আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে লিওনেল মেসির বিদায় ঘণ্টা বাজায় পুরো ফুটবল বিশ্ব এখন আবেগের সাগরে ভাসছে। মাঠের সতীর্থ, প্রাক্তন সহকর্মী, প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়, কোটি কোটি ভক্ত এবং ফুটবল কিংবদন্তিরা তাঁদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার কথা জানাচ্ছেন। এই দীর্ঘ তালিকায় এবার যুক্ত হলেন ব্রাজিলিয়ান তারকা নেইমার।

মেসির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে পরিচিত নেইমার। বার্সেলোনা এবং পিএসজি—দুটি ভিন্ন ক্লাবে তাঁরা একসঙ্গে সতীর্থ ছিলেন এবং শুরু থেকেই তাঁদের মধ্যে এক গভীর বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। মেসির বিদায়ী ম্যাচের আগ মুহূর্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক আবেগঘন বার্তা দিয়েছেন এই ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড।

নেইমার তাঁর বার্তার শুরুতেই লিখেছেন, ‘যাঁরা ফুটবল ভালোবাসেন, তাঁরা এত বছর ধরে তোমাকে উপভোগ করার সুযোগ পেয়েছেন...’। এই বার্তার সাথে তিনি মেসির সঙ্গে কাটানো মুহূর্তের বেশ কিছু ছবি শেয়ার করেছেন। সেই ছবির তালিকায় ছিল ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা ফাইনালের একটি দৃশ্য। স্মরণীয় সেই ম্যাচে মারাকানায় ব্রাজিলকে ১-০ গোলে পরাজিত করে ২৮ বছর পর কোনো বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা জিতেছিল আর্জেন্টিনা, আর মেসিও পেয়েছিলেন জাতীয় দলের হয়ে প্রথম বড় ট্রফির স্বাদ।

আজ বুয়েনস আইরেসের মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে বেনিনের বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচ খেলবে আর্জেন্টিনা। জাতীয় দলের নীল-সাদা জার্সিতে এটিই হতে যাচ্ছে মেসির শেষ ম্যাচ। এই মুহূর্তটিকে স্মরণ করে নেইমার লিখেছেন, ‘আজ তোমার দেশের, তোমার জাতীয় দলের জার্সিতে শেষ ম্যাচ। আশা করি, প্রতিটি সেকেন্ড উপভোগ করবে। আজকের সব শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা যেন তোমাকে আনন্দ দেয়।’

মেসি যে কেবল আর্জেন্টিনার মানুষের প্রিয়, নেইমারের চোখে তাঁর প্রভাব তার চেয়েও অনেক বেশি। ৩৪ বছর বয়সী এই ব্রাজিলিয়ান তারকা লিখেছেন, ‘তুমি ফুটবলের জন্য যা কিছু করেছ, তার জন্য শুধু আর্জেন্টিনা নয়, পুরো বিশ্ব তোমার কাছে কৃতজ্ঞ।’

বন্ধুর প্রতি নেইমারের সবচেয়ে আবেগঘন কথাগুলো ছিল বার্তার শেষ দিকে। তিনি লিখেছেন, ‘ফুটবলকে আরও বেশি ভালোবাসতে শেখানোর জন্য তোমাকে ধন্যবাদ। তোমার বিপক্ষে খেলতে পেরেছি, সেটাই ছিল সম্মানের। আর তোমার সঙ্গে ইতিহাসের অংশ হতে পারা ছিল আরও বড় সম্মানের।’

ইতিহাসের সেই অংশটি সত্যিই বিশাল। ২০১৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বার্সেলোনায় একসঙ্গে খেলেছেন মেসি ও নেইমার। লুইস সুয়ারেজের সঙ্গে মিলে তাঁরা গড়েছিলেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বিধ্বংসী আক্রমণভাগ, যা ‘এমএসএন’ নামে পরিচিত ছিল। এই ত্রয়ীর হাত ধরে বার্সেলোনা নয়টি শিরোপা জয় করেছিল, যার মধ্যে ২০১৫ সালের চ্যাম্পিয়নস লিগ ও ক্লাব বিশ্বকাপ ছিল সবচেয়ে গৌরবময় অর্জন।

দীর্ঘ চার বছর পর প্যারিসে আবারও একসঙ্গে হন এই দুই তারকা। বার্সেলোনা ছেড়ে পিএসজিতে যোগ দেওয়ার পর মেসি পুনরায় নেইমারের সঙ্গে একই ড্রেসিংরুমে ফেরেন। প্যারিসে দুই মৌসুম একসঙ্গে কাটান তাঁরা। সেখানে জিতেছেন দুটি লিগ আঁ এবং একটি ফরাসি সুপার কাপ। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের জুনে মেসি পিএসজি ছেড়ে ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেন।

বার্সেলোনা ও পিএসজি মিলিয়ে মেসি ও নেইমার মোট ২০৬টি ম্যাচ একসঙ্গে খেলেছেন। সেই ২০৬টি ম্যাচে কেবল গোল আর শিরোপার হিসাব নেই, মিশে আছে এক অটুট বন্ধুত্বের গল্প। আজ সেই বন্ধুর জাতীয় দলের শেষ ম্যাচ। মাঠে মেসি থাকলেও নেইমার থাকবেন না, তবে দূর থেকেই ব্রাজিলিয়ান তারকার কথাগুলো যেন বুঝিয়ে দিচ্ছে, মেসির এই বিদায় কেবল আর্জেন্টিনার নয়, বরং পুরো ফুটবল বিশ্বেরই এক অপূরণীয় ক্ষতি।