রাজধানীর মিরপুর এলাকায় ছিনতাইয়ের পর সায়মন (১৭) নামের এক পোশাক শ্রমিককে হত্যার দায়ে তিন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। আজ মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকার ১৩তম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ জাহিদুল ইসলামের আদালত এই রায় ঘোষণা করেন।
আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন মো. ইউসুফ, ইকবাল খাঁ এবং মেহেদী হাসান। এছাড়া একই মামলায় সুজন নামের অপর এক আসামিকে তিন বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। পাশাপাশি দণ্ডপ্রাপ্ত প্রত্যেক আসামিকে ২০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে আদালত।
মামলার রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মো. আবুল কালাম আজাদ মুক্তকণ্ঠকে এই রায়ের সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আজ এই মামলার চূড়ান্ত রায় এসেছে। সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন এবং রায় শেষে তাঁদের পুনরায় কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, আসামি ইউসুফ, ইকবাল ও মেহেদীকে আজ কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। রায় ঘোষণার পর সাজা পরোয়ানা দিয়ে তাঁদের পুনরায় কারাগারে পাঠানো হয়। তবে পলাতক আসামি সুজনের ক্ষেত্রে আদালত সাজা পরোয়ানার পাশাপাশি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন।
মামলার অভিযোগপত্র অনুযায়ী, নিহত সায়মন মিরপুর-১ এলাকার সনি সিনেমা হলের পেছনে অবস্থিত লিবার্টি গার্মেন্টসে ১০ হাজার টাকা মাসিক বেতনে কর্মরত ছিলেন। ২০২২ সালের ১১ অক্টোবর অফিস থেকে বেতন সংগ্রহের পর তিনি তাঁর দুই সহকর্মী রিফাত হোসেন রাব্বি ও হৃদয় হাসানের সঙ্গে মিরপুর-১ এলাকায় কেনাকাটা করতে যান।
কেনাকাটা শেষ করে রাত ৯টার দিকে বাসায় ফেরার পথে আড়ং শপিং সেন্টারের সামনে তিন ছিনতাইকারীর মুখোমুখি হন তাঁরা। অভিযোগ করা হয়, ছিনতাইকারীদের একজন সায়মনকে উদ্দেশ্য করে বলেন যে, তিনি ওই ব্যক্তির ছোট ভাইকে মেরেছেন। এরপর ‘চল, কথা আছে’ বলে ভয় দেখিয়ে সায়মন ও রিফাতকে রূপায়ণ টাওয়ারের সামনে থেকে রিকশায় তোলা হয়। এরপর তাঁদের দারুসসালাম থানার কোনাবাড়ি হয়ে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধের কাঁচা বাজারের সামনে নিয়ে যাওয়া হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়, সেখানে রিফাতকে নামিয়ে দিয়ে সায়মনকে স্মৃতিসৌধের ভেতরে নিয়ে যায় ওই তিন অভিযুক্ত। সেখানে তাঁরা চাকু বের করে সায়মনের কাছে থাকা টাকা ও মুঠোফোন দাবি করেন। সায়মন তা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁকে ছুরিকাঘাত করে রক্তাক্ত করা হয়। এরপর তাঁর টাকা ও মুঠোফোন ছিনিয়ে নিয়ে তাঁরা দ্রুত সেখান থেকে পালিয়ে যান।
সায়মনের চিৎকার শুনে আশপাশের মানুষ তাঁকে উদ্ধার করে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) নিয়ে যান। তবে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
এই নৃশংস ঘটনার পর সায়মনের বাবা শাজাহান শেখ দারুসসালাম থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
মামলার তদন্ত কার্যক্রমের সময় দারুসসালাম থানার পুলিশ ইউসুফকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে ইউসুফ স্বীকার করেন যে, এই ঘটনার সঙ্গে ইকবাল ও মেহেদী হাসানও জড়িত ছিলেন। মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সায়মনের ছিনতাই করা মুঠোফোন বিক্রির টাকা ইউসুফের বাসা থেকে উদ্ধার করা হয়।
২০২৩ সালের ৩১ জানুয়ারি মামলার তদন্ত শেষ করে দারুসসালাম থানার উপপরিদর্শক সোহান আহমেদ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। সেখানে ইউসুফ, ইকবাল ও মেহেদী হাসানের বিরুদ্ধে ছিনতাইয়ের পর হত্যার অভিযোগ এবং সুজনের বিরুদ্ধে চোরাই মাল নিজের কাছে রাখার অভিযোগ আনা হয়।
চলতি বছরের ২ আগস্ট আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। বিচার চলাকালীন আদালত মোট ১৮ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার পর আজ এই মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হলো।