প্রিয়জনদের ছেড়ে যাওয়ার আগের রাতের বিষণ্ণতা আমাদের সবারই চেনা। সেই রাতে রান্নাঘরে চলে বাড়তি আয়োজন, কেউ কেউ গোপনে চোখের জল মোছে, আর সবাই এমন ভান করে যেন এটি একটি সাধারণ রাত। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেই রাতের গভীরে মিশে থাকে বিদায়ের এক তীব্র বেদনা।
ঠিক তেমনই এক বিষণ্ণ পরিবেশ এখন বিরাজ করছে বুয়েনস এইরেসে, আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের ক্যাম্পে। কারণ, এক কিংবদন্তি এবার চিরতরে বিদায় নিচ্ছেন। তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং লিওনেল মেসি। ৩৯ বছর বয়সী এই মহাতারকা মঙ্গলবার রাতে (বাংলাদেশ সময় বুধবার ভোর ৫টায়) মনুমেন্তালে বেনিনের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে মাঠে নামবেন, যা হতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক ফুটবলে তাঁর শেষ ম্যাচ। এই বিদায়বেলায় সতীর্থদের কণ্ঠে বারবার ফিরে আসছে মেসির সঙ্গে কাটানো স্মৃতি, তাঁর প্রতি অগাধ ভালোবাসা এবং তাঁকে হারানোর গভীর শোক।
আবেগাপ্লুত হয়ে আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার এনজো ফার্নান্দেজ বলেন, “আমরা একসঙ্গে বারবিকিউ খাব, এই দিনগুলো ওর সঙ্গে উপভোগ করব। এটা ওর প্রাপ্য। আমরা চাই, ওর বিদায়টা হোক দারুণ, যেন সে সত্যিই উপভোগ করতে পারে।”
সম্প্রতি বুরকিনা ফাসোকে ৭-০ গোলের রাজকীয় ব্যবধানে পরাজিত করেছে আর্জেন্টিনা। তবে এই বিশাল জয়ের উৎসব এখন ম্লান হয়ে এসেছে অন্য এক প্রস্তুতির চাপে। দলের সবার নজর এখন পরবর্তী ম্যাচের দিকে। এই ম্যাচটি কেবল একটি খেলা নয়, বরং এটি একটি বিদায় সংবর্ধনা, যেখানে প্রতিপক্ষ দল কেবল অতিথি মাত্র।
দলের তরুণ সদস্য ২২ বছর বয়সী সান্তিয়াগো কাস্ত্রো এমন একজন, যিনি এর আগে কখনো মেসির সঙ্গে একই ড্রেসিংরুম ভাগ করেননি। তাঁর জন্য এই মুহূর্তটি যেন ছোটবেলার স্বপ্নের নায়কের মুখোমুখি হওয়া। তিনি বলেন, “এই প্রথম আমি মেসির সঙ্গে দেখা করব। আগে কখনো একসঙ্গে ড্রেসিংরুমে থাকা হয়নি। অনুভূতিটা খুবই বিশেষ। তবে একটু দুঃখও আছে। কারণ, আপনি তো চান, তিনি সারা জীবন খেলুন। আমি বড় হয়েছি তাঁকে দেখে। তিনিই আমাকে বলের প্রেমে ফেলেছেন, জাতীয় দলকে ভালোবাসতে শিখিয়েছেন, এই জার্সির অর্থ বুঝিয়েছেন।”
রাইটব্যাক অগাস্তিন হিয়াইয়ের কথায় ফুটে উঠেছে আনন্দ ও বিষাদের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। তিনি জানান, “খুব বিশেষ একটা রাত হতে যাচ্ছে, আবেগ থাকবে। দিনটা দুঃখের, আবার আনন্দেরও; কারণ, ও এভাবে বিদায় জানাতে পারছে। ওর সবকিছু প্রাপ্য। আমাদের এত আনন্দ দিয়েছে। আমরা খুব উপভোগ করব।”
অন্যদিকে, মিডফিল্ডার জিয়ানলুকা প্রেস্তিয়ান্নির কথায় মনে হচ্ছে তিনি এখনো মেসির বিদায় মেনে নিতে পারছেন না। তিনি বলেন, “ওকে দেখে বড় হয়েছি। বিদায়ের সময় উপস্থিত থাকাটা দারুণ ব্যাপার হবে। আবার বিশাল দুঃখেরও। আর ও জাতীয় দলে থাকবে না, এ এক বিশাল শূন্যতা।”
২৩ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড মাতিয়াস সুল মেসির সঙ্গে একই ড্রেসিংরুমে থাকার সুযোগ পেয়ে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করলেও তাঁর কণ্ঠে আক্ষেপ স্পষ্ট। তিনি বলেন, “ব্যাপারটা সত্যিই বিশেষ। লিওর শেষ ম্যাচটা দেখতে আর অভিজ্ঞতা নিতে এখানে থাকতে পেরে আমি ভাগ্যবান। একটু দুঃখের, কারণ জাতীয় দলের সঙ্গে ওর সমাপ্তি। তবু ওর শেষ ম্যাচের সময় থাকতে পারা আমার জন্য সৌভাগ্যের। সবার জন্যই এটা অবিশ্বাস্য রকমের আবেগের। ও সারা বিশ্বের আইডল, আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের নায়ক। ব্যাপারটা আমার জন্য দুঃখের, আবার একই সঙ্গে চমৎকার।”
মেসির ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ কথা বলতে গিয়ে প্রকাশ্যেই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। ২০২২ বিশ্বকাপ ফাইনালের টাইব্রেকারের সেই কঠিন চাপ সামলানো এই গোলরক্ষক এবার সামলাতে চাইছেন এক রাতের তীব্র আবেগ। তিনি বলেন, “আমরা চেষ্টা করব ও যেন যতটা সম্ভব উপভোগ করতে পারে। তাকে ভালোবাসায় ভাসাব, চুমুতে ভরিয়ে দেব। সে যাতে খুশিমনে বিদায় নিতে পারে, সব চেষ্টা করব।”
জাতীয় দলের হয়ে মেসির দীর্ঘ ক্যারিয়ারে জমেছে অসংখ্য শিরোপা, গোল এবং অনন্য সব রেকর্ড। তবে বিদায়ের এই মুহূর্তে সতীর্থদের চাওয়া খুব সামান্য— মেসি যেন তাঁর সেই চিরচেনা লাজুক হাসিতে বিদায় নিতে পারেন। হয়তো সতীর্থদের এই চোখের জল তাঁকে আবেগাপ্লুত করবে, কাঁদাবে। কারণ, প্রিয় আঙিনাকে ছেড়ে যাওয়ার সময় কিছুটা কান্না তো স্বাভাবিকভাবেই চলে আসে।