলোচিত মুহূর্ত তৈরি হয়। সোফির প্রতি প্রবল আকর্ষণ থাকা সত্ত্বেও বেনেডিক্ট তাকে বিয়ের প্রস্তাব না দিয়ে নিজের ‘মিস্ট্রেস’ হওয়ার প্রস্তাব দেন। বইটির পাঠকরা এই মুহূর্তের সাথে পরিচিত থাকলেও সিরিজের দর্শকদের একটি অংশ এতে ক্ষুব্ধ হয়েছেন। অনেকের প্রশ্ন ছিল—এত গভীর প্রেমের দাবি করার পর বেনেডিক্ট কীভাবে সোফিকে এমন প্রস্তাব দিতে পারেন?
তবে গল্পের ভেতরে এই প্রস্তাবই শেষ কথা নয়। বরং বেনেডিক্টের সামাজিক অবস্থান, তার মানসিকতা এবং সোফির অতীত—সবকিছুর সংঘাতকে সামনে আনে এই ঘটনাটি।
কেন এত জনপ্রিয় ‘ব্রিজারটন’
‘ব্রিজারটন’ জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে কোনো একক কারণ নেই। বরং একাধিক উপাদানের সমন্বয়ে সিরিজটি বিশ্বজুড়ে দর্শকদের জন্য একটি আকর্ষণীয় প্যাকেজ হয়ে উঠেছে।
প্রথমত, এর প্রেমের গল্প। রাজকীয় বা ঐতিহাসিক পটভূমি থাকলেও সিরিজটির মূল আবেদন অত্যন্ত পরিচিত—ভালোবাসা, আকর্ষণ, প্রত্যাখ্যান, ঈর্ষা, সামাজিক বাধা এবং শেষ পর্যন্ত সম্পর্কের পরিণতি।
দ্বিতীয়ত, এর চোখধাঁধানো নির্মাণশৈলী। বিশাল প্রাসাদ, বাগান, বলরুম, রঙিন পোশাক, গয়না এবং সাজসজ্জা—প্রতিটি দৃশ্যকে উৎসবের মতো করে তোলা হয়েছে। বিশেষ করে চতুর্থ মৌসুমের মুখোশ বল দর্শকদের মাঝে আলাদা আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নেটফ্লিক্সের তথ্য অনুযায়ী, মৌসুমটি মুক্তির পর বিশ্বের ৯২টি দেশের টপ ১০ তালিকায় জায়গা করে নেয় এবং বৈশ্বিক ইংরেজি টিভি তালিকায় শীর্ষে অবস্থান করে।
তৃতীয়ত, আধুনিক সংগীতের নতুন রূপ। ‘ব্রিজারটন’–এর অন্যতম পরিচিত কৌশল হলো সমসাময়িক পপ গানকে স্ট্রিং বা ক্লাসিক্যাল সংগীতের আবহে নতুন করে উপস্থাপন করা। চতুর্থ মৌসুম মুক্তির পর সিরিজটির অফিশিয়াল প্লেলিস্টের দৈনিক গড় স্ট্রিম বিশ্বজুড়ে ২৭১ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।
চতুর্থত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব। সিরিজটি শুধু দেখা হয় না, এর পোশাক, গান, সংলাপ, প্রেমের দৃশ্য এবং চরিত্রগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার প্রধান বিষয়ে পরিণত হয়। নেটফ্লিক্স জানিয়েছে, চতুর্থ মৌসুম মুক্তির প্রথম ৩১ দিনে এর প্রচারণা ঘিরে নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ৬৮০ কোটি ইমপ্রেশন তৈরি হয়েছিল।
শুধু পর্দায় নয়, বাস্তবেও ‘ব্রিজারটন’–এর বল
চতুর্থ মৌসুমের জনপ্রিয়তা বোঝার আরেকটি চমকপ্রদ দিক হলো—সিরিজের জগৎ পর্দার বাইরে বাস্তব জীবনেও ছড়িয়ে পড়েছে।
নেটফ্লিক্সের উদ্যোগে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ‘ব্রিজারটন’–থিমের বল, মুখোশ উৎসব এবং ভক্তদের জন্য নানা আয়োজন করা হয়। আর্জেন্টিনা, চিলি, ইতালি ও রোমানিয়াসহ বিভিন্ন দেশে আয়োজিত এসব অনুষ্ঠানে অন্তত আটটি বাগ্দানের ঘটনাও ঘটেছে। ভেনিসের একটি বড় আয়োজনেই ২০ হাজারের বেশি মানুষ অংশ নেন। সব মিলিয়ে বিশ্বের ২০টির বেশি শহরের ফ্যান ইভেন্টে অংশ নেন ৫০ হাজারের বেশি মানুষ। অর্থাৎ ‘ব্রিজারটন’ এখন কেবল একটি সিরিজ নয়; এটি পোশাক, সংগীত, পার্টি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং প্রেমের কল্পনাকে ঘিরে তৈরি একটি সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।
যৌনতা, আকর্ষণ ও ‘ব্রিজারটন’–এর পুরোনো পরিচয়
প্রথম মৌসুম থেকেই যৌনতা ‘ব্রিজারটন’–এর একটি আলোচিত উপাদান। চতুর্থ মৌসুমেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি।
বেনেডিক্ট ও সোফির সম্পর্ক ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠ হওয়ার সাথে সাথে আসে একাধিক অন্তরঙ্গ দৃশ্য। এর মধ্যে বাথটাবের দৃশ্যটি বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। তবে নির্মাতারা এটিকে কেবল যৌন দৃশ্য হিসেবে দেখেননি। নেটফ্লিক্সের ব্যাখ্যায়, সেখানে সোফির দীর্ঘদিনের কষ্টের বিপরীতে যত্ন ও নিরাপত্তার একটি মুহূর্ত তৈরি করা হয়েছে। বেনেডিক্ট প্রথমবারের মতো তাকে নিজের মতো করে যত্ন করার সুযোগ পান।
বিতর্কও কম হয়নি
বিপুল জনপ্রিয়তার পাশাপাশি চতুর্থ মৌসুম নিয়ে বিতর্কও দানা বেঁধেছে। সবচেয়ে বড় বিতর্কের একটি হলো মূল বই থেকে কাহিনী পরিবর্তন। ‘ব্রিজারটন’ শুরু থেকেই জুলিয়া কুইনের বইকে ভিত্তি করলেও নেটফ্লিক্সের সংস্করণে চরিত্র ও গল্পে নানা পরিবর্তন এসেছে। চতুর্থ মৌসুমেও বইয়ের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বদলে দেওয়া হয়েছে। সোফির সাথে বেনেডিক্টের সম্পর্ক, আরমিন্টার সাথে সংঘাত এবং সোফির নিজের ভাগ্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে সিরিজটি বইয়ের তুলনায় ভিন্ন পথে হেঁটেছে।
বইপ্রেমীদের একটি অংশ এসব পরিবর্তন নিয়ে অসন্তুষ্ট। তবে নির্মাতাদের যুক্তি হলো, টেলিভিশনের জন্য চরিত্রগুলোকে আরও সক্রিয় ও সমসাময়িক করে তোলাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য।
আরেকটি আলোচনার বিষয় হলো জাতিগত ও যৌন পরিচয়ের উপস্থাপন। সোফিকে কোরিয়ান বংশোদ্ভূত চরিত্র হিসেবে দেখানো এবং বেনেডিক্টের যৌন পরিচয় ও আগের সম্পর্কগুলোকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করার বিষয়টি নিয়ে দর্শক ও সমালোচকদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। কিছু সমালোচক মনে করেন, এসব বিষয়কে আরও গভীরভাবে গল্পে ব্যবহার করার সুযোগ ছিল।
এ ছাড়া মৌসুমের শুরুতে অনলাইন রেটিং নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়। কিছু পর্যবেক্ষক ‘রিভিউ বোম্বিং’–এর কথা উল্লেখ করেন—অর্থাৎ কোনো সিরিজের প্রকৃত মানের সাথে সম্পর্কহীন কারণেও পরিকল্পিতভাবে নেতিবাচক রিভিউ দেওয়ার প্রবণতা। তখন সমালোচকদের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ার তুলনায় দর্শক রেটিং কম ছিল।
তবে সময় গড়ানোর সাথে সাথে সমালোচক ও দর্শকের প্রতিক্রিয়ার মধ্যে কিছুটা ভারসাম্য দেখা যায়। রটেন টমেটোজে চতুর্থ মৌসুমের সমালোচক স্কোর বর্তমানে ৮৩ শতাংশ, আর দর্শক স্কোর ৭২ শতাংশ। সেখানে সমালোচকদের সারসংক্ষেপে মৌসুমটিকে রূপকথার মতো, কিছুটা অনুমানযোগ্য হলেও আকর্ষণীয় ও রোমান্টিক বলা হয়েছে।
নেটফ্লিক্সডটকম, আইএমডিবি ও ভ্যারাইটি অবলম্বনে