কয়েক বছর আগে পর্যন্ত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের একটি বাঁধাধরা চাকরিতে নিয়োজিত ছিলেন আরিফুল ইসলাম। তবে কর্মজীবনের একঘেয়েমি এবং মানসিক চাপ তাঁর ভালো লাগছিল না। শেষ পর্যন্ত সেই জীবন পেছনে ফেলে তিনি ফিরে আসেন নিজের গ্রামে। বাবার পরিত্যক্ত জমিতে শুরু করেন সমন্বিত খামার। সেই ক্ষুদ্র উদ্যোগটি আজ বিশাল আকার ধারণ করেছে। বর্তমানে গাভী পালন, লেয়ার মুরগি এবং পাঙাশ মাছ চাষের মাধ্যমে মাসে প্রায় ২ লাখ টাকা আয় করছেন তিনি।

আরিফুল ইসলাম কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের কিশামত গোবধা গ্রামের বাসিন্দা। তিনি রংপুরের কারমাইকেল কলেজের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করেছেন। বর্তমানে তাঁর সমন্বিত খামারে ১৫টি গাভী, ২ হাজার লেয়ার মুরগি এবং দুটি পুকুরে অন্তত চার হাজার পাঙাশ মাছ রয়েছে।

একটি মাত্র গাভী দিয়ে শুরু করা এই খামারে বর্তমানে গরুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫টিতে, যেখান থেকে প্রতিদিন প্রায় ৮০ লিটার দুধ পাওয়া যায়। খামারের দুই পাশে ১০০ শতক জমিতে দুটি ছোট পুকুরে মাছ চাষ করছেন তিনি। এছাড়া ২ হাজার লেয়ার মুরগি থেকে প্রতিদিন ১ হাজার ৮০০টি ডিম পাওয়া যাচ্ছে।

সম্প্রতি ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের বাঘআছড়া বিলের পাশের মেঠো পথ পেরিয়ে কিশামত গোবধা গ্রামের শেষ প্রান্তে অবস্থিত আরিফুলের 'আফরা ক্যাটল ফার্ম' পরিদর্শনে গেলে দেখা যায়, খামারে প্রবেশ করতেই গরুর শেড থেকে ভেসে আসছে একের পর এক হাম্বা ডাক। গরুগুলোর দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে আরিফুল বলেন, “আমার গলা শুনলেই ওরা ডাকতে শুরু করে। খাবার না দেওয়া পর্যন্ত ডাকতেই থাকে।”

পড়াশোনা শেষ করে ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন আরিফুল। একই বছর বিয়ে করায় পরিবারের পক্ষ থেকে চাকরি বজায় রাখার জন্য চাপ ছিল। কিন্তু কর্মক্ষেত্রের চাপ ও ব্যস্ততা তাঁকে আকর্ষণ করেনি। ফলে কিছুকাল পর চাকরি ছেড়ে গ্রামে ফিরে আসেন তিনি। ৩০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে বাবার পরিত্যক্ত জমিতে ব্রয়লার মুরগির খামার শুরু করেন। তিন ধাপে মুরগি বিক্রি করে কিছু অর্থ সঞ্চয় করেন। সেই জমানো টাকা দিয়ে ২০২০ সালে দুটি উন্নত জাতের গাভী কেনেন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে।

শুরুতে দুটি গাভী থেকে সংখ্যা বেড়ে হয় চারটি। পরবর্তীতে সেই চারটি গরু বিক্রি করে লালমনিরহাট সেনা ক্যাম্পের নিলাম থেকে ৩০টি ষাঁড়ের বাছুর কেনেন তিনি। ২০২২ সালের শুরুতে সেগুলো বিক্রি করে বড় অঙ্কের অর্থ লাভ করেন। ২০২৪ সালে সেই অর্থ দিয়ে বাছুরসহ একটি ফ্রিজিয়ান জাতের গাভী কেনেন। বাবার দেওয়া ১০০ শতক জমি এবং আরও ১২০ শতক জমি ইজারা নিয়ে ঘাস চাষ শুরু করেন। এভাবে একটি গাভী থেকে ধীরে ধীরে খামারে গাভীর সংখ্যা ১৫টিতে পৌঁছায় এবং প্রতিদিন প্রায় ৮০ লিটার দুধ পাওয়া যায়।

খামারের দুই পাশে ১০০ শতক জমিতে দুটি ছোট পুকুরে মাছ চাষের বিষয়ে আরিফুল ইসলাম জানান, গত বছরের ডিসেম্বরে ৫০ হাজার টাকা খরচ করে পোনা ছেড়েছেন। বর্তমানে সেই মাছের বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা। খামারের এক পাশে ২ হাজার লেয়ার মুরগির খামার থেকে প্রতিদিন ১ হাজার ৮০০টি ডিম পাওয়া যায়। মুরগির খাবার ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ বাদ দিয়ে শুধু এই খাত থেকেই মাসে প্রায় দেড় লাখ টাকা আয় হয় তাঁর।

তবে আরিফুলের এই পথচলা সহজ ছিল না। তাঁর স্ত্রী উম্মে সাবিহাতুন জান্নাত সৈয়দপুর আর্মি ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে বিএসসি করেছেন। উম্মে সাবিহাতুন জান্নাত মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “শুরুতে শিক্ষিত স্বামীকে মুরগির খামারে কাজ করতে দেখে ভালো লাগত না। পরিচিতজনদের কাছে স্বামীর পেশা বলতে সংকোচবোধ করতেন। স্বামীর আগ্রহ ও পরিশ্রম দেখে আর বাধা দেননি।” তিনি আরও বলেন, “খামারের প্রতি তাঁর দরদ আর পরিশ্রমের ফলে আজ সফলতার মুখ দেখেছে।”

আরিফুলের বাবা মো. দলিল উদ্দিন ভূঁইয়া একজন স্কুলশিক্ষক। তিনি ছেলেকে রংপুরে রেখে পড়াশোনা করিয়েছিলেন। পড়াশোনা শেষে চাকরি না করে খামার করার সিদ্ধান্তে শুরুতে তাঁর আপত্তি ছিল। তবে ছেলের একাগ্রতা দেখে পরে তিনি ১০০ শতক জমি প্রদান করেন। দলিল উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, “চাকরি না করে ছেলে খামার করেছে। এখন নিজের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি আরও চারজনের কর্মসংস্থান করেছে। বাবা হিসেবে আমার গর্ব হয়।”

আরিফুল ইসলাম বলেন, “২ লাখ ৬০ হাজার টাকায় একটি গাভি কিনেছিলাম। সেই গাভি আর স্ত্রীর সহযোগিতা আজ আমাকে সমন্বিত খামারের মালিক করেছে। এখন খামারে প্রায় এক কোটি টাকার সম্পদ। চাকরি করে এত অল্প সময়ে এত দূর আসতে পারতাম না।”

খামারে কর্মরত রাজকুমার রায় একসময় দিনমজুরি করতেন। বছরের অধিকাংশ সময় তাঁর কাজ থাকত না। এখন আরিফুলের খামারে কাজ করে মাসে ১৫ হাজার টাকা বেতন পান তিনি। রাজকুমার বলেন, “আগে কাজের নিশ্চয়তা ছিল না। এখন পরিবার নিয়ে ভালো আছি। নিজের ঘরে তিনবেলা খেয়ে চাকরি করছি।” তাঁর মতো আরও তিনজন কর্মী এই খামারে কাজ করছেন, যাদের প্রত্যেকের বেতন ১৫ হাজার টাকা।

ছোটবেলা থেকেই নিজের কিছু করার ইচ্ছা ছিল আরিফুলের। এমন উদ্যোগ নিতে চেয়েছিলেন যেখানে নিজের পাশাপাশি অন্যের কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে। আরিফুল ইসলাম বলেন, “পড়াশোনা শেষে ব্রয়লার দিয়ে শুরু করেছিলাম। পরিবারের আপত্তিতে চাকরিতে গিয়েছিলাম। কিন্তু বেশি দিন থাকতে পারিনি। ফিরে এসে আবার গরুর খামার করি।”

২ লাখ ৬০ হাজার টাকায় একটি গাভী কেনার কথা উল্লেখ করে তিনি পুনরায় বলেন, “সেই গাভি আর স্ত্রীর সহযোগিতা আজ আমাকে সমন্বিত খামারের মালিক করেছে। এখন খামারে প্রায় এক কোটি টাকার সম্পদ। চাকরি করে এত অল্প সময়ে এত দূর আসতে পারতাম না।” তবে সরকারি সহায়তার অভাবের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রাণিসম্পদ দপ্তর থেকে তেমন সহযোগিতা পাননি তিনি।

এই বিষয়ে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “প্রাণিসম্পদ বিভাগ থেকে আর্থিক কোনো সহযোগিতা করার সুযোগ নেই। খামারিদের জন্য তাঁরা ভ্যাকসিন ও কিছু কারিগরি সুযোগ-সুবিধা দিয়ে থাকেন। তিনি (আরিফুল) উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে যোগাযোগ করলে এসব সুবিধা পাবেন।” তিনি আরও জানান, বর্তমানে জেলায় ১০টির বেশি গরু পালনকারী প্রান্তিক খামারের সংখ্যা প্রায় ৪৫০ এবং তাঁদের চিকিৎসা সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।