শিক্ষার্থীর প্রয়োজন অনুযায়ী কখনও শিক্ষক, কখনও অভিভাবক, আবার কখনও বন্ধু হয়ে পাশে দাঁড়াতে হয় একজন শিক্ষককে। ভুল করলে শাসন, আর সেই শাসনের পর ভালোবাসা দিয়ে কাছে টেনে নেওয়ার দর্শনকে ধারণ করে ১৯৯৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে শিক্ষকতা করে আসছেন নীলফামারীর মির্জাগঞ্জ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক কালি মোহন চন্দ্র রায়।
তিন দশকেরও বেশি সময়ের এই দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে তিনি অসংখ্য শিক্ষার্থীকে পাঠদান করেছেন। তার শিক্ষার্থীদের মধ্যে কেউ চিকিৎসক হয়েছেন, কেউ শিক্ষক, আবার কেউ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদে কর্মকর্তা হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন। শিক্ষার্থীদের এই সামগ্রিক সাফল্যের মধ্যেই তিনি নিজের শিক্ষকতা জীবনের প্রকৃত সার্থকতা খুঁজে পান।
কালি মোহন স্যারের মতে, শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান প্রদান নয়, বরং শিক্ষার্থীদের একজন প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই শিক্ষকতার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। তার কাছে একজন শিক্ষার্থীর সাফল্যই একজন শিক্ষকের জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন। তাই ৩৩ বছর ৮ মাস অতিবাহিত হয়ে গেলেও শিক্ষকতার প্রতি তার ভালোবাসায় কোনো ভাটা পড়েনি।
১৯৯৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ছিল তার শিক্ষকতা জীবনের প্রথম দিন। দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও সেই দিনের স্মৃতি তার মনে আজও অম্লান। প্রথমবার শ্রেণিকক্ষে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে কালি মোহন স্যার বলেন, “সেদিন আমার সিনিয়র স্যারেরা আমাকে ক্লাসে নিয়ে যাওয়ার আগে অনেক কিছু শিখিয়েছিলেন। কীভাবে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলতে হবে, কীভাবে ক্লাস নিতে হবে সবকিছুই বুঝিয়েছিলেন। কিন্তু সেদিনের অনুভূতিটা ছিল অন্যরকম, যা বলে প্রকাশ করার মতো নয়। বুকের ভেতর ভয়ও ছিল কী করব, না করব। আবার গর্বও হচ্ছিল। সামনে শত শত শিক্ষার্থী, আর আমি তাদের সামনে দাঁড়িয়ে।”
সেই ভয় আর গর্বের দিন থেকেই শুরু হয়েছিল তার দীর্ঘ পথচলা। এরপর দেখতে দেখতে কেটে গেছে ৩৩ বছর ৮ মাসেরও বেশি সময়। জাতিকে উন্নত পথে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যেই তিনি এই পেশায় আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে এই পেশায় আসার বিষয়ে তিনি বলেন, “কীভাবে জাতিকে উন্নত পথে নিয়ে যাওয়া যায়, কীভাবে সেই পথে পরিচালিত করা যায় সেই বিষয় নিয়ে কাজ করার লক্ষ্য থেকেই এই পেশায় আসা। এলাকার যে দূষিত পরিবেশ আছে, সেগুলোকে ঠিক করার লক্ষ্যও ছিল।”
তার কাছে শিক্ষকতা মানে কেবল শ্রেণিকক্ষে লেকচার দেওয়া নয়। তিনি বিশ্বাস করেন, একজন শিক্ষার্থীর চিন্তা, আচরণ ও মূল্যবোধের পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই সামগ্রিক সমাজের পরিবর্তন সম্ভব। শিক্ষার্থীরা তাকে কেন পছন্দ করে, সেই প্রশ্নের উত্তরে নিজের শিক্ষকতার দর্শন তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমি আমার জায়গা থেকে একজন শিক্ষার্থীকে শাসন করলাম। এরপর তাকে যদি আদর দিয়ে বা ভালোবাসা দিয়ে বোঝাতে না পারি যে আমি তাকে ভালোবাসি, তাহলে আমার জায়গা থেকে মনে হবে, আমি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষক নই। আমি যদি পরক্ষণে শাসন করার পর তাকে ভালোবেসে আপন করে নিতে পারি, তাহলেই মনে করি আমি একজন প্রকৃত শিক্ষক হতে পেরেছি।”
তবে শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি কতটা প্রিয়, সেই হিসাব তিনি কখনও করেননি। এ বিষয়ে তিনি বলেন, “আমি আসলে নিজেও জানি না, আমি কতটা তাদের কাছে প্রিয় বা অপ্রিয়। আমি শুধু আমার সাধ্যমতো পাঠদান ও আচার-আচরণ শেখানোর চেষ্টা করি।”
কালি মোহন স্যারের কাছে একজন ভালো শিক্ষকের কোনো নির্দিষ্ট বা একক সংজ্ঞা নেই। তার মতে, শিক্ষার্থীর মনে জায়গা করে নিয়ে জ্ঞান প্রদান করতে পারাই একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় গুণ। তিনি বলেন, “প্রত্যেক শিক্ষকই ভালো। একেকজন শিক্ষার্থীর কাছে একেকজন শিক্ষক ভিন্ন ভিন্ন গুণের কারণে ভালো। একজন শিক্ষক সবচেয়ে ভালো তখনই হন, যখন তিনি শিক্ষার্থীর মনে প্রবেশ করে পড়াশোনা কিংবা যে কোনো বিষয়ে জ্ঞান দিতে সক্ষম হন।”
তার বিশ্বাস অনুযায়ী, একজন শিক্ষককে কখনও অভিভাবক, কখনও বন্ধু, আবার কখনও বড় ভাইয়ের মতো আচরণ করতে হয়। কিছু বিষয় শেখানোর জন্য বন্ধুর মতো করে বোঝাতে হয়, আবার কিছু ক্ষেত্রে বড় ভাইয়ের মতো উপদেশ দিতে হয়। আর শিক্ষার্থী ভুল করলে অভিভাবকের মতো শাসন করা প্রয়োজন। একজন আদর্শ শিক্ষকের মধ্যে এই সব গুণের সমন্বয় থাকা জরুরি।
শিক্ষক হিসেবে সবচেয়ে বেশি আনন্দ পান যখন তার পড়ানো শিক্ষার্থীরা জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়। কালি মোহন স্যারের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই। তিনি বলেন, “একজন শিক্ষক নিজেকে তখনই সার্থক মনে করেন, যখন তার শ্রেণিকক্ষ থেকে একজন শিক্ষার্থী দেশের যে কোনো পেশায় সেবা প্রদান করছে। সেটা চিকিৎসক, শিক্ষক কিংবা অন্য কোনো পেশা হতে পারে। তখনই একজন শিক্ষকের বুকটা গর্বে ভরে ওঠে।”
সাবেক শিক্ষার্থীর প্রতি শ্রদ্ধার একটি আবেগঘন স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, কাজের প্রয়োজনে একবার একটি অফিসে গিয়েছিলেন তিনি। সেখানে গিয়ে দেখেন, কর্মকর্তার চেয়ারে বসা ব্যক্তিটি তারই একজন সাবেক শিক্ষার্থী। শিক্ষককে দেখামাত্রই সেই কর্মকর্তা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ান। এই ঘটনার কথা বর্ণনা করে কালি মোহন স্যার বলেন, “সে আমাকে দেখামাত্রই তড়িঘড়ি করে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল এবং বলল, স্যার, আপনি এদিকে বসেন। তখন নিজেকে সামলে রাখতে পারিনি। মনে হয়েছিল, স্বর্গ থেকে আমার জন্য সুখ নেমে এসেছে। চোখ দিয়ে পানি বের হয়ে আসছিল। নিজেকে সামলে রাখতে পারছিলাম না। তখন একজন শিক্ষক হিসেবে আমার মনে হয়েছিল, আমি ধন্য।”
৩৩ বছর ৮ মাসের বেশি শিক্ষকতা জীবনে তিনি অসংখ্য শিক্ষার্থী পেয়েছেন। তাদের কেউ আজ প্রতিষ্ঠিত, কেউ হয়তো জীবনসংগ্রামে লিপ্ত। তবে শিক্ষকের কাছে সবাই সমান। কোনো একজন প্রিয় শিক্ষার্থীর নাম জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এরকম অসংখ্য শিক্ষার্থী রয়েছে, যাদের কথা নির্দিষ্ট করে বলা যাবে না। হয়তো বললে কেউ মন খারাপ করবে, আবার কেউ খুশি হবে। সকল শিক্ষার্থী আমাদের কাছে আমাদের সন্তানের মতো।”
শিক্ষক দিবসে নিজের প্রিয় শিক্ষকের কথা স্মরণ করে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন কালি মোহন চন্দ্র রায়। তার প্রিয় শিক্ষক ছিলেন এমদাদুল স্যার, যিনি তাদের বাংলা পড়াতেন। তখন তারা ১২ জনের একটি দল ছিল, যাদের মধ্যে ১১ জনই পরবর্তীতে চাকরিতে প্রবেশ করেছেন। একজন শিক্ষার্থী এসএসসি পাসের পর বিয়ে হয়ে যাওয়ায় পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। সেই স্মৃতিচারণ করে কালি মোহন স্যার বলেন, “আমাদের সামনে পরীক্ষা ছিল। আমরা স্যারকে বলতাম, ক্লাস শেষে বাংলা দ্বিতীয় পত্রটা এক ঘণ্টা করে অতিরিক্ত পড়াবেন। অনেক অনুরোধ করতাম, স্যার আমাদের পড়াতেন। মাস শেষে আমরা স্যারকে সম্মানি দেওয়ার চেষ্টা করতাম, কিন্তু তিনি কোনো দিন তা গ্রহণ করতেন না।”
তিনি আরও বলেন, “এখনও স্যারকে দেখলে মোটরসাইকেল থামিয়ে তাকে সম্মান জানানোর চেষ্টা করি। তিনি আমার প্রিয় স্যার। হয়তো আমি এখন কোনো শিক্ষার্থীর প্রিয় স্যার, কিন্তু তিনি আমার প্রিয় স্যার।”
শিক্ষকতা জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দের জায়গা হিসেবে তিনি শিক্ষার্থীদের ফলাফলকে চিহ্নিত করেন। তিনি বলেন, “ধরুন, ১০০ জন শিক্ষার্থীকে পড়াচ্ছি। আশা করেছি, সেখান থেকে ৮০ জন পাস করবে। কিন্তু ফল প্রকাশের পর দেখা গেল, শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছে। ঠিক সেই মুহূর্তে যে আনন্দটা অনুভূত হয়, সেটি বলার মতো নয়।”
তবে আনন্দের পাশাপাশি রয়েছে গভীর কষ্টও। দীর্ঘদিনের ছাত্রকে প্রতিষ্ঠিত হতে না দেখে বা ভুল পথে পরিচালিত হতে দেখলে তিনি সবচেয়ে বেশি ব্যথিত হন। তিনি বলেন, “একজন শিক্ষার্থীকে ক্লাসে পাঠদান করানোর পর যদি দেখা যায়, সে রাস্তায় টোকাই হয়েছে, বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কোনো কাজ করছে না কিংবা কাউকে সম্মান দিচ্ছে না, তখন নিজেকে খুবই অধম মনে হয়। মনে হয়, আমার কাছ থেকে এই শিক্ষার্থীটি কোনো শিক্ষা নিতে পারেনি। তখনই খুব কষ্ট লাগে।”
যদি ক্যারিয়ার বেছে নেওয়ার সুযোগ পুনরায় আসে, তবে তিনি এক মুহূর্ত চিন্তা না করেই বলেন, “আমি বারবার শুধু বলব, আমি শিক্ষকতাই করতে চাই। এর বাইরে আর কোনো পেশা নেই।” তার কাছে শিক্ষক হিসেবে জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন কোনো পদবি বা সম্মাননা নয়, বরং শিক্ষার্থীদের সফলতাই শ্রেষ্ঠ অর্জন।
বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে কিছুটা আক্ষেপ প্রকাশ করেন তিনি। তার মতে, আগে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের মধ্যে শাসন ও ভয় বেশি ছিল, যার ফলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় বেশি মনোযোগী হতো এবং অভিভাবকরাও শিক্ষকের শাসনকে ইতিবাচকভাবে দেখতেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, “আগে আমরা শিক্ষার্থীদের রাগ দেখাতাম, পড়াশোনা না করলে শাস্তি দেওয়া হতো। তখন তাদের অভিভাবকরাও এসে বলতেন, পড়াশোনা না করলে বা দুষ্টুমি করলে শাস্তি দিতে। কিন্তু বর্তমান সময়ে অনেক অভিভাবক এসে অভিযোগ করেন, কেন আমার সন্তানকে রাগ দেখালেন?”
তার মতে, এর প্রভাব শিক্ষার্থীদের আচরণেও পড়ছে। শিক্ষকদের প্রতি যেমন সম্মান কমছে, তেমনি বাবা-মায়ের প্রতিও সন্তানের শ্রদ্ধাবোধ হ্রাস পাচ্ছে। তিনি বলেন, “আমার সন্তানকে বর্তমান সময়ে স্কুলে দিয়েছি। সেই স্কুলের শিক্ষকদের বলে দিয়েছি, সে যদি কোনো দুষ্টুমি করে, তাকে যথেষ্ট পরিমাণে শাস্তি দেবেন। এ বিষয়ে আমার কোনো অভিযোগ নেই।”
১৯৯৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি যে তরুণ শিক্ষক প্রথমবার শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে ভয় আর গর্ব অনুভব করেছিলেন, ২০২৬ সালের ৪ অক্টোবর এসে ৩৩ বছর ৮ মাস ৩ দিন পরও তার সেই স্বপ্ন বদলায়নি। শিক্ষার মাধ্যমে মানুষকে বদলানো, সমাজ পরিবর্তন এবং জাতিকে উন্নত পথে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই আজও শ্রেণিকক্ষে দাঁড়ান কালি মোহন চন্দ্র রায়। তার কাছে শিক্ষকতা কেবল একটি চাকরি নয়, বরং এটি একটি নতুন প্রজন্ম গড়ে তোলার পবিত্র দায়িত্ব।