ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনে যখন ঢাকাগামী একটি আন্তনগর ট্রেনের থামার প্রস্তুতি চলছে, তখন প্ল্যাটফর্মে যাত্রীদের ভিড় আর মাইকে ভেসে আসা বার্তার মাঝে ব্যস্ত এক যুবক। তিনি মো. সোহরাব হোসেন সুজন, যিনি এই স্টেশনের স্টেশনমাস্টার। কন্ট্রোল রুমের নির্দেশ ও ট্রেনের সিগন্যাল তদারকির গুরুদায়িত্ব সামলাচ্ছেন তিনি। সাধারণ মানুষের মতোই কক্ষ থেকে প্ল্যাটফর্মে হেঁটে এলেও বাইরে থেকে খুব কম মানুষই বুঝতে পারেন, জীবনের এক কঠিন সময়ে তিনি নিজের বাঁ পা হারিয়েছেন। তবে শারীরিক এই সীমাবদ্ধতা তাকে দমাতে পারেনি। জীবনের রেললাইন যে সব সময় মসৃণ হয় না, তা কিশোর বয়সেই উপলব্ধি করেছিলেন সুজন।
ঘটনাটি ২০০৩ সালের। ঠাকুরগাঁও জেলার হরিপুর উপজেলার মাগুরা গ্রামের দুরন্ত কিশোর ছিলেন সুজন। সে সময় তিনি কাঁঠালডাঙ্গী দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। বাড়িতে চাচাতো ভাইয়ের বিয়ের বৌভাতের উৎসব চলছিল। দুপুরে বড় আব্বার সঙ্গে মাঠে গিয়েছিলেন গম কাটার পর আলুর জমি চাষের কাজ দেখতে। সেখানে পাওয়ার টিলার চালানোর প্রবল ইচ্ছা জাগে সুজনের মনে। কিশোর মনের কৌতূহল আর অনুরোধের মুখে বড় আব্বা শেষ পর্যন্ত তাকে গাড়িটি চালাতে দেন। কিন্তু অনভিজ্ঞতার কারণে মোড় ঘোরাতে গিয়ে ঘটে যায় এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা। পাশে থাকা পুকুরে উল্টে যায় পাওয়ার টিলার এবং সুজনের বাঁ পা স্লিপ কেটে সরাসরি টিলারের ফালসেটে ঢুকে যায়। রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে প্রথমে দিনাজপুর এবং পরবর্তীতে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। রক্তনালি পুরোপুরি ছিঁড়ে যাওয়ায় চিকিৎসকদের সামনে আর কোনো উপায় ছিল না। জীবন বাঁচাতে হাঁটুর নিচ থেকে কেটে ফেলতে হয় সুজনের বাঁ পা।
হাসপাতাল থেকে ফেরার পর কৃত্রিম পায়ের জন্য অপেক্ষা এবং ক্ষত শুকানোর দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় এক বছর পড়াশোনা বন্ধ থাকে তার। কিশোর মনে বাসা বাঁধে একরাশ লজ্জা ও সংকোচ। বন্ধুদের সামনে কীভাবে দাঁড়াবেন, তা নিয়ে তিনি চিন্তিত ছিলেন। গ্রামের মানুষের মুখে মুখে তখন কথা ঘুরছিল, ‘ছেলেটার জীবন তো শেষ, ওকে দিয়া আর কিচ্ছু হবে না।’
তবে প্রতিকূলতার কাছে হার মানার পাত্র ছিলেন না সুজন। ঢাকায় কর্মরত তাঁর উকিল বোন নাসিমা ও দুলাভাই হাবিবের সহায়তায় প্লাস্টিক সার্জারির মাধ্যমে কৃত্রিম পা লাগানো হয়। সুজন নিজেকে বোঝালেন যে, মানুষের কথায় কান দিলে জীবন থমকে যাবে। লজ্জা কাটিয়ে তিনি পুনরায় সাইকেলের হ্যান্ডেল ধরলেন এবং কৃত্রিম পা দিয়েই স্বাভাবিকভাবে সাইকেল চালানো শুরু করলেন। পুনরায় স্কুলে যাওয়া শুরু করলেও তিনি নিয়মিত ক্লাসে যেতেন না, কেবল পরীক্ষা দিতেন। হরিপুরের কাঁঠালডাঙ্গী স্কুলের গণিত শিক্ষক মহিনুদ্দীন স্যারের আন্তরিক সহযোগিতায় বাড়িতে বসেই পড়াশোনা চালিয়ে যান তিনি। স্থানীয় একটি কোচিংয়ের মডেল টেস্টে প্রথম হয়ে সবাইকে চমকে দেন সুজন। ২০০৮ সালে মানবিক বিভাগ থেকে এসএসসিতে জিপিএ ৪.৬০ এবং পরবর্তীতে কাঁঠালডাঙ্গী কেবি ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসিতে ৪.৯০ অর্জন করেন।
শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে বাবা চাইতেন সুজন বাড়ির কাছেই থাকুক। কিন্তু সুজনের স্বপ্ন ছিল আকাশচুম্বী। বাবার আপত্তি উপেক্ষা করে তিনি ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে সুযোগ পান। কৃষক বাবার পক্ষে প্রতি মাসে পাঁচ-ছয় হাজার টাকা পাঠানো ছিল এক কঠিন লড়াই। জমি বন্ধক রেখে কিংবা ধারদেনা করে বাবা ছেলের পড়াশোনার খরচ জোগাতেন, তবে অভাবের কথাটি কখনো সুজনের সামনে আনেননি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স শেষ করে সুজন চলে আসেন দিনাজপুরে। কোনো কোচিং সেন্টারে না গিয়ে মেসে বসেই শুরু করেন সরকারি চাকরির প্রস্তুতি। নূর ইসলাম নামের এক স্কুলবন্ধুর সহযোগিতায় তিনি দিনাজপুর সরকারি কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে ৫৫-৬০ জনের একটি সেলফ-স্টাডি গ্রুপ গঠন করেন, যার নেতৃত্ব দেন তিনি নিজেই। রাত ৩টা-৪টা কিংবা ফজরের আজান পর্যন্ত টেবিল-চেয়ারেই কেটে যেত তাঁর সময়। বিসিএস ও চাকরির বইগুলো এমনভাবে মুখস্থ করেছিলেন যে, মেসে সহপাঠীরা তাকে ‘বস’ বলে ডাকতেন।
কঠোর পরিশ্রমের ফল পান তিনি। প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষসহ একাধিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। অবশেষে ২০১৯ সালের মে মাসে বাংলাদেশ রেলওয়েতে সহকারী স্টেশনমাস্টার (এএসএম) হিসেবে যোগ দেন তিনি।
শুরুর দিকে কেউ কেউ তাঁর শারীরিক সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ করলেও কাজে কোনো ছাড় দেননি সুজন। দায়িত্বের প্রতি তাঁর নিষ্ঠা ও একাগ্রতা দেখে যোগদানের মাত্র পাঁচ-ছয় মাসের মাথায় ব্যস্ত পীরগঞ্জ স্টেশনের দায়িত্ব তাঁর ওপর ন্যস্ত করেন কর্তৃপক্ষ। চার বছর পর ২০২৩ সালে তিনি পদোন্নতি পান এবং একই স্টেশনের পূর্ণাঙ্গ স্টেশনমাস্টার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি সময়মতো ট্রেন পরিচালনা, শত শত যাত্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং টিকিট ও ক্যাশের সঠিক হিসাব রাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো পুরোদমে সামলাচ্ছেন। নিজের শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে রেলওয়ের কাছ থেকে তিনি কোনো বিশেষ সুবিধার প্রত্যাশাও করেন না। তবে রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সুজন বলেন, ‘তাঁরা আমার প্রতি ভরসা করে দায়িত্ব দিয়েছেন। আমি সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করি।’ বর্তমানে তিনি নিজের মোটরসাইকেল ব্যবহার করে বাড়ি থেকে স্টেশনে যাতায়াত করেন।
স্টেশনমাস্টার মো. সোহরাব হোসেন সুজন বলেন, ‘সমাজে কে কী বলল, তাতে কান দিলে চলা যায় না। লক্ষ্য যদি স্থির থাকে আর মনে আত্মবিশ্বাস থাকে, তবে কোনো শারীরিক প্রতিবন্ধকতাই মানুষকে আটকে রাখতে পারে না।’