প্রতিদিন সকালের ব্যস্ত রাস্তা পার হয়ে সাইকেল চালিয়ে গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যান সুনিল চন্দ্র দাস। তার গন্তব্য কুমিল্লা সিটি কলেজ। ব্যক্তিগত গাড়ি কিংবা মোটরসাইকেলের চাকচিক্য নয়, দীর্ঘ সময় ধরে সাইকেলই তার কর্মস্থলে যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম হয়ে রয়েছে। কলেজে পৌঁছে নির্ধারিত সময়ে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করেন তিনি এবং শিক্ষার্থীদের পাঠদান করেন। শিক্ষকতা জীবনের দীর্ঘ পথ অতিক্রম করলেও তার এই অভ্যাসটি বিন্দুমাত্র পরিবর্তিত হয়নি। বরং এই সাদাসিধে জীবনযাপন এবং দায়িত্বের প্রতি অটুট নিষ্ঠাই তাকে শিক্ষার্থীদের মাঝে এক অনন্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

কুমিল্লা সিটি কলেজের সহকারী অধ্যাপক সুনিল চন্দ্র দাস ১৯৯২ সালে শিক্ষকতা পেশায় পদার্পণ করেন। লাকসামের ঐতিহ্যবাহী ব্রাড মহিলা কলেজে শিক্ষকতার মাধ্যমে তার এই দীর্ঘ কর্মজীবনের সূচনা হয়। এরপর শিক্ষকতা জীবনের দীর্ঘ সময়ে তিনি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেছেন। নীলকান্ত সরকারি কলেজ থেকে ২০২৫ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। তবে অবসরের পর তিনি নিজেকে শিক্ষকতা থেকে সরিয়ে নেননি। বর্তমানে তিনি কুমিল্লা সিটি কলেজে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করছেন।

দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের মতোই সুনিল চন্দ্র দাসের ব্যক্তিগত জীবনযাপন অত্যন্ত সাধারণ। স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে তার সংসার। তার বড় মেয়ে রানী দাস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সের শেষ বর্ষে অধ্যয়নরত আছেন। অন্যদিকে ছোট মেয়ে মিথিলা রানী দাস কুমিল্লা সরকারি সিটি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। প্রতিদিনের যাতায়াতের মধ্যেই তার এই সরল জীবনযাপনের ছাপ স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। সকালে সাইকেল চালিয়ে কলেজে আসা, নির্ধারিত সময়ে শ্রেণিকক্ষে গিয়ে পাঠদান করা এবং ক্লাস শেষে পুনরায় সেই সাইকেলেই বাড়ির পথে ফেরা—এই রুটিনটি তার দীর্ঘদিনের। দীর্ঘদিন ধরে একইভাবে যাতায়াত করায় শিক্ষার্থী এবং সহকর্মীদের কাছে তিনি এক পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন।

শিক্ষার্থীদের কাছে সুনিল চন্দ্র শুধু একজন শিক্ষকই নন, বরং তার জীবনদর্শন এক বড় অনুপ্রেরণা। কলেজের শিক্ষার্থী সামিয়া মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘সুনিল স্যারের এই জীবনযাপন আমাদের অনুপ্রাণিত করে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে সাইকেল চালিয়ে কলেজে আসেন এবং নিয়মিত ক্লাস নেন। তার কাছ থেকে আমরা শুধু পাঠ্যবইয়ের শিক্ষা নয়, জীবনযাপনেরও অনেক কিছু শিখি।’

নিজের এই সাদাসিধে জীবনযাপন এবং সাইকেলে যাতায়াতের বিষয়ে সুনিল চন্দ্র দাস মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘সাইকেল চালানো আমার দীর্ঘদিনের অভ্যাস। এতে শরীর ভালো থাকে, সময়মতো কর্মস্থলেও পৌঁছানো যায়। শিক্ষকতা আমার কাছে শুধু একটি পেশা নয়, এটি দায়িত্বও। অবসর নেওয়ার পরও শিক্ষার্থীদের পড়ানোর সুযোগ পেয়ে আমি আনন্দিত। যতদিন সামর্থ্য আছে, ততদিন আন্তরিকতার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করে যেতে চাই।’

তিনি আরও বলেন, ‘জীবনযাপনে অপ্রয়োজনীয় আড়ম্বরের চেয়ে সহজ-সরলভাবে থাকা এবং নিজের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করাকেই আমি বেশি গুরুত্ব দিই।’

সুনিল চন্দ্র মনে করেন, শিক্ষকতার মর্যাদার সঙ্গে বাহন কিংবা জীবনযাপনের আড়ম্বরের কোনো সম্পর্ক নেই। তার ভাষায়, ‘শিক্ষকের মর্যাদা বাহন বা জীবনযাপনের আড়ম্বরের ওপর নির্ভর করে না। একজন শিক্ষক কতটা আন্তরিকতার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পড়াচ্ছেন এবং নিজের দায়িত্ব পালন করছেন, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।’

শিক্ষকতা জীবনের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েও সুনিল চন্দ্র দাসের এই সাইকেলযাত্রা কেবল কর্মস্থলে যাতায়াতের গল্প নয়। বর্তমান সময়ের ব্যস্ততা, পরিবর্তিত জীবনধারা এবং বাহননির্ভরতার ভিড়ে তার এই সহজ-সরল জীবন ও দায়িত্বনিষ্ঠার অভ্যাস শিক্ষার্থীদের সামনে এক ভিন্ন ও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।