দৈনন্দিন জীবনের হাজার হাজার ব্যস্ততার ভিড়ে আমরা অনেক কাজ করি, কিন্তু সেই তালিকায় কি আলাদা করে চোখের যত্নের কথা মনে রাখা হয়? অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, সঠিক যত্ন এবং চিকিৎসার অভাবে বর্তমান সময়ে অনেক মানুষ তাদের অমূল্য দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলছেন।

চোখের সুস্থতার গুরুত্ব অনুধাবন করতে এবং অন্ধত্ব কিংবা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যেই প্রতিবছর পালিত হয় ‘বিশ্ব দৃষ্টি দিবস’ বা ‘World Sight Day’। প্রতি বছর অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় বৃহস্পতিবার বিশ্বজুড়ে বিশেষ গুরুত্বের সাথে এই দিবসটি পালন করা হয়ে থাকে।

বিশ্ব দৃষ্টি দিবসের সূচনার ইতিহাস বেশ পুরনো। ১৯৮৪ সালে আন্তর্জাতিক মানবসেবা সংস্থা ‘লায়ন্স ক্লাবস ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন’ সর্বপ্রথম এই দিবসটি পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য ছিল অত্যন্ত সাধারণ—মানুষ যেন নিজেদের চোখের যত্ন নেওয়ার বিষয়ে সচেতন হয়ে ওঠে।

পরবর্তীতে এই উদ্যোগের গুরুত্ব উপলব্ধি করে আন্তর্জাতিক লায়ন্স ক্লাব, ‘ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর দ্য প্রিভেনশন অফ ব্লাইন্ডনেস’ (আইএপিবি) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যৌথভাবে এই দিবসটিকে একটি বৈশ্বিক প্রচারণায় রূপান্তর করে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ১০০টিরও বেশি দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিশ্ব দৃষ্টি দিবস উদযাপন করে আসছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ বর্তমানে বিভিন্ন দৃষ্টি সমস্যায় ভুগছেন। এর মধ্যে অধিকাংশ সমস্যাই সঠিক সময়ে চিকিৎসা গ্রহণ অথবা সামান্য সচেতনতার মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল। কিন্তু কেবল সচেতনতার অভাব এবং সময়মতো চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ না নেওয়ার কারণে অনেক মানুষ তাদের চোখের স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি হারাচ্ছেন।

বিশ্ব দৃষ্টি দিবস কেবল ক্যালেন্ডারের একটি বিশেষ দিন নয়, বরং এটি আমাদের জন্য চোখের যত্ন নেওয়ার একটি জরুরি রিমাইন্ডার। নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের চোখের প্রতি যত্নশীল হতে খুব জটিল কোনো পদক্ষেপের প্রয়োজন নেই। কিছু সহজ নিয়ম মেনে চললেই দৃষ্টিশক্তি সুরক্ষিত রাখা সম্ভব।

নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করান
আপনার চোখে কোনো সমস্যা অনুভূত হোক বা না হোক, অন্তত বছরে একবার চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে গিয়ে চোখ পরীক্ষা করানো উচিত। বিশেষ করে শিশুদের এবং বয়স্কদের ক্ষেত্রে নিয়মিত চোখের চেকআপ করা অত্যন্ত জরুরি।

চোখকে বিশ্রাম দিন
বর্তমান যুগে আমরা সারাদিন ল্যাপটপ, টেলিভিশন কিংবা মোবাইল ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকি। কাজ করার সময় একটি বিশেষ নিয়ম মেনে চলতে পারেন—প্রতি ২০ মিনিট পর পর স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে অন্তত ২০ ফুট দূরের কোনো বস্তুর দিকে ২০ সেকেন্ড তাকিয়ে থাকুন। এতে চোখের পেশির ওপর চাপ অনেকাংশে হ্রাস পায়। চিকিৎসা বিজ্ঞানে এটিকে ২০-২০-২০ নিয়ম বলা হয়।

খাবার তালিকায় নজর দিন
চোখের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ শাকসবজি, গাজর, পাকা পেঁপে এবং ছোট মাছ রাখা অত্যন্ত জরুরি। পুষ্টিকর খাবার চোখের কার্যক্ষমতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।

সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন
বিশ্বের অনেক প্রান্তেই মানুষের চোখের চিকিৎসার ন্যূনতম আর্থিক সামর্থ্য নেই। আপনি চাইলে বিভিন্ন চক্ষু সেবা প্রদানকারী সংস্থায় (যেমন- হেলেন কিলার ইন্টারন্যাশনাল বা সেভা ফাউন্ডেশন) সাধ্যমতো আর্থিক সহায়তা পাঠাতে পারেন। আপনার সামান্য অবদানই একজন দৃষ্টিহীন মানুষের পৃথিবীতে আলোর দিশা হয়ে আসতে পারে।

আমাদের সামান্য সচেতনতাই পারে চোখকে সম্পূর্ণ সুস্থ ও সুন্দর রাখতে। তাই এই বিশ্ব দৃষ্টি দিবস থেকেই চোখের যত্ন নেওয়া শুরু করুন এবং নিজের চোখ দুটিকে ভালোবাসুন।