বাংলাদেশের একটি প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে ১৪ বছর আগে যে মানবিক যাত্রার সূচনা হয়েছিল, তা এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পৌঁছেছে। নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের হাই-লেভেল উইকের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি ও আলোচনায় অংশ নিয়েছে ড. মোস্তফা-হাজেরা ফাউন্ডেশন।

ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ক্যাপ্টেন এ কে এম গোলাম কিবরিয়া (সিআইপি) গত ২১ থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জাতিসংঘ এবং ইউএনজিএ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেন। এই কর্মসূচির আলোচনাগুলোতে দারিদ্র্য বিমোচন, বৈষম্য দূরীকরণ, মানবাধিকার রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, টেকসই উন্নয়ন, বৈশ্বিক শান্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবসহ বর্তমান বিশ্বের নানা pressing ইস্যু গুরুত্বের সাথে উঠে এসেছে।

বর্তমানে বিশ্বের ১৫টি দেশে তাদের ‘ফাইভ জিরো গ্লোবাল ক্যাম্পেইন’ কার্যক্রম পরিচালনা করছে এই ফাউন্ডেশন। এই বিশেষ ক্যাম্পেইনের পাঁচটি প্রধান লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে: শূন্য ভিক্ষাবৃত্তি, শূন্য নিরক্ষরতা, শূন্য গৃহহীনতা, চিকিৎসাবিহীন শূন্য মৃত্যু এবং শূন্য অদক্ষ মানুষ। এছাড়া রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলা এবং মানবিক সহায়তা প্রদান করা তাদের কার্যক্রমের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত।

গত ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ উদ্যোগে একটি উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্ট আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানটির শিরোনাম ছিল ‘রোহিঙ্গা সংকট: দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি থেকে টেকসই সমাধানের নতুন আহ্বান, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিসহ’। সেখানে দীর্ঘকাল ধরে বাস্তুচ্যুত হয়ে থাকা রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, জবাবদিহিতা এবং একটি টেকসই সমাধানের অপরিহার্যতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।

জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার দেওয়া তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী আশ্রয় গ্রহণ করেছে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে একটি নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা জাতিসংঘ বারবার উল্লেখ করেছে।

ড. মোস্তফা-হাজেরা ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, তারা ইতিমধ্যে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য বিভিন্ন মানবিক ও চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছে। আগামী দিনে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং মানবিক ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে এই উদ্যোগগুলোকে আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

ক্যাপ্টেন গোলাম কিবরিয়ার প্রবর্তিত ‘হিউম্যান ইকুইটি সিভিলাইজেশন’ দর্শনের মূল লক্ষ্য হলো এমন একটি বিশ্ব সমাজ গঠন করা, যেখানে প্রতিটি মানুষ সমান মর্যাদা, সুযোগ, শিক্ষা, প্রয়োজনীয় সম্পদ এবং উন্নয়নের অধিকার ভোগ করবে। তাঁর বিশ্বাস, কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা প্রযুক্তিগত উৎকর্ষই যথেষ্ট নয়; বরং একটি ন্যায়সংগত, শান্তিপূর্ণ ও মানবিক সমাজ গড়তে হলে সমতা, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং মানবিক মূল্যবোধের চর্চা প্রয়োজন।

২৩ সেপ্টেম্বর রোহিঙ্গা সংকটবিষয়ক অনুষ্ঠানে জাতিসংঘের ভেন্যুর স্ক্রিনে ড. মোস্তফা-হাজেরা ফাউন্ডেশনের লোগো প্রদর্শিত হওয়াটি সংগঠনটির জন্য একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও প্রতীকী মুহূর্ত ছিল। ফাউন্ডেশনের মতে, বাংলাদেশের একটি গ্রাম থেকে শুরু হওয়া ১৪ বছরের এই মানবিক অভিযাত্রা আন্তর্জাতিক আলোচনার সর্বোচ্চ মঞ্চে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

এই প্রসঙ্গে ক্যাপ্টেন এ কে এম গোলাম কিবরিয়া বলেন, “প্রযুক্তি একা যথেষ্ট নয়। মানবতার ভবিষ্যৎ পরিচালনায় প্রয়োজন প্রজ্ঞা, সহযোগিতা ও মানবিকতা।”

পাশাপাশি, বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন ক্যাপ্টেন গোলাম কিবরিয়া।

ফাউন্ডেশনটির দাবি, তাদের কার্যক্রম সাধারণ দাতব্য কর্মকাণ্ডের গণ্ডি ছাড়িয়ে মানুষের মর্যাদা রক্ষা, সুযোগের সমতা নিশ্চিত করা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং দক্ষতা উন্নয়নের ওপর অধিক গুরুত্বারোপ করে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের হাই-লেভেল উইকের বিভিন্ন আয়োজনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তারা এই মানবিক অগ্রাধিকারগুলোকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছে।

একটি গ্রাম থেকে শুরু হয়ে জাতিসংঘের বিশ্বমঞ্চ পর্যন্ত—ড. মোস্তফা-হাজেরা ফাউন্ডেশনের ১৪ বছরের এই দীর্ঘ পথচলা বাংলাদেশের মাটিতে গড়ে ওঠা একটি মানবিক উদ্যোগের আন্তর্জাতিক প্রসারের এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।