সন্ত্রাসবাদী হামলার পরিকল্পনার অভিযোগে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের এক সপ্তাহ পর যুক্তরাজ্যের আরএএফ ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটি থেকে তাদের বি-১ বোমারু বিমানগুলো সরিয়ে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। গতকাল রোববার পেন্টাগনের একজন কর্মকর্তা এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

লন্ডনের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত এই আরএএফ ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের এক ডজন বি-১ বোমারু বিমান মোতায়েন ছিল। মূলত ইরানে মার্কিন সামরিক অভিযানের কাজে এই বিমানগুলো ব্যবহার করা হচ্ছিল।

পেন্টাগনের একজন মুখপাত্র ই-মেইলে এই বিষয়ে লিখেছেন, ‘যদিও নিরাপত্তার কারণে আমরা আমাদের সরঞ্জাম ও বাহিনীর চলাচল তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করতে পারিনি, তবে আমরা এখন স্বীকার করছি, আরএএফ ফেয়ারফোর্ডে মোতায়েন সব মার্কিন বোমারু বিমান যুক্তরাষ্ট্রে তাদের নিজ নিজ ঘাঁটিতে ফিরে এসেছে।’

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম গত বুধবার এক বিবৃতিতে জানান, এই বিমানঘাঁটিকে লক্ষ্য করে সম্ভাব্য হামলার ষড়যন্ত্রে ইরানের সম্পৃক্ততার ‘শক্ত আলামত’ যুক্তরাজ্যের কাছে রয়েছে। তবে তেহরান এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে। এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানাতে তেহরানে নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে ইরান।

দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল প্রথম এই খবরটি প্রকাশ করে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিমানঘাঁটিতে সম্ভাব্য সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনার কারণে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় বিমানগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলা চালানোর কাজে ব্যবহৃত ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলোতে আঘাত হানতে যুক্তরাষ্ট্রকে ফেয়ারফোর্ডে অবস্থানরত বোমারু বিমান ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিল ব্রিটিশ সরকার।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, এই ষড়যন্ত্রে জড়িত ব্যক্তিরা ‘বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির’ পরিকল্পনা করেছিল। অন্যদিকে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই ঘটনায় ‘কোনো বিদেশি শক্তির হাত’ থাকার সম্ভাবনা সম্পর্কে ইঙ্গিত দিয়েছেন।

বিবিসি পেন্টাগনের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে, তারা ঘাঁটি থেকে প্রায় এক ডজন বি-১ বোমারু বিমান যুক্তরাষ্ট্রে তাদের নিজ নিজ ঘাঁটিতে ফিরিয়ে নিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র এই প্রত্যাহারের সুনির্দিষ্ট কারণ স্পষ্ট করেনি। তবে গত ২৭ সেপ্টেম্বরের একটি বড় ঘটনার পর এই পদক্ষেপ নেওয়া হলো। ওইদিন বিমানঘাঁটির কাছে তিনটি ‘সন্দেহজনক যানবাহন’ দেখা যাওয়ায় পুলিশকে সতর্ক করা হয়েছিল।

প্রাথমিকভাবে ঘাঁটির কাছ থেকে সন্দেহভাজন পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়, যাদের বয়স ২৩ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে এবং তারা সবাই যুক্তরাজ্যের নাগরিক ছিলেন। পরবর্তীতে তাদের জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়। এরপর যুক্তরাজ্য ও ইরানের দ্বৈত নাগরিক ষষ্ঠ এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়, তাঁকেও জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।

বিবিসিকে ওই সূত্র আরও জানিয়েছে, এই সিদ্ধান্তটি রাজনৈতিকের চেয়ে বরং সামরিক কৌশলগত সিদ্ধান্ত ছিল। মার্কিন সামরিক বাহিনী বিষয়টি তাদের ব্রিটিশ সহকর্মীদের অবহিত করেছে। তবে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইটগুলোতে গতকাল আরএএফ ফেয়ারফোর্ড থেকে বি-১ বোমারু বিমানগুলোকে উড়ে যেতে দেখা গেছে।

ঘটনার বিস্তারিত জানা গেছে যে, কিছু যানবাহন মার্কিন বিমানবাহিনী (ইউএসএফ) পরিচালিত ঘাঁটির দিকে যাচ্ছিল এমন খবর পাওয়ার পর ভোরের দিকে ওই পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২৫ বছর বয়সী ষষ্ঠ ব্যক্তিকে বৃহস্পতিবার সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনার সন্দেহে লন্ডন থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। কাউন্টার টেররিজম পুলিশ শনিবার নিশ্চিত করেছে, তাঁকেও জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।

আরএএফ ফেয়ারফোর্ড কয়েক দশক ধরে মার্কিন বিমান বাহিনীর (ইউএসএফ) অগ্রবর্তী পরিচালনা কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশ্যে এই ঘাঁটি থেকে বি-১ এবং বি-৫২ বোমারু বিমান নিয়ে হামলা চালিয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্য ইরানের ওপর প্রতিরক্ষামূলক হামলা চালানোর জন্য মার্কিন অনুরোধ অনুমোদন করার পর এই ঘাঁটিটি ইরানে হামলার কাজে ব্যবহৃত হয়।

গত জুলাইয়ে ইরান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিল, ‘ইরানি ভূখণ্ডের বিরুদ্ধে আগ্রাসনে ব্যবহৃত যেকোনো ঘাঁটি আমাদের বাহিনীর জন্য বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচিত হবে।’

যুক্তরাজ্যে গ্রেপ্তার ওই পাঁচ সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে জামিনে মুক্তি দেওয়া দেখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা তাদের সম্পর্কে সবকিছু জানি, আমরা হলে তাদের মুক্তি দিতাম না।’ তবে তিনি এও যোগ করেন, যুক্তরাজ্য এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘খুব ঘনিষ্ঠভাবে’ কাজ করেছে।

যুক্তরাজ্য থেকে পরিচালিত অনেক বি-১ বোমারু বিমান বাঙ্কার বিধ্বংসী বোমায় সজ্জিত ছিল। এছাড়া এতে আকাশ থেকে মাটিতে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রও ছিল, যা ইরানের ভেতরের তীব্র সুরক্ষিত লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতো। লক্ষ্যবস্তুতে প্রতিটি বোমা হামলা চালানোর ক্ষেত্রে যাতায়াত মিলিয়ে মোট ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টার মতো সময় লাগত, যার মধ্যে আসা-যাওয়ার উভয় পথে মাঝ-আকাশে জ্বালানি ভরার প্রয়োজন হতো।

পেন্টাগন জোর দিয়ে বলেছে, তাদের বোমারু বিমানগুলো ‘যেকোনো স্থানে, যেকোনো সময়ে’ মিশন পরিচালনা করতে সক্ষম। এর মধ্যে ‘যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ড থেকে উড্ডয়ন ও অবতরণ করার অপারেশনও’ অন্তর্ভুক্ত।