একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শাহাদাত হোসেনের মাসিক মোট বেতন ৩৯ হাজার টাকা। দীর্ঘ সময় মেস বাসায় থাকলেও সম্প্রতি বিয়ের পর তার প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি ছোট বাসার। কর্মস্থল মোহাম্মদপুরের কাছাকাছি আদাবর, শেখেরটেক ও মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকাগুলোতে গত এক সপ্তাহ ধরে বাসা খুঁজেছেন তিনি। তবে দুই কক্ষের কোনো বাসা ১৮ হাজার টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না। এই ভাড়ার সাথে গ্যাস, বিদ্যুৎ বিল এবং সার্ভিস চার্জ যুক্ত হলে মাসিক ব্যয় ২০ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যাবে।

শাহাদাত হোসেন গতকাল রোববার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘বেতনের অর্ধেকই যদি বাসার পেছনে চলে যায়, তাহলে এই দুর্মূল্যের বাজারে চলব কীভাবে?’ চরম অসহায়ত্বের কথা জানিয়ে তিনি জানান, বাধ্য হয়েই তিনি এখন অফিস থেকে দূরে কম ভাড়ার বাসা খোঁজার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এতে যাতায়াতে কষ্ট হলেও কিছু অর্থ সাশ্রয় হবে, যা দিয়ে অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ মেটানো সম্ভব হবে।

রাজধানী ঢাকার সীমিত ও নির্দিষ্ট আয়ের প্রায় সব মানুষের অবস্থাই এখন শাহাদাতের মতো। আয়ের একটি বিশাল অংশ ব্যয় করতে হয় কেবল মাথা গোঁজার ঠাঁই নিশ্চিত করতে, তবুও মনমতো বাসা পাওয়া দুষ্কর। উপরন্তু, বাসা ভাড়া নেওয়ার পর অধিকাংশ বাড়ির মালিক প্রায় প্রতি বছরই ভাড়ার পরিমাণ বাড়িয়ে দেন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত চার বছরে দেশে বাসাভাড়া বেড়েছে প্রায় ২৭ শতাংশ। তবে সরকারি এই হিসাবের চেয়ে বাস্তব পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ এবং ভাড়ার বৃদ্ধির হার অনেক বেশি, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় এই প্রবণতা সবচেয়ে প্রকট।

ঢাকার পূর্ব গোড়ানে চার বছর আগে ২০ হাজার টাকায় তিন কক্ষের একটি বাসা ভাড়া নিয়েছিলেন ফোজায়েল আহমেদ। তিনি জানান, বর্তমানে সেই ভাড়ার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার টাকায়। তিন দফায় ভাড়া বাড়িয়ে এই পর্যায়ে আসা হয়েছে, যা শতাংশের হিসেবে ৩৫ শতাংশ বৃদ্ধি। এর পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিলও বেড়েছে, যার ফলে দৈনন্দিন অন্যান্য খরচ কাটছাঁট করতে হচ্ছে তাকে।

জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের ‘ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেক্টাস ২০২৫’ প্রতিবেদনের তথ্যমতে, বৃহত্তর ঢাকায় বর্তমানে প্রায় ৩ কোটি ৬৬ লাখ মানুষ বসবাস করছেন। জনসংখ্যার দিক থেকে ঢাকা এখন বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জনবহুল নগর।

বিপুল এই জনসংখ্যার একটি বড় অংশই ভাড়া বাসায় নির্ভরশীল। সরকার ১৯৯১ সালে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়ন করলেও বিধিমালা তৈরি না হওয়ায় আইনটি কার্যত অকার্যকর হয়ে আছে। এমন এক বাস্তবতায় পালিত হচ্ছে বিশ্ব বসতি দিবস।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “ঢাকায় মানুষের তুলনায় বাসার চাহিদা বেশি থাকায় ভাড়াও বেশি। অনেক সময় ভাড়া বাড়ানোর পেছনে বাড়িওয়ালাদেরও যৌক্তিক কারণ থাকে। তবে সেই বৃদ্ধির হার যৌক্তিক কি না, ভাড়াটিয়াদের ওপরে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে কি না—এসব দেখভালের ব্যবস্থা নেই। এর জন্য বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের বিধিমালা করা জরুরি। এতে ভাড়াসংক্রান্ত জটিলতার বিষয়গুলো আইনি কাঠামোর মধ্য দিয়ে সমাধান সম্ভব।”

সরকারি সংস্থা বিবিএস প্রতি তিন মাস অন্তর বাসাভাড়া সূচক প্রকাশ করে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুলাইয়ের মধ্যে জাতীয় গড়ে বাড়িভাড়া বেড়েছে প্রায় ২৭ শতাংশ। তবে এলাকা ও চাহিদার ওপর ভিত্তি করে এই হার ভিন্ন হয় এবং রাজধানী ঢাকায় ভাড়ার পরিমাণ ও বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি।

মুক্তকণ্ঠ গত দুই দিনে রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, শেখেরটেক, মগবাজার, ইস্কাটন, পরীবাগ, বনশ্রী, যাত্রাবাড়ী ও বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসাভাড়ার খোঁজ নিয়েছে। দেখা গেছে, এসব এলাকায় তিন কক্ষের ফ্ল্যাটের ভাড়া ১৮ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত। এর সাথে মাসিক সার্ভিস চার্জ হিসেবে আরও তিন থেকে সাত হাজার টাকা যোগ হয়। তবে প্রধান সড়ক থেকে দূরে ভাড়া কিছুটা কম; যেমন মোহাম্মদপুরের বছিলা এলাকায় ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকার মধ্যে দুই কক্ষের বাসা পাওয়া যায়।

রাজধানীর শেওড়াপাড়া এলাকায় পাঁচ বছর ধরে ভাড়া বাসায় অবস্থান করছেন আহসান হাবিব। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, এই সময়ের মধ্যে দুবার ভাড়া বাড়ানো হয়েছে এবং আগামী জানুয়ারি থেকে আরও এক হাজার টাকা ভাড়া বাড়ানোর কথা জানিয়েছেন বাড়ির মালিক।

ভাড়াটেদের অভিযোগ, অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাড়িওয়ালার সঙ্গে কোনো লিখিত চুক্তি হয় না। ফলে বাড়ির মালিকরা মৌখিকভাবে যখন-তখন ভাড়া বাড়ানোর চাপ সৃষ্টি করেন।

বিবিএস-এর ২০২২ সালের খানার আয় ও ব্যয় জরিপ অনুযায়ী, দেশে একটি পরিবারের গড় মাসিক আয় ৩২ হাজার ৪২২ টাকা এবং গড় ব্যয় ৩১ হাজার ৫০০ টাকা। এই খরচের ৪২ শতাংশ ব্যয় হয় খাবারের পেছনে। দ্বিতীয় বৃহত্তম খরচের খাত হিসেবে উঠে এসেছে বাসাভাড়া এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির বিল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্মসংস্থানের সুযোগের কারণেই মূলত মানুষ ঢাকায় ভিড় করছেন। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হলে অনেকেই ঢাকার বাইরে বাসা নিতে পারতেন, যা শহরের চাপ কমিয়ে বাসাভাড়া নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করত।