মৎস্য উৎপাদনকারী অঞ্চল হিসেবে নাটোর জেলার যথেষ্ট সুনাম রয়েছে। এখানে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত বেশ কিছু হ্যাচারি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব হ্যাচারিতে উৎপাদিত রেণু পোনা অত্যন্ত মানসম্মত হওয়ায় বর্তমানে সারা দেশে এর ব্যাপক চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে এখানকার রেণু পোনার মড়কের হার অনেক কম হওয়ায় মৎস্যচাষীদের কাছে এটি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ফলে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এই রেণু পোনা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করা হচ্ছে, যা সামগ্রিকভাবে দেশের মৎস্যচাষ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মৎস্যসম্পদে সমৃদ্ধ নাটোর জেলায় বিপুলসংখ্যক নদ-নদীর পাশাপাশি ছোট-বড় অসংখ্য পুকুর রয়েছে। বড় মাছ উৎপাদনে এই জেলার বিশেষ খ্যাতি রয়েছে এবং এখান থেকেই উদ্বৃত্ত মাছ দেশের বিভিন্ন বাজারে বাজারজাত করা হয়। ঠিক একইভাবে এখানে মাছের রেণু উৎপাদনেরও একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য বিদ্যমান। মৎস্য অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে নাটোর সদর, কারবালা ও বড়াইগ্রাম মৎস্য বীজ উৎপাদন খামারে নিয়মিত মাছের রেণু উৎপাদিত হচ্ছে এবং এর মাধ্যমে মৎস্যচাষীদের রেণুর চাহিদা পূরণ করা হচ্ছে।

মাছের রেণু উৎপাদনকারী ও ক্রেতাদের দাবি, নাটোরের হ্যাচারিগুলোতে উৎপাদিত মাছের রেণু পোনা দ্রুত বর্ধনশীল এবং সম্পূর্ণ রোগমুক্ত। অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় এখানকার রেণু পোনার মড়কের হার অনেক কম, যার কারণে এর চাহিদা ব্যাপক। ক্রেতাদের মতে, এই রেণু পোনা সংগ্রহ করে পুকুরে চাষ করলে মাছ যেমন দ্রুত বৃদ্ধি পায়, তেমনি উৎপাদনও বেশি হয়, ফলে মৎস্যচাষীরা আর্থিকভাবে লাভবান হন। এর পাশাপাশি এসব খামারে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়ায় অনেক শ্রমিক হ্যাচারিতে কাজ করে তাদের সংসার পরিচালনা করছেন।

মাছের রেণু কিনতে আসা আল মামুন, আনোয়ার হোসেন, রাসেল আহমেদ, মৎস্যচাষী ইউসুফ আলী, রেণুচাষী আবু রায়হান ও আনসার আলী জানান, “নাটোরের হ্যাচারির মাছের রেণুর গুণগত মান অনেক ভালো। অন্যান্য জায়গার মাছের তুলনায় এখানকার রেণু পোনার মড়কের হার অনেক কম। পুকুরে চাষ করলে এখানকার মাছ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ফলে তাদের মতো ক্ষুদ্র মৎস্যচাষীদের লাভ বেশি হয়।”

তারা আরও জানান, এক কেজি রেণু পোনার দাম ৬ হাজার টাকা। এক বিঘা পুকুরে আধা কেজি রেণু পোনা ছাড়া হলে দেড় মাসের মধ্যে এক থেকে দেড় লাখ টাকা আয় করা সম্ভব হয়। নাটোরে উন্নত জাতের মাছের রেণু পাওয়া যায়। এসব মাছ অল্প সময়ের মধ্যে দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং মড়কের হারও অনেক কম। ফলে এখান থেকে রেণু পোনা নিয়ে গিয়ে ক্ষুদ্র মৎস্যচাষীরা লাভবান হন।

তোফায়েল নামে একজন মৎস্যচাষী জানান, তিনি ২২ বিঘা পুকুরে মাছ চাষ করেন। তিনি বিভিন্ন জায়গা থেকে মাছের রেণু ও পোনা সংগ্রহ করেন। এ বছর তিনি নাটোর থেকে মাছের রেণু পোনা সংগ্রহ করেছেন। নাটোরের রেণু পোনা থেকে উৎপাদিত মাছের গ্রোথ অনেক বেশি হয়েছে এবং উৎপাদনও অনেক বেশি হয়েছে।

রেণুচাষীদের বর্ণনা অনুযায়ী, তারা প্রথমে পুকুরে নিজেরাই মাছ তৈরি করেন। এরপর সেই মাছ জেলে দিয়ে ধরে হ্যাচারিতে আনা হয়। সেখানে ডিম উৎপাদন করে বোতলে নেওয়া হয় এবং ডিম ফুটিয়ে রেণু তৈরি করা হয়। এরপর তা বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ করা হয়। এখানকার রেণু পোনার চাহিদা ও সুনাম থাকায় মানুষ এখান থেকে রেণু পোনা কিনে নিয়ে যায় এবং লাভবান হয়। তারা জানান, আল্লাহর রহমতে তাদের ভালো চলছে।

বিসমিল্লা মৎস্য হ্যাচারির শ্রমিক হাবিল জানান, এই হ্যাচারিতে তারা পাঁচজন শ্রমিক কাজ করেন। তারা হ্যাচারির দেখভাল করেন। এখান থেকে তারা যে মজুরি পান, তা দিয়ে তাদের সংসার ভালোভাবে চলে। তিনি মনে করেন, এরকম আরও হ্যাচারি থাকলে তাদের মতো আরও লোকের কর্মসংস্থান হবে এবং মানুষ ভালো মাছের উৎপাদন পাবে।

নাটোর সদর সরকারি মৎস্য বীজ উৎপাদন খামারের ব্যবস্থাপক জয়নুল আবেদীন এবং বড়াইগ্রাম উপজেলার কারবালা সরকারি মৎস্য বীজ উৎপাদন খামারের ব্যবস্থাপক নির্মল কুমার কুন্ডু জানান, তারা সরকারি খামারে ধানি ও মূল মাছ সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক খাবার দিয়ে তৈরি করেন। এসব মাছকে চালের খুদ, কুড়া, সরিষার খৈল, চিটাগুড়, ভুট্টার কুড়া খাওয়ানো হয়। সারা বছর পরিচর্যার পর যখন এসব মাছ বর্ষার সময় ডিম দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করে, তখন মা মাছগুলোকে আলাদা পুকুরে স্থানান্তর করে লালন-পালন করা হয়।

এরপর মা মাছগুলোকে উন্নতমানের কিছু প্রোটিন, ভিটামিন ও প্রাকৃতিক শৈবাল খাওয়ানো হয়, যাতে তারা দ্রুত সক্ষমতা অর্জন করে। এতে মাছগুলো দ্রুত বর্ধনশীল ও রোগমুক্ত হয়। এসব মাছ থেকে যে বড় মাছ তৈরি হয়, তার স্বাদ খুব ভালো এবং তা দ্রুত বর্ধনশীল। যেহেতু এসব মাছ রোগমুক্ত ও দ্রুত বর্ধনশীল এবং অন্যান্য জায়গার চেয়ে ভালো, তাই মৎস্যচাষীরা এই পোনা সংগ্রহ করে নিয়ে গিয়ে উপকৃত ও লাভবান হচ্ছেন।

তারা আরও জানান, সরকারি হ্যাচারিগুলোতে নিজেদের মাছ সংগ্রহ করে উন্নতমানের রেণু উৎপাদন করা হয় এবং তা মৎস্যচাষীদের সরবরাহ করা হয়, যাতে দেশের মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ওমর আলী জানান, নাটোর মৎস্যসম্পদে সমৃদ্ধ একটি জেলা। এ জেলা বড় মাছ উৎপাদনে খ্যাতি রয়েছে। এখান থেকেই উদ্বৃত্ত মাছ দেশের বিভিন্ন স্থানে বাজারজাত হয়ে থাকে। ঠিক তেমনিভাবে এখানে মৎস্য রেণু উৎপাদনেরও একটি ঐতিহ্য রয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তরের আওতায় নাটোর সদর, কারবালা ও বড়াইগ্রাম মৎস্য বীজ উৎপাদন খামারে মাছের রেণু উৎপাদিত হয় এবং মৎস্যচাষীদের রেণুর চাহিদা পূরণ করা হয়।

তিনি বলেন, “এলাকার চাহিদা মিটিয়ে পার্শ্ববর্তী বিভাগের রংপুর, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় এই রেণু পোনা চলে যায়। এই এলাকার মৎস্যচাষী এবং রেণু পোনা চাষীরা উদ্বৃত্ত মাছের রেণু উৎপাদন করে নিজেদের স্বাবলম্বী করছেন। তাদের হ্যাচারির লাইসেন্স প্রদান করে তা পরিদর্শন করা হয়, যাতে তারা মানসম্মত রেণু পোনা উৎপাদন করেন। তাদের সবসময় সহযোগিতা করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও এই সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।”