গাজীপুরের টঙ্গীতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন শারীরিক প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠান মৈত্রী শিল্পে উৎপাদিত বোতলজাত পানি ‘মুক্তা ড্রিংকিং ওয়াটার’-এর উৎপাদন গত দুই বছরে অর্ধেকের বেশি কমেছে। গুণগত মান এবং বাজারে ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও উৎপাদন সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে এই পানি নিয়মিত পাওয়া যাচ্ছে না।

মৈত্রী শিল্পের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩–২৪ অর্থবছরে মুক্তা পানির উৎপাদন ছিল ৫০ লাখ ৩ হাজার ৭৪৩ লিটার। তবে পরবর্তী অর্থবছরে এই পরিমাণ কমে দাঁড়ায় ২৫ লাখ ১ হাজার ৮৬৩ লিটারে। সর্বশেষ ২০২৫–২৬ অর্থবছরে উৎপাদন আরও হ্রাস পেয়ে হয় ২৪ লাখ ৯ হাজার ৫০০ লিটার। অর্থাৎ, মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে উৎপাদন কমেছে ২৫ লাখ ৯৪ হাজার ২৪৩ লিটার, যা পূর্ববর্তী উৎপাদনের প্রায় ৫২ শতাংশ।

উল্লেখ্য যে, এর আগের তিন অর্থবছরে মুক্তা পানির উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছিল। ২০২১–২২ অর্থবছরে ৪২ লাখ ১০ হাজার লিটার এবং ২০২২–২৩ অর্থবছরে ৪৫ লাখ ৮ হাজার লিটার পানি উৎপাদিত হয়েছিল। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে এই উৎপাদন ৫০ লাখ লিটারের মাইলফলক স্পর্শ করে।

মৈত্রী শিল্প কর্তৃপক্ষের দাবি, বর্তমানে মুক্তা পানির দৈনিক চাহিদা প্রায় দুই লাখ লিটার। কিন্তু কারখানাটির দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা মাত্র ৫০ হাজার লিটার। ফলে চাহিদার মাত্র চার ভাগের এক ভাগ পানি উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে, যার কারণে দেশের সব এলাকায় নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

মৈত্রী শিল্পে কেবল পানিই নয়, বরং বাটি, বালতি, জগ এবং মগসহ ৩০ থেকে ৩৫ ধরনের প্লাস্টিক পণ্য তৈরি হয়। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের মতে, এখানে কর্মরত ব্যক্তিদের প্রায় ৮০ শতাংশই শারীরিক প্রতিবন্ধী। তাঁদের মাধ্যমেই মুক্তা পানির বোতল তৈরি থেকে শুরু করে উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করা হয়।

গত ৭ সেপ্টেম্বর মৈত্রী শিল্পের ভেতরে এক কর্মব্যস্ত পরিবেশ লক্ষ্য করা গেছে। কারখানার এক অংশে প্লাস্টিকের বোতল তৈরির কাজ চলছে, আর অন্য অংশে সেই বোতলে পানি ভরা ও প্যাকেটজাত করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ার বড় একটি অংশই সম্পন্ন করছেন শারীরিক প্রতিবন্ধী কর্মীরা। পানি পরিশোধনের পর নির্দিষ্ট নিয়মে বোতলে ভরা হয় এবং এরপর বোতল সিল করা, লেবেল লাগানো ও কার্টনে প্যাকেটজাত করার কাজ করা হয়।

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মুক্তা পানির গুণগত মানের ক্ষেত্রে তাঁরা কোনো আপস করেন না। কারখানায় ১১টি ধাপে রিভার্স অসমোসিস (আরও) পদ্ধতিতে পানি পরিশোধন করা হয়। উৎপাদনকাজে নিয়োজিত কর্মীদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়। এছাড়া প্রতিটি ব্যাচের পানি পরীক্ষাগারে যাচাই করে গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

তবে মাঠ পর্যায়ে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। গাজীপুর শহর ও আশপাশের বিভিন্ন খুচরা দোকানে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনেক দোকানি ‘মুক্তা’ পানির নামই জানেন না। আর যাঁরা চেনেন, তাঁদের কাছেও নিয়মিত এই পানি পাওয়া যায় না। ফলে বাজারে চাহিদা থাকলেও সরবরাহের ঘাটতির কারণে ক্রেতাদের কাছে এর উপস্থিতি সীমিত হয়ে পড়েছে।

টঙ্গী বাজার রোডের ব্যবসায়ী আবু হানিফ বলেন, “বাজারে কত ব্র্যান্ডের বোতলের পানি পাওয়া যায়। কিন্তু মুক্তা পানি খাইলে স্বাদডা আলাদা লাগে, বেশ ভালো। আমার কাছে অন্য পানির চাইতে মুক্তা পানিই বেশি সুস্বাদু লাগে। তাদের প্রতিষ্ঠানের বাইরেই একটা বিক্রয়কেন্দ্র আছে। হেইখান থেইকা প্রায়ই কার্টন ধরে পানি কিনা নিয়া আসি। দোকানের কাস্টমারদেরও খাওয়াই।”

উৎপাদন হ্রাসের সাথে সাথে এই পানি বিক্রি থেকে প্রাপ্ত আয়েও বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। মৈত্রী শিল্পের তথ্যমতে, ২০২১-২২ অর্থবছরে মুক্তা পানি থেকে আয় হয়েছিল ৭ কোটি ৭০ লাখ ২৭ হাজার ৯০৭ টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা বেড়ে হয় ৯ কোটি ৬৫ লাখ ৫৮ হাজার ৯৬০ টাকা এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ১১ কোটি ৫৫ লাখ ৮৬ হাজার ৪৯৪ টাকা ৮০ পয়সা আয় হয়।

পরবর্তীতে উৎপাদন কমে যাওয়ায় আয়ও হ্রাস পায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আয় হয় ৯ কোটি ৭৯ লাখ ৪৬ হাজার ৯০১ টাকা ৬৭ পয়সা এবং সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আয় হয়েছে ৯ কোটি ৭০ লাখ ২২ হাজার ৯১৬ টাকা ৭৮ পয়সা।

কর্তৃপক্ষের মতে, উৎপাদন কমে যাওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ হলো অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সরকারি দপ্তরে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের বোতলজাত পানি ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করার সিদ্ধান্ত। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল মুক্তা পানির বড় ক্রেতা, ফলে এই সিদ্ধান্তের প্রভাবে চাহিদা ও বিক্রি কমে যায়।

২০০৪ সালের ২৬ অক্টোবর টঙ্গীতে মুক্তা ড্রিংকিং ওয়াটার কারখানাটি উদ্বোধন করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সেল অ্যাকুয়া টেকনোলজিস ইনকরপোরেটেড থেকে এর পানি পরিশোধন ও বোতলজাতকরণের যন্ত্রপাতি আমদানি করা হয়। কারখানায় অত্যাধুনিক যন্ত্রের মাধ্যমে ১১টি ধাপে রিভার্স অসমোসিস পদ্ধতিতে পানি পরিশোধন করা হয়।

কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে, একটি নির্দিষ্ট সময়ে প্রায় তিন মাস উৎপাদন কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটে, যার ফলে প্রতিষ্ঠানের আয়ে প্রভাব পড়ে এবং শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধে চাপ তৈরি হয়। ২০২৬ সালের শুরুতে দায়িত্ব নেওয়া কর্মকর্তারা বকেয়া বেতন পরিশোধের উদ্যোগ নিয়েছেন।

তবে শুধু সরকারি সিদ্ধান্ত নয়, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাবকেও দায়ী করছেন কর্মকর্তারা। মৈত্রী শিল্পের নির্বাহী পরিচালক (উপসচিব) মো. বরকাতুর রহমান মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, “বর্তমানে সারা দেশে তাঁদের সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভ (বিক্রয় প্রতিনিধি) মাত্র দুজন। অথচ প্রয়োজন ৬০০ জনের বেশি। মাত্র দুজন দিয়ে বিক্রি বাড়ানো সম্ভব নয়। শুধু সরকারি অফিসে পানি সরবরাহ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সাধারণ ভোক্তা পর্যায়েও পানি পৌঁছে দিতে হবে। বিজ্ঞাপন ও প্রচারের ক্ষেত্রে তাঁদের বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।”

তিনি আরও জানান, দৈনিক চাহিদা দুই লাখ লিটার হলেও উৎপাদন সক্ষমতা মাত্র ৫০ হাজার লিটার। উৎপাদন বাড়াতে অটোমেশন প্ল্যান্ট স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উৎপাদন হ্রাসের বিষয়ে নির্বাহী পরিচালক বলেন, গত দুই বছরে পরপর দুইবার নির্বাহী পরিচালক পরিবর্তন হয়েছে। বারবার নেতৃত্ব পরিবর্তনের কারণে নতুন নতুন সমস্যা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব উৎপাদনেও পড়েছে। মাঝখানে প্রতিষ্ঠানটি অস্থির অবস্থার মধ্য দিয়ে গেছে। এতে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

মো. বরকাতুর রহমান বলেন, “এখন নতুন করে জনবল বাড়ানোর কাজ চলছে। প্রতিষ্ঠানটিকে লাভজনক করার লক্ষ্যেই তাঁরা কাজ করছেন। নতুন কিছু পণ্য যুক্ত করার পাশাপাশি শোরুমের সংখ্যাও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।”

উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে মন্ত্রণালয়ের কাছে নতুন অটোমেশন প্ল্যান্ট স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. চাঁদ মিয়া মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, “মুক্তা পানির দৈনিক চাহিদা প্রায় দুই লাখ লিটার। বিপরীতে তাঁদের দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ৫০ হাজার লিটার। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম হওয়ায় বাজারে পর্যাপ্ত পানি দেওয়া যাচ্ছে না। উৎপাদন বাড়াতে অটোমেশন প্ল্যান্ট স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”