গাজায় চলমান যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ এখন স্যাটেলাইট ছবির মাধ্যমেও স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। যুদ্ধের আগের ও পরের ছবি পাশাপাশি রেখে গাজার বর্তমান করুণ পরিস্থিতি বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছেন জনপ্রিয় হলিউড অভিনেত্রী অ্যাঞ্জেলিনা জোলি। শীতকাল আসার আগেই গাজার অসহায় মানুষের জন্য জরুরি আশ্রয় এবং প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
শনিবার নিজের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে গুগল আর্থের বেশ কিছু ছবি শেয়ার করে জোলি লিখেছেন, ‘এখন গুগল আর্থ খুললেই দেখা যাচ্ছে গাজায় কী করা হয়েছে। পুরো জনপদ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ঘরবাড়ি, স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, সড়ক, পানি ও পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা—মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে।’
গত সপ্তাহে ইন্টারনেটে এই নতুন ছবিগুলো প্রকাশিত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। তবে গুগল কর্তৃপক্ষ এই ছবিগুলো ঠিক কবে প্রকাশ করেছে, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট তথ্য জানায়নি। স্যাটেলাইট চিত্রগুলোতে দেখা যাচ্ছে, গাজার অনেক এলাকায় এখন আর কোনো ভবনের চিহ্ন অবশিষ্ট নেই। কোথাও কেবল শূন্য মরুভূমি বা খালি জমি দেখা যাচ্ছে, আবার কোথাও স্তূপ হয়ে পড়ে আছে ধ্বংসাবশেষ। রাস্তাঘাট, মসজিদ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চারপাশ জুড়েও ব্যাপক ধ্বংসের চিত্র ফুটে উঠেছে।
জাতিসংঘের স্যাটেলাইট কেন্দ্রের একটি মূল্যায়নের তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে জোলি জানান, গত ১৬ জুন পর্যন্ত গাজার মোট ৮২ শতাংশ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর এর মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ স্থাপনা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।
শীতের আগে জরুরি সহায়তা চান জোলি
শীতের প্রকোপ ঘনিয়ে আসায় গাজার সাধারণ মানুষের দুর্দশা আরও চরম পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে বলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জোলি। তাঁর দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গাজার প্রায় ১৯ লাখ ৮০ হাজার মানুষের জরুরি আশ্রয় এবং জীবনধারণের প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রয়োজন। অর্থাৎ গাজার মোট জনসংখ্যার ৯৪ শতাংশ বাসিন্দারই এখন সহায়তার প্রয়োজন। তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, ত্রাণ সামগ্রী এবং আশ্রয় তৈরির উপকরণগুলো সেখানে পৌঁছাতে নানা ধরনের বাধা ও বিলম্বের সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
এই মানবিক সংকট নিয়ে জোলি লিখেছেন, ‘গুগল আর্থের ছবিতে ধ্বংসযজ্ঞ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এসব ছবি দেখাতে পারে না ধ্বংসস্তূপের মধ্যে জীবন কেমন। নিহত পরিবারগুলোর কী হয়েছে, কিংবা যারা বেঁচে আছে, তাদের জীবন এখন কেমন—সেটিও দেখা যায় না।’
বেসামরিক সাধারণ মানুষের কাছে দ্রুত প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। বিশেষ করে হাসপাতালগুলোতে জরুরি চিকিৎসাসামগ্রী পাঠানোর কথা বলেছেন তিনি। পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়ি, স্কুল, হাসপাতাল এবং সামগ্রিক জনপদ পুনর্গঠনের সুযোগ করে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন জোলি।
ফিলিস্তিনিদের পাশে থাকার ইতিহাস
ফিলিস্তিনিদের দীর্ঘদিনের দুর্দশা ও কষ্টের কথা বলে আগেও সরব হয়েছেন অ্যাঞ্জেলিনা জোলি। চলতি বছরের জানুয়ারিতে তিনি মিসর সফর করেন এবং রাফাহ সীমান্তের মিসরীয় অংশ পরিদর্শন করেন। সেখানে তিনি মিসরের রেড ক্রিসেন্টের কর্মী এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেই সঙ্গে তিনি ত্রাণগুদামগুলোও ঘুরে দেখেন।
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে শরণার্থী এবং সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের অধিকার ও কল্যাণে কাজ করে আসছেন জোলি। তিনি জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার শুভেচ্ছাদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং পরবর্তীতে বিশেষ দূতের দায়িত্বও সামলেছেন। ২০২২ সালে তিনি ওই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেন।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলে হামাসের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছিলেন জোলি। পরবর্তীতে গাজার পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে একে ‘খোলা আকাশের কারাগার’ বলে মন্তব্য করেন তিনি। এছাড়া গাজায় যুদ্ধের কারণে এতিম হয়ে যাওয়া শিশুদের জন্য একটি বিশাল আশ্রয়কেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনার সঙ্গেও তাঁর নাম জড়িয়েছে।