প্রায় দেড় বছর পর অন্তর্বর্তী সরকার মেয়াদের একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে হঠাৎ করেই শিক্ষা আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। মাধ্যমিক শিক্ষা সর্বজনীন করার জোর দাবি থাকলেও, প্রস্তাবিত আইনের খসড়ায় প্রাথমিক শিক্ষাকে পঞ্চম শ্রেণিতেই সীমাবদ্ধ রেখে বাধ্যতামূলক করার কথা হয়েছে। এটি মূলত ১৯৯০ সালের বিদ্যমান আইনেরই পুনরাবৃত্তি, যা শিক্ষাব্যবস্থা এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত করবে।

শিক্ষাবিদ ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শিক্ষা আইন করার বিষয়ে আলোচনা চলছে দেড় দশক ধরে। কিন্তু এখন অংশীজনদের সঙ্গে পরামর্শ না করেই যেনতেনভাবে আইনের খসড়া তৈরি করা হয়েছে।

মাত্র ৯ দিন পর ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এরপর গঠিত হবে নতুন সরকার। এমন পরিস্থিতিতে মতামত নেওয়ার জন্য ১ ফেব্রুয়ারি (রোববার) আইনের খসড়াটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। আইনের খসড়ার বিষয়ে মতামত দেওয়ার সময় রাখা হয়েছে মাত্র ছয় দিন, ৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এর মধ্যে শুক্র ও শনিবার মিলিয়ে তিন দিনই সরকারি ছুটি। এমন তাড়াহুড়ো করে আইনটি করলে সেটা শিক্ষার সংস্কার ও উন্নয়নে কাজে আসবে না বলে মনে করেন শিক্ষাবিদ ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

বর্তমানে পুরো মাধ্যমিক শিক্ষাকে সর্বজনীন করার দাবি ও সুপারিশ করে আসছে শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো। পাশাপাশি অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাকে অবৈতনিক করার বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কাজও শুরু হয়েছিল।

অথচ প্রস্তাবিত শিক্ষা আইনের খসড়ায় প্রাথমিক শিক্ষাকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সীমিত রেখে সব শিশুর জন্য প্রাথমিক শিক্ষাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে, যা বাস্তবে সাড়ে তিন দশক ধরেই কার্যকর। প্রসঙ্গত, প্রাথমিক শিক্ষা (বাধ্যতামূলককরণ) আইন, ১৯৯০ বর্তমানে বিদ্যমান রয়েছে।

গত বছরের অক্টোবরে মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি পরামর্শক কমিটি গঠন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কমিটি এখনো প্রতিবেদন জমা দেয়নি। কমিটি সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় নির্বাচনের আগে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই তারা সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দেবে।

কিন্তু সেই প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আগেই শিক্ষা আইনের খসড়া প্রস্তুত করে প্রকাশ করা হয়েছে। ফলে কমিটির সুপারিশগুলোর মধ্যে যেগুলো আইনি সংশোধনের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য, সেগুলো কার্যকর করা জটিল ও সময়সাপেক্ষ হয়ে পড়বে।

এর আগে ২০২৪ সালের অক্টোবরে প্রাথমিক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার মানোন্নয়নে অধ্যাপক মনজুর আহমদের নেতৃত্বে শিক্ষাবিদ, বিশেষজ্ঞ ও প্রাথমিক শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সমন্বয়ে ৯ সদস্যের পরামর্শক কমিটি গঠন করেছিল প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। সেই কমিটি গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে সরকারের কাছে সুপারিশসহ শতাধিক সুপারিশ করেছিল। যদিও সেগুলোর অধিকাংশই বাস্তবায়ন হয়নি।

শিক্ষা আইনের খসড়ার বিষয়ে জানতে শিক্ষা উপদেষ্টা সি আর আবরারের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব রেহানা পারভীনের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নানা কারণে আইনের খসড়াটি আগে প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। তবে এখন কেউ মতামত দিলে তা যৌক্তিক হলে বিবেচনায় নেওয়া হবে।

২০১০ সালে জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়নের পরের বছরই শিক্ষা আইন করার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কোচিং, প্রাইভেট টিউশন এবং সব ধরনের নোট-গাইড, সহায়ক বই বন্ধ করা এবং জাতীয় শিক্ষানীতি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তখন শিক্ষা আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দেড় দশকের বেশি সময় ধরে এই শিক্ষা আইনের খসড়া কেবল আলোচনার মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, নোট-গাইড বা সহায়ক বই এবং কোচিং-প্রাইভেটের মতো বিষয়গুলো রাখা বা বাদ দেওয়া নিয়ে দ্বন্দ্বের কারণেই এই বিলম্ব। অথচ সর্বশেষ শিক্ষা আইনের খসড়ায় এই দুই বিষয়কেই কার্যত আগামী তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত রাখার ব্যবস্থা রয়েছে।

খসড়ায় বলা হয়েছে, সরকার কোচিং সেন্টার, সহায়ক পুস্তক (নোট বই) বা গাইড বই (যে নামেই অভিহিত হোক) প্রকাশ ও প্রাইভেট টিউশন নিয়ন্ত্রণের জন্য বিধিমালা প্রণয়ন করবে এবং ধারাবাহিকভাবে নিরুৎসাহিত করার মাধ্যমে আইন কার্যকর হওয়ার তিন বা পাঁচ বছরের মধ্যে এসব কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধের উদ্যোগ নেবে।

অথচ ১৯৮০ সালের একটি আইনে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত নোট-গাইড নিষিদ্ধ। আবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২০১২ সালের নীতিমালা অনুযায়ী, সরকারি-বেসরকারি বিদ্যালয়, কলেজ ও মাদ্রাসার কোনো শিক্ষক তাঁর নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে কোচিং করাতে পারবেন না। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুমোদন নিয়ে দিনে অন্য প্রতিষ্ঠানের সীমিতসংখ্যক (১০ জনের বেশি নয়) শিক্ষার্থীকে পড়াতে পারবেন। প্রস্তাবিত আইনে এই বিষয়টিও স্পষ্ট করা হয়নি।

খসড়াটি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মূলত শিক্ষার বিদ্যমান ব্যবস্থাগুলোকেই আইনের খসড়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শিক্ষাকে এগিয়ে নেওয়ার মতো নতুন বা যুগোপযোগী দিকনির্দেশনা খুব একটা নেই।

খসড়া অনুযায়ী, প্রতিটি প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রাক্‌-প্রাথমিক স্তর থাকা বাধ্যতামূলক হবে। সব শিশুর জন্য বৈষম্যহীন শিক্ষাক্রম প্রণীত হবে। তবে প্রাথমিক শিক্ষা পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্তই রাখা হয়েছে।

অথচ ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতিতে প্রাথমিক শিক্ষার স্তর অষ্টম শ্রেণি এবং মাধ্যমিক স্তর দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত করার কথা বলা হয়েছে। ২০১৬ সালে সরকার প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত করার ঘোষণাও দিয়েছিল, যদিও তা বাস্তবায়ন হয়নি। সর্বশেষ ২০২৪ সালের মে মাসে জাতীয় শিক্ষানীতির আলোকে আবারও প্রাথমিক শিক্ষার স্তর অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয় শিক্ষা বিভাগ। এর অংশ হিসেবে প্রথম ধাপে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাকে অবৈতনিক বা অল্প বেতনে পড়ার ব্যবস্থা করার কথা ছিল।

তিন বছর প্রস্তুতির পর প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করার ঘোষণা দেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও প্রস্তাবিত আইনে আবারও প্রাথমিক শিক্ষা পঞ্চম শ্রেণিতেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে।

খসড়ায় ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত মাধ্যমিক এবং একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত উচ্চমাধ্যমিক স্তর হিসেবে বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। মাধ্যমিক স্তর সাধারণ, মাদ্রাসা এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক—এই তিন ধারায় বিভক্ত থাকবে। উচ্চশিক্ষার স্তর স্নাতক বা সমমান বা তদূর্ধ্ব স্তরের হবে।

প্রাক্‌-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের সব ধারায় সরকার নির্ধারিত জাতীয় শিক্ষাক্রম বাধ্যতামূলক হবে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচির কথাও বলা হয়েছে।

কওমি মাদ্রাসা নিয়ে খসড়ায় বলা হয়েছে, সরকার কওমি মাদ্রাসার শিক্ষা কার্যক্রমের মানোন্নয়নের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

খসড়া আইনে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব বিধি-বিধান বা নির্বাহী আদেশের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ভর্তির ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, সরকার বিধি বা বিধির অবর্তমানে নির্বাহী আদেশে প্রাক্‌-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির নীতি ও পদ্ধতি নির্ধারণ করবে।

সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক ও জনবল নিয়োগে প্রচলিত বিধি প্রযোজ্য থাকবে। বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারে নিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস কম্পোজিশন অ্যান্ড ক্যাডার রুলস এবং রিক্রুটমেন্ট রুলস কার্যকর হবে।

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশ পদে (এন্ট্রি লেভেল) শিক্ষক নিয়োগ বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) মাধ্যমে করার কথা বলা হয়েছে। এটি এখনো হচ্ছে। তবে সম্প্রতি অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক, সুপার ও সহকারী সুপার নিয়োগও এনটিআরসিএর মাধ্যমে করার সিদ্ধান্ত হলেও আইনের খসড়ায় এ বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলা হয়নি।

খসড়া অনুযায়ী, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে নিজ নিজ ধর্ম, স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ ও গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, প্রকৃতি ও বাস্তুতন্ত্র, নাগরিক অধিকার, দেশীয় সংস্কৃতি এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিজ নিজ সংস্কৃতির বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকার কথা বলা হয়েছে।

একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধ ও গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা, বাঙালি সংস্কৃতি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিজ নিজ সংস্কৃতির পরিপন্থী এবং কোনো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে—এমন কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না।

সরকারের অনুমতি ছাড়া কোনো বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করা যাবে না। নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন ও পরিচালনায় নিবন্ধন বাধ্যতামূলক হবে। বিদেশি শিক্ষাক্রমে পরিচালিত বিদ্যালয়, কিন্ডারগার্টেন, মাদ্রাসা কিংবা বিদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশে শাখা স্থাপন ও পরিচালনার ক্ষেত্রেও একই শর্ত প্রযোজ্য হবে।

কোনো শিক্ষক শিক্ষার্থীকে শারীরিক শাস্তি বা মানসিক নিপীড়ন করতে পারবেন না—এ কথাও বলা হয়েছে। তবে অপরাধের জন্য শাস্তির ধরন ও প্রয়োগ নিয়ে খসড়ায় অস্পষ্টতা রয়ে গেছে।

শিক্ষা আইনের খসড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা-বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, শিক্ষা আইন এমন একটি বিষয়, যা সব শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শিক্ষাব্যবস্থা এবং শিক্ষাসংশ্লিষ্ট সবাইকে প্রভাবিত করবে। সে ধরনের একটি আইনের জন্য এত অল্প সময় দিয়ে মতামত কেন চাওয়া হলো, তা বোধগম্য নয়। তিনি বলেন, এটি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না, কারণ খসড়াটি চুলচেরা বিশ্লেষণ করতেও সময় প্রয়োজন। এ ছাড়া খসড়াটিতে শিক্ষা বিষয়ে আগামীর কোনো সুস্পষ্ট পথরেখা নেই। তাই এত তাড়াহুড়ো না করে অধিক যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে যুগোপযোগী করে আইনটি প্রণয়ন করা উচিত।