ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাতজন শিক্ষার্থী ‘আলী রীয়াজ স্নাতকোত্তর গবেষণা পুরস্কার ২০২৬’-এর আওতায় দুটি ভিন্ন ক্যাটাগরিতে পুরস্কার ও বৃত্তি লাভ করেছেন।

আজ বুধবার সকাল ১০টায় সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক মুজাফফর আহমদ চৌধুরী মিলনায়তনে এই পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর আলী রীয়াজ পুরস্কারপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন।

পুরস্কারটি দেওয়া হয়েছে ‘স্নাতকোত্তর গবেষণা প্রস্তাব’ এবং ‘সেরা স্নাতকোত্তর গবেষণা’—এই দুই বিভাগে। সেরা স্নাতকোত্তর গবেষণা পুরস্কার পেয়েছেন অর্থী নবনীতা ও ফারাহ জাহান শুচি। অন্যদিকে, স্নাতকোত্তর গবেষণা প্রস্তাব বৃত্তির আওতায় পুরস্কার পেয়েছেন ফারাহ জাহান শুচি, উসামা রাফিদ, আজরা হুমায়রা, কৌরিত্র পোদ্দার তীর্থ, মোহাম্মদ আল মুকিত এবং মুহাম্মদ মুযযাম্মিল হক। উল্লেখ্য, ফারাহ জাহান শুচি উভয় ক্যাটাগরিতেই পুরস্কার অর্জন করেছেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম এবং গেস্ট অব অনার হিসেবে ছিলেন আলী রীয়াজ। পুরো অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান।

তরুণ প্রজন্মের প্রতি মুক্তচিন্তা, যুক্তি এবং ভিন্নমতের প্রতি সহনশীল হওয়ার আহ্বান জানান আলী রীয়াজ। তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আপনারা প্রশ্ন করুন—কেন? শুধু সাংবাদিকতার শিক্ষার্থী হিসেবে নয়, আপনাদের দায়িত্ব হচ্ছে এই প্রশ্নটা করা। এই পৃথিবীটা আপনাদের।’

তারুণ্যের প্রধান শক্তি হিসেবে যুক্তির কথা উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করেন যেন এই শক্তি ঔদ্ধত্যে রূপ না নেয়। তিনি বলেন, যুক্তি শাণিত হতে হবে, তবে তা যেন তরবারিতে পরিণত না হয়। একইসঙ্গে তিনি অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও ভিন্নমতের প্রতি সহনশীল থাকার গুরুত্ব তুলে ধরেন।

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আলী রীয়াজ বলেন, স্বৈরাচারকে পরাস্ত করা গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রথম ধাপ। তবে গণতান্ত্রিক উত্তরণ শুধু নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নাগরিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং জবাবদিহিমূলক ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মধ্য দিয়েই প্রকৃত গণতান্ত্রিক অংশীদারত্ব তৈরি হয়।

প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনা ও ঝুঁকি সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের সচেতন থাকার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ‘অ্যালগরিদম যেন আপনার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ না করে, সে বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রমের প্রসারে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের বা অ্যালামনাইদের সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করেন উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক পরিকল্পনা থাকলেও আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে সব বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। এই সমস্যা সমাধানে সাবেক শিক্ষার্থীদের সহায়তায় এনডাউমেন্ট ফান্ড বা স্থায়ী আর্থিক তহবিল গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

পুরস্কারপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানিয়ে উপাচার্য বলেন, এই স্বীকৃতি তাঁদের ভবিষ্যতে আরও উন্নত মানের গবেষণা করতে অনুপ্রাণিত করবে।

পাশাপাশি আলী রীয়াজ ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থের পরিমাণ বাড়ানোর আহ্বান জানান উপাচার্য। তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতির কারণে দীর্ঘ সময় পর অনেক ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থের প্রকৃত মূল্য কমে যায়। ফলে এসব তহবিল থেকে আগের মতো বৃত্তি বা পুরস্কার দেওয়া সম্ভব হয় না। তাই সময়ের সঙ্গে পুরস্কারের অর্থ বাড়ানোর ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, সাধারণত শিক্ষার্থীদের পুরস্কার বা বৃত্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁদের সিজিপিএকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু আলী রীয়াজ ট্রাস্ট ফান্ড গবেষণার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করার নতুন একটি সুযোগ তৈরি করেছে।

তিনি আরও মন্তব্য করেন যে, অল্প অর্থায়নেও শিক্ষার্থীরা যে অত্যন্ত পরিণত ও মানসম্মত গবেষণা করতে পারেন, আজকের অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত গবেষণাগুলোই তার প্রমাণ।

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌসের সঞ্চালনায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে বিভাগের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন।

উল্লেখ্য, ২০২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে ‘আলী রীয়াজ স্নাতকোত্তর গবেষণা পুরস্কার ট্রাস্ট ফান্ড’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই ফান্ডের আওতায় স্নাতকোত্তর পর্যায়ের গবেষণার জন্য শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পুরস্কার ও বৃত্তি প্রদান করা হয়।