গাজীপুরের টঙ্গীর একটি মাদ্রাসায় যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়া শিশুটির বাবা হুমকি পাওয়ার কথা গতকাল সোমবার দুপুরে সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন। পরিবার নিয়ে আতঙ্কে থাকার কথাও বলেছিলেন তিনি। এর মধ্যে গতকাল রাত ১১টার পর খবর ছড়িয়ে পড়ে নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে তিনি দেশ ছেড়েছেন। বিষয়টি নিয়ে শিশুটির বাবার আইনজীবী মো. মহিউদ্দিনের সঙ্গে কথা বলেছে মুক্তকণ্ঠ।

এই আইনজীবী আজ সন্ধ্যায় মুঠোফোনে বলেন, ‘আমার মনে হয় না, এই মুহূর্তে তিনি (শিশুটির বাবা) দেশের বাইরে গিয়েছেন। বিষয়টি যেভাবে ভাইরাল হয়েছে, তিনি দেশের বাইরে গেলে ইমিগ্রেশন থেকে জানাজানি হতো। প্রতিপক্ষ মব সৃষ্টি করতে পারে-এমন আশঙ্কা থেকে হয়তো তিনি প্রকাশ্যে আসছেন না।’

শিশুটির বাবার সঙ্গে আজ মঙ্গলবার একাধিকার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেছে মুক্তকণ্ঠ। তবে ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

শিশুটির বাবা দেশ ছেড়েছেন কি না, পুলিশের কাছে এমন কোনো তথ্য নেই। এ বিষয়ে টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘তাঁর (শিশুটির বাবা) দেশের বাইরে চলে যাওয়ার কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে নেই। এ বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই বেশি আলোচনা হচ্ছে।’

নিরাপত্তাহীনতা

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র মুক্তকণ্ঠকে বলেছেন, হুমকি পাওয়া ও আতঙ্কের কারণে নিরাপত্তার কারণে শিশুটির পরিবার টঙ্গীর বাসায় আপাতত থাকছে না। গতকাল সোমবার দুপুরে তাদের ফ্ল্যাটে (বাসায়) গিয়ে পরিবারের কাউকে পাওয়া যায়নি। তবে ওই সময় শিশুটির বাবার সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হয় মুক্তকণ্ঠের।

১৯ অক্টোবর টঙ্গীর একটি মাদ্রাসায় সাত বছরের এক মেয়েশিশুকে যৌন নিপীড়ন করার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষক মোসলেম আহম্মদকে মারধর করে পুলিশের হাতে তুলে দেন শিশুটির বাবা ও স্থানীয় লোকজন। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে আলোচনা তৈরি হয়।

শিশুর বাবার করা মামলায় পুলিশ অভিযুক্ত শিক্ষক মোসলেমকে ২১ অক্টোবর গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়। ২৫ অক্টোবর তাঁর জামিন শুনানির দিন ধার্য ছিল। আদালত তাঁর জামিন নামঞ্জুর করেন।

শিশুটিকে যৌন নিপীড়ন করার যে অভিযোগ উঠেছে, তার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা ইতিমধ্যে জানিয়েছে পুলিশ। এ বিষয়ে ২৪ অক্টোবর টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেছিলেন, ‘আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছি। এতে প্রাথমিকভাবে ঘটনার সত্যতা (শিশুকে নিপীড়ন করা হয়েছে) পাওয়া গেছে। এখনো তদন্তের কাজ চলমান।’

যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠার পরদিন ২০ অক্টোবর শিশুটির পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন অভিযুক্ত মাদ্রাসাশিক্ষক মোসলেম আহম্মদ। হাতে ছিল মিষ্টির প্যাকেট। তবে পরিবার সাড়া না দেওয়ায় ফ্ল্যাটের (বাসা) দরজা থেকে ফিরে যান তিনি। ওই ভবনের ক্লোজড সার্কিট (সিসিটিভি) ক্যামেরার ফুটেজে এই দৃশ্য দেখা গেছে।

ফ্ল্যাটে ঢুকতে না পেরে শিশুটির মায়ের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে ২০ অক্টোবর দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিটে একটি খুদে বার্তা পাঠান অভিযুক্ত শিক্ষক। তাতে লেখা ছিল, ‘আপু, আপনার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আপনার সঙ্গে একটু দেখা করতে আসছি (এসেছি)।’

তবে ভেতর থেকে কেউ সাড়া না দেওয়ায় অভিযুক্ত শিক্ষক ফিরে যান। ওই সময় শিশুটির বাবা বাসায় ছিলেন না।

পাল্টা মামলা

শিশুটির বাবার বিরুদ্ধে ওই মাদ্রাসা থেকে ১৭ লাখ টাকা লুটের অভিযোগে করা মামলার তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ বিষয়ে টঙ্গী পশ্চিম থানার ওসি আরিফুর রহমান বলেন, মাদ্রাসার ক্লোজড সার্কিট (সিসিটিভি) ক্যামেরার ফুটেজে টাকা নেওয়া বা সরিয়ে নেওয়ার কোনো দৃশ্য দেখা যায়নি। তবে অন্য কোনো তথ্য–প্রমাণ মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের কাছে রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুলিশও তদন্ত করছে।

যৌন নিপীড়ন করার অভিযোগ এবং টাকা লুটের মামলার তদন্ত পৃথকভাবে এগোচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।