মেহেরপুর জেলায় মাছ চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও মানসম্মত রেণু ও পোনার তীব্র সংকটে পড়েছেন স্থানীয় মৎস্যচাষিরা। জেলার দুটি সরকারি মৎস্য হ্যাচারি দীর্ঘ সময় ধরে অচল হয়ে পড়ায় চাষিদের এখন যশোর, ঝিনাইদহ, নওগাঁ ও সান্তাহারসহ দূরবর্তী এলাকার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এর ফলে পোনা ক্রয় এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার কারণে পোনা মারা যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।
একটা সময় ছিল যখন মেহেরপুরের সরকারি হ্যাচারিগুলোতেই বিভিন্ন প্রজাতির মাছের রেণু ও পোনা উৎপাদন করা হতো। শুধু স্থানীয় চাহিদাই নয়, এখান থেকে চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়াসহ পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতেও পোনা সরবরাহ করা হতো। তবে দীর্ঘদিনের অযত্ন, অব্যবস্থাপনা এবং উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় বর্তমানে এই হ্যাচারিগুলো পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। জানা গেছে, পোনা উৎপাদনের মূল্যবান যন্ত্রপাতিগুলো এখন জং ধরে নষ্ট হয়ে গেছে এবং সরকারি খামারের জমি বেদখল হয়ে যাওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
বিশেষ করে মেহেরপুরের গাংনী উপজেলা সরকারি মৎস্য হ্যাচারিটি প্রায় ২০ বছর ধরে বন্ধ হয়ে আছে। একইভাবে জেলা সদরের সরকারি মৎস্য হ্যাচারিটিও দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদনের বাইরে। ফলে জেলার বিশাল মাছ চাষের পরিধির বিপরীতে স্থানীয়ভাবে রেণু-পোনা উৎপাদনের সক্ষমতা পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে।
জেলা মৎস্য বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মেহেরপুর সদর উপজেলায় চাষযোগ্য পুকুর রয়েছে ১ হাজার ৮২৯টি, গাংনীতে ৩ হাজার ৯৯৫টি এবং মুজিবনগরে ৬১৪টি। অর্থাৎ জেলার তিন উপজেলায় মোট চাষযোগ্য পুকুরের সংখ্যা ৬ হাজার ৪৩৮টি। এছাড়া জেলায় আরও ১৬টি উন্মুক্ত জলাশয় রয়েছে।
এই বিপুল সংখ্যক পুকুর ও জলাশয়কে কেন্দ্র করে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকার মাছ উৎপাদন করেন জেলার চাষিরা। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে উৎপাদিত মাছ দেশের বিভিন্ন জেলাতেও পাঠানো হয়। কিন্তু এই বিশাল মাছ চাষের জন্য প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ পোনা বাইরে থেকে কিনে আনতে হচ্ছে চাষিদের।
শুধুমাত্র বেসরকারি মৎস্যচাষিরাই নন, জেলা মৎস্য অধিদপ্তরও প্রতিবছর সরকারি অর্থায়নে লক্ষাধিক টাকার মাছের পোনা সংগ্রহ করে বিভিন্ন ব্যক্তিমালিকানাধীন পুকুরে অবমুক্ত করে। ফলে স্থানীয় সরকারি হ্যাচারিগুলো অকার্যকর থাকায় একদিকে সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে বাইরের এলাকা থেকে পোনা সংগ্রহের মাধ্যমে, অন্যদিকে স্থানীয় চাষিদের চড়া দামে পোনা কিনতে হচ্ছে।
মাছ চাষের মৌসুমে সময়মতো পোনা সংগ্রহ ও মজুত করতে না পারায় অনেক খামারির উৎপাদন পরিকল্পনা ব্যাহত হচ্ছে। নিরুপায় হয়ে তারা যশোর, ঝিনাইদহ, নওগাঁ ও সান্তাহারসহ বিভিন্ন জেলার হ্যাচারি থেকে পোনা সংগ্রহ করছেন। দূরের জেলা থেকে পোনা আনার ক্ষেত্রে বাড়তি পরিবহন ব্যয় যুক্ত হচ্ছে এবং দীর্ঘ পথ পরিবহনের কারণে পোনা মারা যাওয়ার ঝুঁকি থাকছে। এর চূড়ান্ত প্রভাব পড়ছে মাছ উৎপাদনের খরচে, যার ফলে চাষিদের লাভের মুখ দেখার সম্ভাবনা কমে যাচ্ছে।
চাষিদের অভিযোগ, একসময় গাংনী উপজেলা সরকারি মৎস্য হ্যাচারি ছিল স্থানীয় মাছ চাষিদের অন্যতম ভরসা। এখানেই বিভিন্ন প্রজাতির মাছের রেণু-পোনা উৎপাদন করা হতো এবং স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পর অতিরিক্ত পোনা প্রতিবেশী জেলাগুলোতে সরবরাহ করা হতো।
জেলার মৎস্য উদ্যোক্তা ও রেণু-পোনা ব্যবসায়ীদের ভাষ্যমতে, ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত গাংনী সরকারি মৎস্য হ্যাচারিটি চালু ছিল এবং ওই সময়ে প্রচুর মাছের পোনা উৎপাদন করা হতো। তাঁদের দাবি, মূলত আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণেই হ্যাচারিটি বন্ধ হয়ে যায়। তাঁদের মতে, হ্যাচারিটি পুনরায় চালু করা গেলে স্থানীয় মাছ চাষিরা সরাসরি উপকৃত হবেন।
মৎস্য উদ্যোক্তা আনসারুল ইসলাম বলেন, “গাংনী সরকারি হ্যাচারিতে তীব্র লোকবল সংকট ছিল। পাশাপাশি যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার কারণে এটি পুনরায় চালু করতে অবকাঠামো ও নতুন যন্ত্রপাতির প্রয়োজন রয়েছে।”
অন্যদিকে মৎস্য বিভাগের দাবি, হ্যাচারি বন্ধ থাকার পেছনে লোকবল সংকট, যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যাওয়া এবং উৎপাদন অলাভজনক হওয়ার মতো কারণ রয়েছে। দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকায় স্থানীয়ভাবে পোনা উৎপাদনের সক্ষমতা পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
মেহেরপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম বলেন, “মেহেরপুরে মাছ চাষের পরিধি বাড়লেও মানসম্মত পোনার জন্য এখনো বাইরের জেলার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। জেলার তিন উপজেলায় ৬ হাজার ৪৩৮টি চাষযোগ্য পুকুর রয়েছে, যার মধ্যে গাংনী উপজেলাতেই রয়েছে ৩ হাজার ৯৯৫টি যা জেলার মোট চাষযোগ্য পুকুরের প্রায় ৬২ শতাংশ। ফলে গাংনীসহ জেলার সরকারি হ্যাচারিগুলো সচল করা গেলে স্থানীয় পোনা সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসবে।”
তিনি আরও বলেন, “দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা হ্যাচারিগুলোর মধ্যে জেলা সদরের সরকারি হ্যাচারিটি আগামী বছর উৎপাদনে ফেরানোর প্রস্তুতি চলছে। এটি চালু হলে বাইরের জেলা থেকে পোনা আনার নির্ভরতা কমবে। এতে পরিবহন খরচ ও পোনা মারা যাওয়ার ঝুঁকি কমার পাশাপাশি উৎপাদন পরিকল্পনাও সহজ হবে।”