নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলায় কালো জাদু করার অভিযোগ তুলে তিন নারীকে গলায় জুতার মালা পরিয়ে প্রকাশ্যে গ্রামের রাস্তায় ঘোরানোর এক অমানবিক ঘটনা ঘটেছে। পাশেই তাঁদের একটি কক্ষে আটকে রেখে জোরপূর্বক ফাঁকা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া হয় বলে জানা গেছে। এই প্রক্রিয়ায় তাঁদের মারধরও করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় গুরুদাসপুর পৌরসভার একটি এলাকায় এই ঘটনাটি ঘটে। স্থানীয় ইয়ারুল সরদার এবং তাঁর ভাই যুবদলকর্মী জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে ওই নারীদের প্রকাশ্যে হেনস্তা করা হয়। ইতিমধ্যে এই ঘটনার দুটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে নারীদের চরম অপমানিত হতে দেখা যায়।

ভুক্তভোগী নারীরা তাঁদের অভিযোগের কথা জানিয়ে বলেন, “তাঁদের বিরুদ্ধে কালো জাদু করার মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হয়। প্রতিবাদ করার মতো কেউ না থাকায় জুতার মালা পরিয়ে গ্রামে ঘোরানো হয়। জোর করে ফাঁকা স্ট্যাম্পে সইও নেওয়া হয়েছে।” এই অমানবিক আচরণের জন্য তাঁরা দ্রুত বিচার দাবি করেছেন।

ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া দেড় মিনিটের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, তিন নারীর গলায় জুতার মালা পরিয়ে পৌরসভার একটি পাকা সড়কে হাঁটানো হচ্ছে। তাঁদের পেছনে উৎসুক মানুষের ভিড় জমেছে এবং অনেককে হইহুল্লোড় করতে দেখা যাচ্ছে।

আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, ভুক্তভোগী নারীদের অভিযুক্ত জিয়াউর রহমানের বাড়ির একটি কক্ষে আটক করে রাখা হয়েছে। সেখানে ছাবলু নামের এক ব্যক্তি ক্যামেরার সামনে তাঁদের কাছ থেকে স্ট্যাম্পে সই নিচ্ছেন এবং পাশে দাঁড়িয়ে জিয়াউর রহমান মোবাইলে পুরো ঘটনার ভিডিও করছেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত ইয়ারুল সরদারের জামাতা রাতুলের সঙ্গে ভুক্তভোগী এক নারীর মেয়ের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। তবে পরবর্তীতে ইয়ারুলের মেয়ে ঐশীর সঙ্গে রাতুলের বিয়ে হয়। বিয়ের পর ঐশী অসুস্থ হয়ে পড়লে ইয়ারুলের পরিবার অভিযোগ তোলে যে, ভুক্তভোগী নারীর মেয়ের সঙ্গে বিয়ে না হওয়ায় ‘কালো জাদু’ করে তিনি ঐশীকে অসুস্থ করে দিয়েছেন। তান্ত্রিকের মাধ্যমে ইয়ারুলের পরিবার এই তথ্যের কথা জানতে পারে। এই বিষয়ে মাসখানেক আগে থানায় অভিযোগও দায়ের করেছিলেন ইয়ারুল সরদার।

প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় সূত্র জানায়, কালো জাদু করার অভিযোগ তুলে তাঁদের শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে মধ্যবয়সী দুই নারী ও এক তরুণীকে বাড়ি থেকে তুলে আনা হয়। এরপর তাঁদের গলায় জুতার মালা পরিয়ে সড়কে ঘোরানো হয়। পরবর্তীতে ভবিষ্যতে এমন কাজ আর করবে না—এমন অঙ্গীকার নেওয়ার জন্য তাঁদের কাছ থেকে ফাঁকা স্ট্যাম্পে সই নেওয়া হয়।

এই বিষয়ে অভিযুক্ত জিয়াউর রহমান দাবি করেন, “এলাকাবাসী ক্ষিপ্ত হয়ে ওই নারীদের ধরে নিয়ে আসে। তিনি এ ঘটনায় জড়িত নন। ভবিষ্যতে এমন কাজ না করার জন্য এলাকার মুরব্বিরা স্ট্যাম্পে মুচলেকা নিয়েছেন। তিনি না থাকলে তাঁদের পিটুনি দেওয়া হতো।”

ভুক্তভোগী নারীরা পুনরায় অভিযোগ করে বলেন, জোর করে তাঁদের বাড়ি থেকে তুলে এনে ইয়ারুল সরদার মারধর করেছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে কালো জাদু করার মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হয়েছে। প্রতিবাদ করার মতো কেউ না থাকায় জুতার মালা পরিয়ে গ্রামে ঘোরানো হয়েছে। জোর করে ফাঁকা স্ট্যাম্পে সই নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চান তাঁরা।

জুতার মালা পরিয়ে নারীদের হেনস্তা করার বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি অভিযুক্ত ইয়ারুল সরদার। তবে তিনি দাবি করেন, প্রায় ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন কবিরাজের মাধ্যমে তাঁর মেয়েকে ‘কুফরি কালাম’ ও ‘বাণ’ মেরেছেন ওই নারীরা। এর ফলে তাঁর মেয়ের শারীরিক বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিয়েছে।

অভিযুক্ত জিয়াউর রহমান পুনরায় তাঁর বক্তব্যে বলেন, “এলাকাবাসী ক্ষিপ্ত হয়ে ওই নারীদের ধরে নিয়ে আসে। তিনি এ ঘটনায় জড়িত নন। ভবিষ্যতে এমন কাজ না করার জন্য এলাকার মুরব্বিরা স্ট্যাম্পে মুচলেকা নিয়েছেন। তিনি না থাকলে তাঁদের পিটুনি দেওয়া হতো।”

গুরুদাসপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল হান্নান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “তিনজন নারীকে জুতার মালা পরিয়ে হেনস্তা করার বিষয়ে তিনি কোনো অভিযোগ পাননি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”