মাসুদুল হকের একগুচ্ছ কবিতার পাতায় ফুটে উঠেছে এক অদ্ভুত নির্জনতা এবং প্রাচীন ঐতিহ্যের প্রতি গভীর অনুরাগ। তাঁর লেখনীতে ফুটে উঠেছে এমন এক মন্দিরের কথা, যার কেন্দ্রীয় কক্ষে কোনো দরজা নেই— তবু প্রতিদিন সেখানে প্রবেশ করে অসংখ্য ভিক্ষু। ইটের স্তুপে যেন জমে থাকে পুরোনো বৃষ্টির শব্দ, আর পোড়ামাটির ফলক থেকে হঠাৎ উদয় হয় একটি হরিণ। কবি সেই হরিণটিকে জিজ্ঞেস করেন— “তোমার পথ কোন দিকে?” কিন্তু হরিণটি ঘাসের দিকে তাকিয়ে থাকে, কোনো উত্তর দেয় না। চত্বরের মাঝখানে বাতাসের গুঞ্জন যেন এক চিরন্তন সত্য ঘোষণা করে— “যা পূর্ণ, তারও একদিন শূন্য হতে হয়।” কবি নিজের বুকের গভীরে অনুভব করেন, সেখানে একটি বিহার ধীরে ধীরে নিঃশব্দ হয়ে আসছে।
কবিতার বর্ণনায় দেখা যায়, ভিক্ষুরা চলে গেলেও রয়ে গেছে তাদের হাঁটা পথ। ইটের শরীরে আর নেই তাদের পায়ের উষ্ণ স্পর্শ। উত্তরের পঁয়তাল্লিশটি কক্ষ এখন সম্পূর্ণ চুপ। অন্য তিনদিকে বিরাজ করছে চুয়াল্লিশটি করে নীরবতা। কবি যখন এক পা এক পা করে হাঁটেন, তখন দেয়াল বেয়ে উঠে যাওয়া একটি টিকটিকিকে দেখে মনে হয়, কোনো পুরোনো প্রার্থনা হয়তো ভুল করে এখনো সেখানে রয়ে গেছে। কবি বারবার ঘুরলেও কেন্দ্রের শূন্যতা অনুভব করেন। সেখানে শুধু তাঁর নিজের ছায়াটিই সঙ্গী হয়ে হাঁটে। এই উপলব্ধির মাধ্যমেই তিনি বুঝতে পারেন— “পথের শেষে শূন্যতা নয়; এই হাঁটা, এই থামা, এই ফিরে-ফিরে আসাই ছিল মন্দির।”
পোড়ামাটির ফলকগুলোতে খোদাই করা হাতি, হরিণ আর মানুষের অবয়বগুলো যেন স্থবির হয়ে আছে, শুধু বাতাসই সেখানে অবিরাম বয়ে চলে। এক সময় একটি সিংহের মুখ দিয়ে জল নেমেছিল, কিন্তু এখন সেখানে দুপুরভর জমে থাকে ধুলো। যে কারিগর এই ফলকটি তৈরি করেছিলেন, তাঁর কোনো নাম নেই; আর যে চোখ তা দেখেছিল, তারও কোনো চিহ্ন নেই। তবুও মাটির গায়ে আঙুল রাখলে শরীরের ভেতর এক অদ্ভুত আলো জ্বলে ওঠে। কবির ভাষায়, সম্ভবত জীবন এমনই— নাম মুছে যায়, কিন্তু স্পর্শ থেকে যায়।
এই প্রাচীন বিহারে তিব্বত থেকে কেউ এসেছিল, আবার চীনের দিক থেকে কেউ রেখে গিয়েছিল নীরব জুতো। মায়ানমারের বৃষ্টির রেশ হয়তো এখনো লেগে আছে এই ইটের গায়ে, আর মালয়ের কোনো প্রার্থনা মিশে আছে সন্ধ্যার ধুলোয়। তারা সবাই এসেছিল জ্ঞান খুঁজতে। কিন্তু চত্বরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কেউ কি সত্যিই জ্ঞান পায়? কবি স্মরণ করেন এক বৃদ্ধ ভিক্ষুর কথা, যিনি একটি শুকনো পাতা তুলে নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে পুনরায় তা মাটিতে রেখে দিয়েছিলেন। কবি তখন তা বোঝেননি, আজও বোঝেননি, তবু সেই পাতাটি তাঁর স্মৃতিতে অমলিন হয়ে আছে।
সময়ের আবর্তে রাজা বদলেছে, বদলেছে ধর্ম। সিঁড়ির গায়ে এখন কেবল বৃষ্টির ক্ষুদ্র ইতিহাস লেখা থাকে। এক সময় এই কক্ষগুলো মানুষে পরিপূর্ণ ছিল, আর এখন সেখানে এসে বসে সন্ধ্যার পাখিরা। কবি একটি ভাঙা ইট তুলে নিয়ে অনুভব করেন, তার ভেতরে কোনো রাজত্ব নেই— আছে শুধু মাটি, আগুন আর মানুষের দুই হাতের শ্রম। দূরে ধানখেতে যখন বাতাস ওঠে, মনে হয় বিহারটি যেন পুনরায় শ্বাস নিচ্ছে। কবির বিশ্বাস, ধ্বংস মানেই শেষ নয়; কখনো কখনো শূন্যতাই দীর্ঘ জীবন লাভ করে।