গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিসেবে যোগদান করেছেন মো. ইবনে আল জায়েদ হোসেন। তাঁর দায়িত্ব পালনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে সাধারণ মানুষের জন্য তাঁর কার্যালয়ের খোলা দরজা।
সম্প্রতি রুমা আক্তার নামের এক নারী তাঁর ১৯ মাস বয়সী শিশুকন্যা মুনতাহার টিকা কার্ডে নামের ভুল সংশোধন করতে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) কার্যালয়ে যান। কিন্তু সেখানে তিনি কাঙ্ক্ষিত সেবা পাননি। জন্মনিবন্ধন সংশোধনের এই জটিলতা নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে তিনি সরাসরি হাজির হন ইউএনও মো. ইবনে আল জায়েদ হোসেনের কার্যালয়ে।
বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, কোনো পূর্ব অনুমতি ছাড়াই তিনি ইউএনওর কক্ষে প্রবেশ করেন। সেখানে ইউএনও অত্যন্ত মনোযোগের সাথে তাঁর সমস্যার কথা শোনেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে ফোন করে সমস্যাটি দ্রুত সমাধানের নির্দেশ প্রদান করেন।
হাজীগঞ্জের কালচোঁ দক্ষিণ ইউনিয়নের সিদলা গ্রামের বাসিন্দা রুমা আক্তার মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, ‘এনো সরাসরি ঢুকছি। অনুমতি লাগে নাই। ইউএনও স্যার ইউনিয়ন পরিষদে ফোন কইরা আমার সমস্যাডা মিটাইয়া দিছেন। আমি খুব খুশি।’
রুমা আক্তারের মতো আরও অসংখ্য মানুষ প্রতিদিন হাজীগঞ্জের ইউএনও কার্যালয়ে এসে কোনো প্রকার ভোগান্তি, হয়রানি বা দীর্ঘ অপেক্ষা ছাড়াই সেবা পাচ্ছেন। প্রতিদিন গড়ে এক থেকে দেড়শ জন নাগরিক তাঁদের নানা সমস্যা নিয়ে এখানে আসেন এবং ইউএনও সেগুলো সমাধানের চেষ্টা করেন। গতকাল সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত কার্যালয়ে অবস্থান করে এবং অন্তত ১৫ জন সেবাপ্রত্যাশীর সাথে কথা বলে এই চিত্রটি পরিলক্ষিত হয়েছে।
হাজীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের দোতলায় অবস্থিত ইউএনওর কার্যালয়ের দরজায় লাল রঙে লেখা রয়েছে, ‘বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করুন। ধাক্কা দিন।’ কক্ষের ভেতরে দেখা যায়, জন্মনিবন্ধন সনদের সংশোধন, আর্থিক সহায়তা, ওয়ারিশ সনদ, জাতীয় পরিচয়পত্রের বানানের ভুল সংশোধন, পারিবারিক ও সম্পত্তির বিরোধ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দসহ বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আসা নাগরিকরা ইউএনওর সাথে কথা বলছেন এবং সমাধান পাচ্ছেন।
সেবাপ্রত্যাশীদের মধ্যে ছিলেন আড়ুলী গ্রামের স্থানীয় এক মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক হাফেজ মাওলানা আহসান হাবিব। তিনি মাদ্রাসার উন্নয়নের জন্য বরাদ্দের আবেদন করতে এসেছিলেন। তিনি জানান, এর আগেও তিনি বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে ইউএনওর কাছে এসেছেন এবং কোনো প্রকার ভোগান্তি বা আর্থিক লেনদেন ছাড়াই তাঁর সমস্যার সমাধান হয়েছে। তাঁর মতে, ইউএনওর এই আন্তরিকতা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে।
এছাড়া বাকিলা এলাকার বৃদ্ধ মানিক, রামপুরার প্রবাসী মো. আরিফ হোসেন ও আবুল খায়ের এবং মধ্য বলাখালের মো. মোস্তফা কামালসহ আরও অন্তত ১৫ জন সেবাপ্রত্যাশীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, তাঁরা সবাই ভোগান্তিহীন সেবার অভিজ্ঞতা পেয়েছেন।
ইউএনওর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বিসিএস ৩৬ ব্যাচের কর্মকর্তা মো. ইবনে আল জায়েদ হোসেন বর্তমানে হাজীগঞ্জ পৌরসভার প্রশাসক হিসেবেও অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন।
নিজের কাজের ধরন সম্পর্কে ইউএনও মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, “জনগণের সেবাই প্রশাসনের কাজ। সেবাপ্রাপ্তি লোকজনের অধিকার। এটি দয়া বা অনুকম্পা নয়।” তিনি আরও জানান, মানবিক বিবেচনা এবং দায়িত্ববোধ থেকেই তিনি তাঁর কাজগুলো করছেন এবং প্রশাসক হিসেবে নয়, বরং জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করতেই তিনি বেশি পছন্দ করেন।